মেলবোর্ন, ১১ অক্টোবর- দুই বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর অবশেষে গাজায় অস্ত্রবিরতি কার্যকর হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও মিসরের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও হামাস বৃহস্পতিবার এক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছায়। পরদিন শুক্রবার ইসরায়েলি মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। তবে সহায়-সম্বল ও স্বজনহারা গাজাবাসীর মনে এখন একটিই প্রশ্ন-এই বিরতি কি সত্যিই শান্তির সূচনা, নাকি নতুন আগ্রাসনের কৌশল?
চুক্তি অনুযায়ী প্রথম ধাপে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে, পরবর্তী ধাপে ধীরে ধীরে জিম্মি বিনিময় শুরু হবে। ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া হবে ফিলিস্তিনি বন্দী ও আটক ব্যক্তিদের বিনিময়ে। এছাড়া প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৪০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশের অনুমতি পাবে। জাতিসংঘ ও মানবিক সংস্থাগুলো এসব ত্রাণ বিতরণের দায়িত্বে থাকবে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, তারা আপাতত গাজা উপত্যকার ৫৩ শতাংশ এলাকা থেকে সেনা সরিয়ে নিচ্ছে। তবে ইসরায়েল সরকারের মুখপাত্রের দাবি, “পুরো উপত্যকা এখনো আমাদের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।”
ওয়াশিংটনে ট্রাম্প প্রশাসনের বৈঠক চলাকালে যুদ্ধবিরতির খবর পৌঁছায়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, “চুক্তি সম্পন্ন, এখনই ঘোষণা দিতে হবে।” এরপরই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প টিভি ক্যামেরার সামনে চুক্তির ঘোষণা দেন।
তিন দিনের পরোক্ষ আলোচনায় মিসরের শারম আল-শেখে যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও মিসরের মধ্যস্থতায় হামাসের সঙ্গে ইসরায়েল সমঝোতায় পৌঁছায়। আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত।
যদিও এই চুক্তিকে তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে, বাস্তবায়ন হবে জটিল। হামাস চায় ইসরায়েলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানিয়েছেন“হামাসের এই দাবি কখনো পূরণ হবে না।”
হামাস কিছু ভারী অস্ত্র ত্যাগে রাজি হলেও হালকা অস্ত্র রাখার ওপর জোর দিচ্ছে। অন্যদিকে নেতানিয়াহু চান দলটির সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ এবং পুনর্গঠন রোধ। ফলে, এই সাংঘর্ষিক অবস্থানই ভবিষ্যতে সহিংসতার নতুন কারণ হতে পারে।
২০২৪ সালের মে মাসে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের উদ্যোগে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব এলেও ইসরায়েল মানেনি। এমনকি বাইডেন সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ স্থগিত করলেও তাতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। এবার ট্রাম্প তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে নেতানিয়াহুকে আলোচনায় বসাতে সক্ষম হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আসবে কিনা
সেটি নিয়েই এখন সংশয়।
কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরায়েলি হামলার পর আরব বিশ্বে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেয়। এই উত্তেজনা থেকেই যুদ্ধবিরতি আলোচনায় নাটকীয় মোড় আসে। ট্রাম্প ইসরায়েলের ওপর চাপে রেখে নেতানিয়াহুকে কাতারের প্রধানমন্ত্রীর কাছে ফোন করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেন। পরে কাতারের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গত দুই বছরে গাজায় ৬৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে শরণার্থী শিবিরে দিন কাটাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের এই বর্বরতা নিন্দিত হয়েছে, এমনকি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে নেতানিয়াহুর ভাষণকালে বহু রাষ্ট্রপ্রধান সভা ত্যাগ করেন।
ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া করিনা মাচাদো ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করেছেন। ঘোষণার পরই তিনি পুরস্কারটি উৎসর্গ করেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে, তাঁর “দৃঢ় সমর্থন ও অগ্রণী ভূমিকার” জন্য।
এক্সে (X) দেওয়া পোস্টে মাচাদো লিখেছেন, “আমি এই পুরস্কার উৎসর্গ করছি ভেনেজুয়েলার দুঃসম্ভোগী জনগণকে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে, আমাদের কারণের জন্য তাঁর সিদ্ধান্তমূলক সমর্থনের কারণে।”
তিনি আরও বলেন, “আজ আমরা বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে, এবং ট্রাম্পসহ বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো আমাদের প্রধান মিত্র।”পুরস্কার ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প জানান, “মাচাদো আমাকে ফোন করে বলেছেন, তিনি এই পুরস্কার আমার নামে গ্রহণ করছেন, কারণ আমি এটি প্রাপ্য।”
হোয়াইট হাউস অবশ্য এক বিবৃতিতে নোবেল কমিটিকে রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট বলে মন্তব্য করেছে।
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি জানিয়েছে, মাচাদোকে নির্বাচিত করা হয়েছে “গণতান্ত্রিক অধিকার প্রচার ও স্বৈরশাসনের বিপরীতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের জন্য।” বিশ্লেষকেরা বলছেন, মাচাদোর পুরস্কার উৎসর্গ করা ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থনের ইঙ্গিতও বহন করছে।