ভারতে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত রিউভেন আজার। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৮ জুন- বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের কার্যক্রম বিস্তারের দাবি করেছেন ভারতে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত রিউভেন আজার। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রিউভেন আজার বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর থেকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে সংগঠনটির কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ইসরায়েল।
সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, কিছু কার্যক্রম প্রকাশ্যে দেখা গেলেও আরও কিছু তৎপরতা জনসম্মুখে দৃশ্যমান নাও হতে পারে। তার ভাষ্য, হামাস যেভাবে ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছিল, সেই ধরনের কৌশল অনুসরণ করে অন্যান্য চরমপন্থি গোষ্ঠীও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে হামলার পরিকল্পনা করতে পারে।
রিউভেন আজার বলেন, “আমরা পাকিস্তান ও বাংলাদেশে হামাসের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছি।” তবে এ বক্তব্যের সমর্থনে তিনি কোনো গোয়েন্দা তথ্য, প্রতিবেদন বা নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ করেননি।
এনডিটিভির সিনিয়র এক্সিকিউটিভ এডিটর আদিত্য রাজ কাউলকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত আঞ্চলিক কূটনীতি, পাকিস্তানের ভূমিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন।
তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য শান্তি আলোচনায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাকে সন্দেহের চোখে দেখার কথা উল্লেখ করেন। তার দাবি, পাকিস্তানের প্রতি ইসরায়েলের আস্থা নেই এবং ইসলামাবাদের বিভিন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগকে তারা সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে।
পাকিস্তানের সরকারি মহলের একটি অংশের বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষী বক্তব্য প্রচারের অভিযোগও তোলেন তিনি। তার মতে, এ ধরনের বক্তব্য আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সাক্ষাৎকারে কাতারের আঞ্চলিক ভূমিকাও সমালোচনা করেন রিউভেন আজার। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে বিভিন্ন দেশের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কিছু দেশ এমন এক ধরনের শান্তির কথা বলে, যেখানে ইসরায়েলের অস্তিত্বের কোনো জায়গা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন গাজায় চলমান যুদ্ধ এবং মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক চলছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজা উপত্যকায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। হামাসকে নির্মূল করার লক্ষ্য ঘোষণা করলেও অভিযানের ফলে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ হতাহত হন। জাতিসংঘ, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং বাংলাদেশসহ বহু দেশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় গণহত্যা চালানোর অভিযোগ তুলেছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।
গাজার অবকাঠামো, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, সেখানে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস-এ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মামলা করে দক্ষিণ আফ্রিকা। মামলায় অভিযোগ করা হয়, ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে গাজায় সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে ইসরায়েল, যা ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদের পরিপন্থী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ওই মামলার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
যদিও ২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। পরবর্তী সময়েও হামলায় আরও বহু ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও হাজার হাজার মানুষের মরদেহ আটকে থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে হামাসের তৎপরতা নিয়ে ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের সাম্প্রতিক মন্তব্য দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক আলোচনা নতুন করে উসকে দিলেও, এ ধরনের দাবির গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার ওপর।