মেলবোর্ন, ১৮ জুন- বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির নেতৃত্ব নিয়ে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে, তখন বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন আসলে যুক্তরাষ্ট্রকে হুবহু অনুসরণ করে এগোচ্ছে না। বরং কম খরচে প্রযুক্তি উন্নয়ন, ওপেন সোর্স মডেল, শিল্প খাতে বাস্তব প্রয়োগ এবং বৈশ্বিক বাজারে সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কৌশল গ্রহণ করেছে বেইজিং। ফলে এআই খাতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একই দৌড়ে অংশ নিলেও তাদের লক্ষ্য, বিনিয়োগের ধরন এবং উন্নয়নের পথ এক নয়।
২০২৫ সালের শুরুতে চীনের হাংঝু শহর থেকে এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আসে। ঐতিহাসিক ওয়েস্ট লেকের শহর হিসেবে পরিচিত হাংঝুর একটি তুলনামূলক ছোট প্রতিষ্ঠান ‘ডিপসিক’ এমন একটি রিজনিং-ভিত্তিক বৃহৎ ভাষা মডেল উন্মোচন করে, যা সে সময়ের সবচেয়ে উন্নত মার্কিন মডেলগুলোর কাছাকাছি সক্ষমতা প্রদর্শন করে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি অনুযায়ী, মডেলটি প্রশিক্ষণে ব্যয় হয়েছিল মাত্র ৬০ লাখ মার্কিন ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের তুলনায় অত্যন্ত কম।
ডিপসিকের আবির্ভাব বদলে দেয় প্রচলিত ধারণা
প্রযুক্তি খাতে দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, বিশাল ডেটা সেন্টার, বিপুল অর্থায়ন, উন্নত চিপ এবং বিশ্বের সেরা গবেষকদের সমন্বয় ছাড়া অত্যাধুনিক এআই তৈরি সম্ভব নয়। এই ধারণার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো। কিন্তু ডিপসিক দেখিয়ে দেয় যে সীমিত সম্পদ নিয়েও প্রতিযোগিতামূলক মডেল তৈরি করা সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, ডিপসিকের সাফল্যের মূল রহস্য ছিল নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি দক্ষতা। এর ফলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, উন্নত এআই প্রযুক্তির ওপর মার্কিন কোম্পানিগুলোর দীর্ঘদিনের একচেটিয়া আধিপত্য কতদিন টিকে থাকবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিষয়টি শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে ধরে ফেলা বা টেক্কা দেওয়ার নয়। এআই খাতের মধ্যে শুধু ভাষা মডেল নয়, বরং চিপ প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, গবেষণা, ডেটা সেন্টার এবং শিল্প খাতে বাস্তব প্রয়োগের মতো বহু স্তর রয়েছে। এই বিস্তৃত পরিসরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ভিন্ন ভিন্ন শক্তি নিয়ে এগোচ্ছে।
দুই দেশের দুই ধরনের কৌশল
যুক্তরাষ্ট্রে এআই উন্নয়ন মূলত পুঁজি-নির্ভর। সেখানে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ, বিশাল ডেটা সেন্টার, ব্যয়বহুল গবেষণা এবং কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা বা এজিআই তৈরির লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে উন্নয়ন হচ্ছে।
অন্যদিকে চীন তুলনামূলকভাবে সীমিত অর্থায়ন, চিপের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং ছোট অভ্যন্তরীণ সফটওয়্যার বাজারের বাস্তবতায় কাজ করছে। ফলে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ওপেন সোর্স মডেল, সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, দ্রুত উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
চীনের প্রযুক্তি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান সোল ক্যাপিটালের অংশীদার হেরি হ্যান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার পাশাপাশি পরস্পরকে এগিয়ে নেওয়া দুটি শক্তি হিসেবেও দেখা উচিত। তার মতে, দুই দেশ ভিন্ন পথে হাঁটলেও একে অপরকে উদ্ভাবনে আরও দ্রুত অগ্রসর হতে বাধ্য করছে।
কম খরচে বেশি ফলাফল
চীনের এআই খাতের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো কম খরচে বেশি উৎপাদনক্ষমতা। সেখানে একজন এআই প্রকৌশলীর বার্ষিক আয় যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক কম। একই সঙ্গে চীন বিপুল সংখ্যক এআই গবেষক ও পিএইচডি গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে।
এছাড়া ডেটা সেন্টারের জন্য সস্তা বিদ্যুৎ, কম দামে জমি এবং সরকারি ভর্তুকি চীনের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় সুবিধা দিচ্ছে। অনেক অঞ্চলে নির্দিষ্ট প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের খরচ অর্ধেক পর্যন্ত কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে এই সুবিধার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ২০১৯ সালের পর থেকে চীনে বিদেশি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। উন্নত চিপ আমদানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণও দেশটির প্রযুক্তি খাতের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চাহিদার বাজারই বড় চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রযুক্তি নয়, বরং বাজার। দেশটির সফটওয়্যার ও এআই সেবার জন্য অর্থ ব্যয়ের প্রবণতা তুলনামূলক কম। অনেক প্রতিষ্ঠান বাইরের সফটওয়্যার কেনার পরিবর্তে নিজস্ব সমাধান তৈরি করতে পছন্দ করে।
ফলে চীনের অভ্যন্তরীণ সফটওয়্যার বাজার যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক ছোট। এতে এআই স্টার্টআপগুলোর জন্য বড় আকারে ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং উচ্চমূল্যের সেবা বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিনিয়োগকারী জুন শু বলেন, এআই প্রযুক্তির আর্থিক মূল্য অনেকাংশে নির্ভর করে দাপ্তরিক বা উচ্চ বেতনের কাজ প্রতিস্থাপনের ওপর। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রে বেতন অনেক বেশি, তাই সেখানে এআই প্রযুক্তির অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও বেশি। চীনে এই বাজার তুলনামূলকভাবে সীমিত।
ওপেন সোর্সের ওপর বড় বাজি
চীনের এআই কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ওপেন সোর্স বা উন্মুক্ত প্রযুক্তি। অনেক চীনা প্রতিষ্ঠান তাদের মডেলের প্রযুক্তিগত কাঠামো এবং প্রশিক্ষণভিত্তিক তথ্য উন্মুক্ত করে দিচ্ছে, যাতে অন্য গবেষক ও প্রতিষ্ঠান তা ব্যবহার ও উন্নত করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে একটি সহযোগিতামূলক প্রযুক্তি পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে উদ্ভাবনের গতি অনেক দ্রুত।
বর্তমানে কিউওয়েন, মিনিম্যাক্স এবং ডিপসিকের মতো চীনা মডেল বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত ভাষা মডেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দখল করে আছে। আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ এবং এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও এসব মডেল ব্যবহার করছে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, অনেক ব্যবহারকারী চীনা মডেল বেছে নিচ্ছেন রাজনৈতিক কারণে নয়, বরং এগুলো সহজলভ্য, নমনীয় এবং পরিচালন ব্যয় কম হওয়ার কারণে।
শিল্প খাতে এআই ব্যবহারে গুরুত্ব
চীনের এআই কৌশল শুধু প্রযুক্তি উন্নয়নে সীমাবদ্ধ নয়। বরং শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, সরবরাহ ব্যবস্থা, খনিশিল্প এবং আর্থিক খাতে সরাসরি এআই ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এর একটি উদাহরণ হলো চীনা প্রতিষ্ঠান ‘০১.এআই’। প্রতিষ্ঠানটি করপোরেট এআই এজেন্ট বা ডিজিটাল কর্মী তৈরি করছে, যা সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, ক্রয়, লজিস্টিকস এবং অপারেশন পরিকল্পনার মতো কাজ পরিচালনা করতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার একটি খনি কোম্পানিতে পরীক্ষামূলকভাবে এসব এআই এজেন্ট ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবহন, পণ্য সরবরাহ এবং শ্রম ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোর দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যেখানে ভবিষ্যতের সুপার-ইন্টেলিজেন্ট এআই তৈরির দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, সেখানে চীন বর্তমান অর্থনীতিতে এআই-এর ব্যবহারিক প্রয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির চেষ্টা করছে।
বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ছে চীনের
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের এআই কৌশল এখন প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার বাইরে গিয়ে এক ধরনের সফট পাওয়ারে পরিণত হচ্ছে। সাশ্রয়ী ব্যয়, ওপেন সোর্স মডেল এবং শিল্প খাতে বাস্তব প্রয়োগের কারণে বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশ চীনা প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে চীনা এআই প্ল্যাটফর্ম গ্রহণ করেছে। ফলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক এআই ব্যবস্থায় চীনের প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এআই খাতে আগামী দশকের প্রতিযোগিতা শুধু কে সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা মডেল তৈরি করবে, তা নয়। বরং কোন দেশ প্রযুক্তিকে সবচেয়ে কার্যকরভাবে অর্থনীতি, শিল্প এবং সমাজের সঙ্গে যুক্ত করতে পারবে, সেটিই হবে মূল প্রশ্ন। আর সেই লড়াইয়ে চীন স্পষ্টতই যুক্তরাষ্ট্রের পথ অনুসরণ না করে নিজস্ব একটি মডেল গড়ে তুলছে।