শেষবার কি ছেলেকে দেখে যেতে পারবেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মা?
দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ শ্রীচিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর মা বর্তমানে চট্টগ্রামের মা ও শিশু হাসপাতালে অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন। ছেলের কারাবন্দি জীবনের প্রায় দুই বছর পার…
মেলবোর্ন, ৬ অক্টোবর- দুই দশক ধরে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম পাহাড়ি অঞ্চলে (চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস–CHT) সেনাবাহিনী ও আদিবাসী বা পাহাড়িদের মধ্যে চলেছে এক রক্তক্ষয়ী সংঘাত। এর মূল সংগঠন ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস), যাদের সামরিক শাখা ১৯৭৭ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত পাহাড়িদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের দাবিতে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছিল। এই সময়ে হাজার হাজার পাহাড়ি মানুষ ভারতে আশ্রয় নেয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০১৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৯০ হাজার পাহাড়ি পরিবার এখনো দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত অবস্থায় আছে। ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকার শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে এই সংঘাতের অবসান ঘটানোর চেষ্টা করে।
এই চুক্তি তখন শান্তি ও পুনর্মিলনের এক প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখা হয়েছিল। বড় ধরনের যুদ্ধ থেমে গেলেও আজও সেই অঞ্চলে বিরাজ করছে এক ধরনের “সহিংস শান্তি।” বন্দুকের আওয়াজ কমে এলেও সামাজিক ও জাতিগত উত্তেজনা রয়ে গেছে তীব্রভাবে। মাঝেমধ্যেই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, প্রাণহানি ঘটে, ভয় আর অবিশ্বাসের চক্র চলতেই থাকে।
এই অস্থিরতার মূল কারণ জনসংখ্যার বড় পরিবর্তন। ১৯৭০-এর দশক থেকে সরকার-প্রণোদিত বসতি স্থাপন কর্মসূচির মাধ্যমে সমতল থেকে লাখো বাঙালি পরিবারকে নিয়ে যাওয়া হয় পাহাড়ে—যেখানে আগে বসবাস করত বারোটি আদিবাসী পাহাড়ি জনগোষ্ঠী। একসময় যে অঞ্চল ছিল মূলত পাহাড়িদের, তা এখন প্রায় সমসংখ্যক বাঙালি ও পাহাড়ির মিশ্র এলাকায় পরিণত হয়েছে। এই পরিবর্তন ভূমি দখল ও মালিকানা নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করেছে। পর্যটন ব্যবসা, বাণিজ্যিকীকরণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে জমি এখন সবচেয়ে মূল্যবান ও বিরোধপূর্ণ সম্পদ। পাহাড়ি সম্প্রদায়, বাঙালি স্থায়ী বাসিন্দা, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থাগুলো—সবাই জমির দখল ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টানাটানিতে লিপ্ত।
চুক্তি অনুযায়ী, যুদ্ধ বন্ধ হয়ে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা ছিল। “এই চুক্তি একসময় ছিল আশার আলো,” রাঙামাটির এক পাহাড়ি নেতা বলেন, নাম প্রকাশ না করার শর্তে। “ভূমি-অধিকার নিশ্চিত করা, সেনা উপস্থিতি কমানো এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়কে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল এতে। কিন্তু অনেকেরই মনে হয়, সেই প্রতিশ্রুতি এখন ফাঁকা কথা।”
চুক্তির পরও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়নি। গোষ্ঠীগত সংঘর্ষে নিয়মিত প্রাণহানি ঘটছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একজন বাঙালির মৃত্যু নিয়ে পাহাড়িদের দায়ী করে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে ওই অঞ্চলে।
তবুও চুক্তির একটি বড় সাফল্য আছে—এটি দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটায়। সেনা অভিযান থেমে যায়, উন্নয়ন ও সংলাপের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু গবেষণা ও স্থানীয় অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, চুক্তির মূল ধারা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা স্পষ্ট। সেনাবাহিনীর প্রভাব এখনো গভীর, ভূমি বিরোধ এখনো দৈনন্দিন ঘটনা।
৪০০ বাঙালি ও পাহাড়ি বাসিন্দার ওপর করা এক জরিপে দেখা গেছে, ভূমি দখলকে চলমান সংঘাতের প্রধান কারণ মনে করেন ৯৯ শতাংশ পাহাড়ি মানুষ। চুক্তির আওতায় গঠিত ভূমি কমিশন আজও নিষ্ক্রিয় এবং সমস্যার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এই অচলাবস্থা পাহাড়িদের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি করেছে।
জমি ও সম্পদ নিয়ে প্রতিযোগিতা সামাজিক বিভাজন আরও বাড়িয়েছে। অধিকাংশ বাঙালি ও পাহাড়ি উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা নিজেদের জাতিগত গোষ্ঠীর মানুষকেই প্রতিবেশী হিসেবে পছন্দ করেন এবং তাদেরই বেশি বিশ্বাস করেন। এটি পারস্পরিক অবিশ্বাস ও বিচ্ছিন্নতার ইঙ্গিত দেয়। পাহাড়ি সম্প্রদায়ের মধ্যেও অভ্যন্তরীণ বিভাজন বেড়েছে, যা শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও দুর্বল করছে।
দৈনন্দিন জীবনে এই বৈষম্য স্পষ্ট। পাহাড়িরা জানিয়েছেন, তারা বাঙালিদের তুলনায় বেশি হারে হামলা, সম্পত্তি ধ্বংস ও চাঁদাবাজির শিকার হন। অনেক পরিবার সবসময় অনিরাপত্তায় ভোগে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কে থাকে।
খাগড়াছড়ির এক বাঙালি দোকানদার বলেন, “আমরা একসঙ্গে থাকি, কিন্তু আলাদা দুনিয়ায় বাস করি। খুব কমই মেলামেশা হয়, তাই ভুল বোঝাবুঝি সহজেই সংঘাতে রূপ নেয়।”
এই পরিস্থিতি দেখায়, কেবল শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করলেই শান্তি আসে না। স্থায়ী শান্তি আনতে হলে সম্পর্ক পুনর্গঠন ও সংঘাতের মূল কারণ দূর করা জরুরি।
স্থানীয় শান্তিকর্মীরা মনে করেন, সমাধান হলো চুক্তির সঠিক বাস্তবায়ন। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা, আন্তঃসম্প্রদায় সংলাপের উদ্যোগ, এবং সবার জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি—এসবই স্থায়ী শান্তির পূর্বশর্ত।
শিক্ষিত পাহাড়ি জনগোষ্ঠী—দেশে ও প্রবাসে—নিজেদের সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়াতে পারেন, যাতে তারা টিকে থাকতে ও বিকশিত হতে পারে তাদের পূর্বপুরুষের ভূমিতে। প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোকেও শক্তিশালী করে সমাজে পূর্ণ অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে।
“সহিংস শান্তি”-তে বেড়ে ওঠা তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। শিক্ষা, চাকরি ও নিরাপদ জীবনের স্বপ্ন তারা খুঁজে পায় না। বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কেবল যুদ্ধবিহীন শান্তি নয়, বরং এমন এক শান্তি গড়া, যেখানে থাকবে বিশ্বাস, ন্যায়বিচার, এবং সবার জন্য ভাগাভাগি ভবিষ্যৎ।
সুত্রঃ পিস নিউজ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au