বাংলাদেশে ইসলামপন্থী সন্ত্রাসের পুনরুত্থান। ছবিঃ ইউরেশিয়া রিভিউ
মেলবোর্ন, ১৬ অক্টোবর- এই সপ্তাহে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার সতর্কবার্তা বাংলাদেশে ইসলামপন্থী উগ্রবাদের পুনরুত্থানকে নতুন করে সামনে এনেছে যা এতদিন পশ্চিমা বিশ্ব সুবিধামতো উপেক্ষা করে এসেছে।
মার্কিন কূটনীতিকেরা তিনজন সম্ভাব্য ইসলামপন্থী জঙ্গির তথ্য বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভাগ করেছেন, যারা দূতাবাসে হামলার পরিকল্পনা করছিল বলে ধারণা করা হয়। পুলিশ দূতাবাস এলাকায় বিশেষায়িত ইউনিট সোয়াট মোতায়েন করেছে, তবে সন্দেহভাজনদের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এরা স্থানীয় একটি ইসলামপন্থী সংগঠনের সদস্য, যার যোগাযোগ রয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশে আল-কায়েদা শাখা (AQIS)-এর সঙ্গে। এই সংগঠন এখনও যুক্তরাষ্ট্রকে শত্রু হিসেবে দেখে।
এক অর্থে, এই পরিস্থিতি অনেকটা সময়ের অপেক্ষায়ই ছিল। নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কারাগার থেকে বহু দণ্ডপ্রাপ্ত ইসলামপন্থী জঙ্গিকে মুক্তি দিয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বে তিনি ক্ষুদ্রঋণ প্রবর্তক হিসেবে যতই জনপ্রিয় হোন না কেন, ইউনূস তার সরকার টিকিয়ে রাখতে জামায়াতে ইসলামীসহ নানা উগ্রপন্থী ইসলামি দলের ওপর নির্ভর করছেন। শেখ হাসিনা সরকারের সময় ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্রের প্রচারণার অভিযোগে জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, কিন্তু ইউনূস সরকার ক্ষমতায় এসে দ্রুত সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। আরও খারাপ হলো, তারা কারাগার থেকে বহু ইসলামপন্থী জঙ্গিকে মুক্তি দিয়েছে, যারা এখন প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
প্রতীকীভাবে, শত শত ইউনূস সমর্থক ঢাকায় ‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে যা ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলায় নিহত পুলিশ সদস্যদের স্মরণে তৈরি হয়েছিল। পুলিশ তখন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, বরং ইসলামপন্থীরা ওই নিহত জঙ্গিদের ‘নায়ক’ হিসেবে উদযাপন করেছে।
এখন ইউনূস সরকার ২৫ জন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে, যারা শেখ হাসিনার আমলে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে ‘গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন’-এর অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার পরিকল্পনা চলছে।
অন্যদিকে, ইউনূস সরকার ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে সাজানো অভিযোগে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে, অথচ বহু দণ্ডপ্রাপ্ত ইসলামি জঙ্গিকে মুক্তি দিয়েছে।
প্রায় এক দশক আগে ঢাকায় মার্কিন নাগরিক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়কে হত্যার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সৈয়দ জিয়াউল হক ওরফে মেজর জিয়া যিনি আনসার আল ইসলাম সংগঠনের সক্রিয় সদস্য এখন আবার বাংলাদেশে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ইউনূস সরকারের ‘দয়া’ পেয়ে তিনি মুক্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
২০১৫ সালে অভিজিৎ রায়ের ওপর হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র তার গ্রেপ্তারে সহায়তা করতে তথ্যদাতাকে ৫০ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। একসময় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা থাকা জিয়াউল হক শুধু অভিজিৎ নয়, অন্যান্য লেখক ও প্রকাশকদের হত্যায়ও জড়িত ছিলেন। এমনকি তিনি শেখ হাসিনাকে হত্যার ও সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর ষড়যন্ত্রেও অংশ নিয়েছিলেন।
এখন তিনি ঢাকার বনানীর ডিফেন্স অফিসার্স হাউজিং সোসাইটির বিল্ডিং নম্বর ৩-এ বাস করছেন, যা মূলত সেনা কর্মকর্তাদের আবাসন এলাকা। একজন দণ্ডপ্রাপ্ত সন্ত্রাসী কীভাবে এমন জায়গায় অবাধে থাকতে পারেন। তা বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির অনেক কিছুই বলে দেয়।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, তিনি নিয়মিত কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করেন এবং ইসলামি মিলিশিয়া গঠনের পরিকল্পনা করছেন।
ব্রিগেডিয়ার আবদুল্লাহিল আজমি, যিনি একাধিক মামলায় কারাবাস শেষে পুনর্বহাল হয়েছেন, কথিতভাবে “ইরান স্টাইল ইসলামী বিপ্লবী বাহিনী” গঠনের পেছনের মূল পরিকল্পনাকারী।
অন্যদিকে, মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী যিনি ২০০৪ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে বিপুল অস্ত্র আনতে চাওয়ার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। তাকেও এই বছরের জানুয়ারিতে মুক্তি দেওয়া হয়। গোয়েন্দারা জানান, জুন মাসে তার চীন সফর ছিল নতুন অস্ত্র সংগ্রহের সম্ভাব্য প্রচেষ্টা।
এই চৌধুরী, আজমি, জিয়াউল হক, হাসান নাসিরসহ আরও কিছু সাবেক সেনা কর্মকর্তা জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য উগ্র ইসলামি দলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এক ধরনের ইসলামি মিলিশিয়া গঠনে কাজ করছেন। যার লক্ষ্য নির্বাচন জয়ের পাশাপাশি ভয় দেখিয়ে দেশ শাসন করা, ইরান বা আফগানিস্তানের মডেলে।
তাদের পরিকল্পনা হলো প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও সেনাবাহিনীতে নিজেদের অনুগতদের মাধ্যমে প্রতিপক্ষদের সরিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ইউনূস সরকারের মুক্তিপ্রাপ্ত আরও বহু জঙ্গি এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নেতা জসিমউদ্দিন রহমানিকেও আগেই মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
এদের নেতৃত্বে এখন দেশে “ইসলামপন্থী জনতা” নামে ছোট ছোট সন্ত্রাসী গোষ্ঠী গড়ে উঠছে, যারা প্রগতিশীল লেখক, চিন্তাবিদ বা সংগঠনের ওপর হামলা চালাতে প্রস্তুত।
যখন পশ্চিমা বিশ্ব ইউনূসকে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার নায়ক হিসেবে প্রশংসা করছে, বাস্তবে এই নোবেল বিজয়ীর নেতৃত্বে দেশটি দ্রুত এক ইসলামি জনতার শাসনে নেমে যাচ্ছে।
সম্প্রতি ঢাকার ওয়েস্টিন হোটেলে এক মার্কিন স্পেশাল ফোর্স সদস্যের রহস্যজনক মৃত্যু এবং এই সপ্তাহে মার্কিন দূতাবাসে সম্ভাব্য হামলার হুমকি। এই দুই ঘটনাই পশ্চিমাদের চোখ খুলে দেওয়ার মতো সংকেত। আরও দেরি হওয়ার আগেই তাদের উচিত বাংলাদেশে অনাদ্গত এই বিপজ্জনক বাস্তবতা বুঝে নেওয়া।
সুত্রঃ ইউররেশিয়া রিভিউ
সুবীর ভৌমিক দক্ষিণ এশিয়ার সংঘাত ও রাজনীতি বিষয়ক লেখক এবং বিশ্লেষক। তিনি বিবিসি ও রয়টার্সের সাবেক সংবাদদাতা ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে উপমহাদেশের রাজনীতি, জাতিগত সংঘাত ও সীমান্ত-নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে কাজ করছেন।