সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। ছবি: আইএসপিআরের সৌজন্যে
মেলবোর্ন, ১৫ অক্টোবর- বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তাঁর চার দিনের সৌদি আরব সফর বাতিল করেছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে সেনাবাহিনী সম্প্রতি ১৪ জন কর্মরত কর্মকর্তাকে আটক করেছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ছিলেন।
আইসিটি মোট ৩২ জনের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করে, যার মধ্যে আছেন শেখ হাসিনা নিজে, তাঁর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল কবির আহমেদ, এবং আরও কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে অপহরণ, নির্যাতন ও গুমের ঘটনা।
এই ঘটনাকে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ অভিযান হিসেবে দেখা হচ্ছে। আইসিটির আদেশের একদিন পর, ৯ অক্টোবর সেনাবাহিনীর এক বৈঠকে কয়েকজন কর্মকর্তা খোলাখুলি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। চারজন জেনারেল সতর্ক করেন, ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযান বাহিনীর ঐক্যে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে।
এর আগেও সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান ১২ থেকে ১৪ অক্টোবর নির্ধারিত ভারত সফর স্থগিত করেছিলেন। সৌদি সফরে তাঁর মূল আলোচ্যসূচি ছিল শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা, বিশেষ করে এমন এক অঞ্চলে যেখানে বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে এবং তারা শিগগিরই প্রত্যাহার হতে পারে।
বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা অভিযানের অন্যতম বৃহৎ অবদানকারী দেশ। এই সফরকে সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের ভূমিকা আরও বিস্তারের সুযোগ হিসেবে দেখছিল।
শনিবার সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামান এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, আটক কর্মকর্তারা “আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে” সেনা হেফাজতে আছেন। তিনি বলেন, “অনেকেই অন্য বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করলেও তারা সেনাবাহিনীর সদস্য, তাই সেনাবাহিনীই তাদের বিষয়ে দায়িত্ব নিচ্ছে।”
তবে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ‘আটক’ শব্দ ব্যবহার করায় প্রশ্ন উঠেছে—তাদের কি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, নাকি সেনা কর্তৃপক্ষ বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখার চেষ্টা করছে। আইনের বিধান অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিশেষ আদালতে হাজির করতে হয়।
ধারণা করা হচ্ছে, ২২ অক্টোবর ঢাকাভিত্তিক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাদের প্রাথমিক শুনানি হবে, যেখানে জামিন বা রিমান্ডের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিশেষ ট্রাইব্যুনালের প্রধান বিচারক মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, তাঁর আদালতকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই আটকের বিষয়ে জানানো হয়নি। “যেহেতু কোনো নথিভুক্ত তথ্য আমাদের কাছে আসেনি, তাই আমরা মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছি না,” তিনি জানান।
জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলি ‘দ্য প্রিন্ট’-কে বলেন, “আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই পদক্ষেপ বাংলাদেশকে এক কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে। আদালত তদন্ত করছে, ট্রাইব্যুনাল পরোয়ানা দিচ্ছে, আর সেনাবাহিনী আইনের মধ্যে থেকেই সহযোগিতা করছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্তেজনা বিষয়টিকে সেনাবাহিনী বনাম জনগণ ইস্যুতে পরিণত করতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “বিচার রাজনীতি নয়, এটি প্রমাণ, সাক্ষ্য ও কমান্ড চেইনের ওপর নির্ভর করে। ইউনিফর্ম কোনো অপরাধের ঢাল হতে পারে না, আবার পুরো বাহিনীকেও একসঙ্গে দোষারোপ করা ঠিক নয়।”
এদিকে, ভারতের সেনাবাহিনীর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের চার সদস্যের একটি দল ১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর ঢাকা সফর করবে। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি হবে ভারতীয় সেনার প্রথম উচ্চপর্যায়ের সফর।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের জুলাই মাসে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে আইসিটি। এই অভিযোগ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমন অভিযান থেকে উদ্ভূত।
গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন, যার মাধ্যমে তাঁর প্রায় ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। এরপর ডিসেম্বর মাসে মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ভারত সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানায়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি স্বীকার করলেও এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
২০০৯ সালে শেখ হাসিনার সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্য যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিল, সেটিই ২০২৪ সালে তাঁর পদত্যাগের পর অন্তর্বর্তী সরকার পুনর্গঠন করে। বর্তমানে ছয়জন বিচারক নিয়ে দুইটি বেঞ্চে পরিচালিত এই ট্রাইব্যুনাল জুলাই মাসের সহিংস বিক্ষোভে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের দায়ীদের বিচার করছে।
সুত্রঃ দ্য প্রিন্ট