ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া আলেপ্পো নগরীর একটি এলাকা।ছবি: রয়টার্স
মেলবোর্ন, ৭ অক্টোবর- সিরিয়ার উত্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ আলেপ্পোতে দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহের সংঘর্ষের পর অবশেষে সিরীয় সরকারি সেনাবাহিনী (SAA) ও সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (SDF)–এর মধ্যে নতুন এক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তিটি রোববার রাতে মিসর ও রাশিয়ার মধ্যস্থতায় সম্পন্ন হয়।
এই যুদ্ধবিরতি চুক্তির লক্ষ্য হলো সিরিয়ার উত্তরে পুনরায় রক্তপাত বন্ধ করা এবং কুর্দি ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমিত করা।
গত আগস্টের শেষ দিকে আলেপ্পো প্রদেশের উত্তরাঞ্চলে সিরীয় সেনাবাহিনী ও এসডিএফের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়।
এসডিএফ অভিযোগ করে যে, সিরীয় বাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন কিছু গ্রাম ও চৌকিতে গোলাবর্ষণ করেছে। অন্যদিকে দামেস্ক দাবি করে, এসডিএফ–এর কিছু ইউনিট সরকারি বাহিনীর ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে এবং রুশ সৈন্যদের যাতায়াত রুট অবরুদ্ধ করেছে।
এই সংঘাতে গত দুই মাসে অন্তত ২৭০ জন নিহত ও প্রায় ৮০০ জন আহত হয়েছেন বলে সিরিয়ার মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা (SOHR) জানিয়েছে।
মিসরের রাজধানী কায়রোতে রাশিয়ার মধ্যস্থতায় হওয়া আলোচনায় উভয় পক্ষের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। চুক্তির মূল ধারাগুলো হলো—
আতাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হবে এবং দুই পক্ষই সীমান্তে নতুন কোনো অভিযান শুরু করতে পারবে না।রুশ সামরিক পুলিশ ও মিসরীয় পর্যবেক্ষক দল সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলোর নিরাপত্তা তদারকি করবেআলেপ্পো শহরের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চল থেকে ভারী অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হবে।
মানবিক সহায়তা ও খাদ্যপণ্য পরিবহনে রাস্তাগুলো খুলে দেওয়া হবে।আটক যোদ্ধাদের বিনিময় এবং নিহতদের মরদেহ হস্তান্তরের বিষয়েও উভয় পক্ষ নীতিগত সম্মতি দিয়েছে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “দুই পক্ষের মধ্যে চলমান সংঘাত সিরিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে উঠছিল। আমরা আশা করছি, এই চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে শান্তির পথ তৈরি করবে।”
মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামেহ শুকরি বলেন, “আমরা সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে শান্তির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সিরিয়া যেন আবার সম্পূর্ণ যুদ্ধের মধ্যে না পড়ে, সেটিই আমাদের মূল লক্ষ্য।”
এসডিএফ–এর মুখপাত্র ফারহাত আমিন বলেন, “আমরা চাই না সিরিয়ার উত্তরে আবার রক্তপাত ঘটুক। আমাদের জনগণের সুরক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই চুক্তি যদি কার্যকর থাকে, আমরা সহযোগিতা করব।”
অন্যদিকে সিরীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, “রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার শর্তে আমরা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছি। এসডিএফ যদি চুক্তি লঙ্ঘন না করে, আমরা আগ্রাসন চালাব না।”
তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করেছে যে, উত্তর সিরিয়ায় এসডিএফের উপস্থিতি তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “আমরা সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ শান্তি প্রচেষ্টাকে সম্মান করি, তবে কোনোভাবেই সন্ত্রাসী সংগঠনের স্থায়ী অবস্থান মেনে নেওয়া যাবে না।”
তুর্কি সীমান্তের কাছে নতুন করে সেনা মোতায়েনের খবরও পাওয়া গেছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উদ্বিগ্ন করছে।
জাতিসংঘের সিরিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত গির পেডারসন নতুন এই যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “এটি যদি বজায় থাকে, তাহলে আলেপ্পোর হাজারো বাস্তুচ্যুত নাগরিক ঘরে ফিরতে পারবেন।”
যুক্তরাষ্ট্রও চুক্তিটিকে ইতিবাচক বলে আখ্যা দিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, “আমরা চাই সিরিয়ায় রাজনৈতিক সমাধানের পথ সুগম হোক। এই যুদ্ধবিরতি সেই দিকেই একটি পদক্ষেপ।”
আলেপ্পো ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক লড়াইয়ে দেড় লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর থেকে অন্তত ৬০টি স্কুল, ১২টি হাসপাতাল ও ২০টি বাজার আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রেড ক্রস ও জাতিসংঘের মানবিক সংস্থা WFP ও UNHCR ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় খাদ্য, ওষুধ ও আশ্রয়সামগ্রী পাঠাবে।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক আব্দুল্লাহ আল-মাসরি বলেন, “এই যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন টেকসই হবে কি না, তা নির্ভর করছে রাশিয়ার তদারকির ওপর। সিরিয়ার বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আস্থা এখনো দুর্বল। তবে কূটনৈতিকভাবে এটি একটি ইতিবাচক মোড়।”
আরেক বিশ্লেষক লিনা হাদ্দাদ বলেন, “আলেপ্পোতে শান্তি ফিরলে তা সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে বড় প্রভাব ফেলবে। এটাই হয়তো আসন্ন সংবিধান সংস্কার আলোচনার ভিত্তি হতে পারে।”
আলেপ্পোর এই নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তি সিরিয়ায় ১৪ বছরের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলে, যুদ্ধবিরতি মানা না হলে পুনরায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগে না।
তবুও স্থানীয়রা এখন একটাই আশা করছেন— “এইবার যেন সত্যিই শান্তি টিকে থাকে।”
সুত্রঃ রয়টার্স