যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে ‘কঠোর জবাব’ দেবে ইরান
মেলবোর্ন, ১ মে- যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় হামলা চালালে কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন করে আঘাত এলে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক স্থাপনাগুলোতে পাল্টা…
মেলবোর্ন, ২৩ অক্টোবর- মর্গের সাদা প্যাকেটগুলোতে লেখা ছিল ‘অজানা ১৪’, ‘অজানা ১৫’, ‘অজানা ১২’। অচেনা নীরব দেহগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল এদের নাম নেই, পরিচয় নেই, আছে শুধু জ্বলে যাওয়া হাড়গোড় আর নিভে যাওয়া স্বপ্ন। পুড়ে কয়লা হওয়া দেহের মাঝেও কারও চোখ আধখোলা, কারও হাত প্যাকেটের বাইরে উঠে এসেছে। মনে হচ্ছিল মৃত্যু নয়, বাঁচার শেষ চেষ্টা হয়তো এখনো থেমে যায়নি। গুমোট গন্ধ, দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতা একসময়ে মর্গ থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে বাধ্য হলাম। পাশে ছিলেন গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির নেতা মিজানুর রহিম চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন। মর্গের সামনে তখনও অপেক্ষায় নিহতদের স্বজনরা। তারা জানে না, কোন সাদা প্যাকেটের ভেতর আছে তাদের আপনজনের দেহ, যার মুখ দেখা আর সম্ভব নয়।
মিরপুরের শিয়ালবাড়ি, ১৪ অক্টোবর ২০২৫ সালের সকাল। অন্য দিনের মতোই ব্যস্ততা, শ্রমিকদের পদচারণা, কারখানায় যাওয়ার তাড়াহুড়ো। কেউ ছিল নতুন সংসারের স্বপ্ন নিয়ে, কেউ বিদেশ যাওয়ার আশা বুকে নিয়ে, কেউ হয়তো প্রথম বেতনের অপেক্ষায়। কেউ ছিল মাত্র ১৪ বছরের কিশোরী মাহিরা আক্তার, কেউ বা সদ্য বিয়ে করা দম্পতি। কেউ জানত না, ঐ দিনই শেষবারের মতো তারা উঠেছিল জীবনের পথে।
এন আর ফ্যাশন নামের ওই পোশাক কারখানাটি ছিল একটি পাঁচতলা ভবনের ভেতরে। ৩৫-৪০ জন শ্রমিক সেদিন কাজ করছিলেন। ভবনের ঠিক উল্টো দিকে ছিল আলম ট্রেডার্স নামে একটি রাসায়নিক গুদাম অবৈধ, অনুমোদনহীন, অথচ বিপজ্জনক রাসায়নিকে ঠাসা। সকাল ১১টার দিকে বিকট শব্দ আর আগুনের বিস্ফোরণ সবকিছুকে গ্রাস করে নেয়। আগুন গুদাম থেকে লেলিহান শিখা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে কারখানাটিতে। ছাদ ও নিচতলার দরজা বন্ধ ছিল। আগুনে ঝলসে যাওয়ার আগে তারা বুঝতেও পারেননি যে পালানোর কোনো পথ নেই। ১৪-১৫ বছরের শিশুরাও ছিল মৃত্যুর এই ফাঁদে।
পরদিন আবার ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখলাম সেখানেও স্তব্ধ মানুষজন। আগুনে পোড়া দেয়াল, গলে যাওয়া লোহা, আর মানুষের আর্তনাদ যেন তখনও বাতাসে ভেসে আছে। পাশের গুদামে প্রবেশ করতে পারেনি উদ্ধারকর্মীরা, কারণ রাসায়নিকের বিষাক্ত ধোঁয়া আর বিস্ফোরণের ঝুঁকি তখনও রয়ে গেছে।
মর্গে গিয়ে আবার মনে হলো একই প্রশ্ন বারবার কেন এমন মৃত্যু, কেন এমন নিষ্ঠুর পুনরাবৃত্তি? তাজরীন ফ্যাশন, রানা প্লাজা, চকবাজার, হাশেম ফুড, টিকাটুলি ইতিহাস যেন একই সড়ক ধরে, একই মৃত্যুপুরীর দিকে বারবার নিয়ে যাচ্ছে আমাদের। আর আমরা শুধু সংখ্যাগুলো বদলে দিচ্ছি কিন্তু বদলাচ্ছে না বিচারহীনতার সংস্কৃতি।
গত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে শ্রমিকদের জীবন সস্তা হয়ে গেছে। ক্ষমতাবান মালিকেরা আইন ভেঙে, মানুষ পুড়িয়ে, মৃত্যু ডেকে এনে পার পেয়ে গেছে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পরেও কি চেহারা বদলাবে না এই সংস্কৃতি? অন্তর্বর্তী সরকার বারবার বলেছে, শ্রমিকের মর্যাদা ও শ্রম আইন সংস্কার তাদের অগ্রাধিকার। কিন্তু মিরপুরের এই ১৬ শ্রমিকের মৃত্যু সেই বিশ্বাসকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
এই মৃত্যু শুধু ১৬টি দেহ নয়। এটি হাজারো শ্রমিকের আর্তনাদ, বহু পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, আর রাষ্ট্রের প্রতি ভেঙে পড়া আস্থার নাম। এ মৃত্যু আমাদের ফের ইতিহাসের সামনে দাঁড় করিয়েছে, আমরা কি সত্যিই শিখেছি কিছু? আমরা কি এবার থামব? নাকি আবারও কোনো অজানা ১৪, অজানা ১৫ নম্বর প্যাকেটের সামনে দাঁড়িয়ে একই প্রশ্ন করব আর কত প্রাণ গেলে হবে বিচার?
বাংলাদেশ নতুন পথে হাঁটতে চাইলে শ্রমিককে বাদ দিয়ে তা কখনোই সম্ভব নয়। শ্রমিকই অর্থনীতির চালিকাশক্তি, শ্রমিকই গণতন্ত্রের বুনিয়াদ। তাই নতুন বাংলাদেশ মানে হতে হবে শ্রমিকবান্ধব বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিটি মানুষ নিরাপদে বাঁচার অধিকার পাবে। যেখানে মৃত্যুর আগে চিৎকার করে বলতে হবে না ‘আমরা বিচার চাই, মানুষ হিসেবে মর্যাদা চাই।’
তাসলিমা আখতার: সভাপ্রধান, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন ও বাংলাদেশ গামের্ন্ট শ্রমিক সংহতি
সুত্র- দ্য ডেইলি স্টার
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au