স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১ মে- জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, নির্বাচন নিশ্চিত করার স্বার্থেই তারা অনেক বিষয়ে আপস করেছিলেন এবং সেই কারণেই জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেন। তিনি দাবি করেন, সংস্কারের ‘বাহানায়’ যাতে নির্বাচন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেই আশঙ্কা থেকেই রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতে সমঝোতার পথে যেতে হয়েছিল।
বৃহস্পতিবার সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন আদেশকে অবৈধ ও সংবিধানবহির্ভূত বলে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন মহলের চাপ থাকলেও তারা সরাসরি সব কথা প্রকাশ করেননি, বরং নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। তিনি বলেন, পরে বিএনপির পক্ষ থেকে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়ে বলা হয়েছিল, জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে অন্য কোনো কিছু মেনে নেওয়া হবে না এবং এ বিষয়ে দলটির সংবাদ সম্মেলনের রেকর্ড ও ভিডিওও রয়েছে।
সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বিভিন্ন বুদ্ধিজীবী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অংশগ্রহণে দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন হয়। তিনি উল্লেখ করেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রশ্নে শুরুতেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল এবং সেখানে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমতসহ সনদ স্বাক্ষরের বিষয়টি নির্ধারিত হয়। তিনি বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেন, উভয় পক্ষই যখন সনদে স্বাক্ষর করেছে, তখন সেটি বাস্তবায়নে একসঙ্গে এগিয়ে আসা উচিত।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়েও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, সে সময় ভেতরে ও বাইরে দুই পক্ষের সমর্থনে সরকার পরিচালিত হয়েছে। কেউ সরাসরি ক্ষমতার ভেতরে ছিল, আবার কেউ বাইরে থেকে প্রভাব বিস্তার করেছে। বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সময়ের তুলনা করে তিনি ইঙ্গিত দেন, তখনকার অনেকেই এখন ভিন্ন অবস্থান নিচ্ছেন।
বাক্স্বাধীনতার প্রসঙ্গে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, স্বাধীনতার নামে অশালীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, এ ধরনের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের পরিবারকে জড়িয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের প্রবণতা নিয়ে তিনি কঠোর সমালোচনা করেন।
নতুন রাজনৈতিক শক্তি ও তরুণ নেতৃত্বের প্রতিও সতর্কবার্তা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, অতীতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যবহার করে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার উদাহরণ রয়েছে, তাই নতুনদের উচিত একই পথে না হাঁটা। তার ভাষায়, কোনো ঐতিহাসিক চেতনাকে রাজনৈতিক ব্যবসার উপকরণে পরিণত করা উচিত নয়।
বিরোধী দলের কার্যক্রম নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি। ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এতে দায়িত্ববোধ বাড়তে পারে, তবে একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিকভাবে আত্মতৃপ্তির একটি বিষয়ও হতে পারে। তিনি এ উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
সংসদে আলোচনার সময় ব্যাংক মালিকানা ও দখল প্রসঙ্গেও বিতর্ক ওঠে। এ বিষয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে ব্যাংক দখলের ঘটনা ঘটেছে। কেউ প্রভাব খাটিয়ে, আবার কেউ সরাসরি শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে এসব করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন।
এদিকে বিরোধীদলীয় এক নেতার বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি মন্তব্য করেন, রাজনৈতিক পরিচয় ও মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট দাবিগুলো নিয়েও এখন নানা ধরনের বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে দায়িত্বশীল আচরণ করা জরুরি।
সব মিলিয়ে সংসদে তার বক্তব্যে নির্বাচন, সংস্কার, রাজনৈতিক সমঝোতা, বাক্স্বাধীনতা ও সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা উঠে আসে, যা দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।