বাংলাদেশ

নয়াদিল্লিতে নির্বাসিত জীবন: শেখ হাসিনার নতুন অধ্যায়

  • 3:16 am - October 31, 2025
  • পঠিত হয়েছে:৭৯ বার
শেখ হাসিনা । ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৩১ অক্টোবর- বাংলাদেশের রাজনীতিতে নাটকীয় মোড় নেওয়ার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্রদের নেতৃত্বে সহিংস বিক্ষোভের মুখে তিনি ঢাকার গণভবন ত্যাগ করতে বাধ্য হন। সেই থেকেই তিনি ভারতের একটি নিরাপদ স্থানে অবস্থান করছেন,যা অনেকের মতে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

২০২৪ সালের আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় ব্যাপক ছাত্রবিক্ষোভ শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা দুর্নীতি, দমননীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে শেখ হাসিনার পদত্যাগ দাবি করেন। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সেনাবাহিনীর একটি অংশ সরকারের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়।

৪ আগস্ট রাতে গণভবন ঘেরাওয়ের পর, শেখ হাসিনা বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে পালিয়ে যান। ৫ আগস্ট সকালে তিনি ভারতের হিন্দন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছান। সঙ্গে ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন উপদেষ্টা ও নিরাপত্তা সদস্য।

ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল ও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পর তাকে দিল্লির একটি গোপন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ভারত সরকার তার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয়।

এই ঘটনা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম সংকটময় মুহূর্ত হিসেবে ইতিহাসে স্থান পায়। অনেকে একে ১৯৭৫ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের সঙ্গে তুলনা করেন,যে ঘটনায় তিনি বিদেশে অবস্থানকালে তার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হারান।

নয়াদিল্লির লুটিয়েন্স বাংলো জোনে উচ্চ নিরাপত্তায় এখন বাস করছেন শেখ হাসিনা। ভারত সরকার তার জন্য একটি “সেফ হাউস” বরাদ্দ করেছে। এলাকাটি সাধারণত প্রাক্তন সংসদ সদস্য ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত।

‘দ্য প্রিন্ট’ ও ‘রয়টার্স’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা সাধারণত শান্ত ও নিভৃত জীবন যাপন করছেন। তিনি নিয়মিত লোধি গার্ডেনে হাঁটতে যান, সঙ্গে থাকেন সাধারণ পোশাকে দুইজন নিরাপত্তা রক্ষী। অনেক সময় স্থানীয়রা তাকে চিনে ফেললে তিনি হাসি দিয়ে মাথা নাড়েন।

এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন,

“আমার জীবন এখন শান্ত, কিন্তু অসম্পূর্ণ। আমি দেশে ফিরতে চাই, তবে তখনই যখন সরকার বৈধ হবে, সংবিধান কার্যকর থাকবে এবং আইনশৃঙ্খলা সত্যিকারেরভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে।”

বাংলাদেশে এখন নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আছে। এই সরকার ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে। তবে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।

দলটি ঘোষণা দিয়েছে, শেখ হাসিনাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না দিলে তারা ভোট বর্জন করবে। আওয়ামী লীগের যুক্তি, এটি “গণতন্ত্রবিরোধী নিষেধাজ্ঞা” যা রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ধ্বংস করবে।

নির্বাসন থেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন,

“আমি এখনো দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কেবল মুক্ত, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনই দেশকে আরোগ্য দিতে পারে।”

তিনি যুক্তরাজ্যের ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকাকে আরও বলেন,

“মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে। তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা মানে জাতির অর্ধেকের কণ্ঠ রুদ্ধ করা। এমন সরকার কোনোভাবেই বৈধ হতে পারে না।”অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস সাম্প্রতিক এক বৈঠকে সতর্ক করেছেন যে শেখ হাসিনার দলকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত ঘিরে দেশি ও বিদেশি শক্তিগুলো নির্বাচন বানচালের চেষ্টা চালাতে পারে।

তার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান,

“দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে অনেক শক্তিশালী পক্ষ নির্বাচনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করবে। হঠাৎ করে হামলা বা সহিংসতা ঘটতে পারে।”

ইউনূস বলেছেন,

“এই নির্বাচন হবে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। পরিকল্পিতভাবে ভেতর ও বাইরে থেকে নানা রকম বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হবে। তবে সরকার নির্বাচন নির্ধারিত সময়ে সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। দিল্লিতে তিনি আপাতদৃষ্টিতে শান্তিতে থাকলেও, তার ঘনিষ্ঠদের মতে তিনি নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।

তিনি বিশ্বাস করেন, একদিন দেশে ফিরে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াই শেষ করবেন। তার নিজের ভাষায়-

“বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি, আমার সংগ্রামের মাটি। আমি একদিন অবশ্যই ফিরে যাব,যখন দেশের মানুষ আমাকে চাইবে।”

বর্তমানে বাংলাদেশ এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে একদিকে নির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অন্যদিকে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার। দুই নেতার এই বিপরীত অবস্থানই আগামী নির্বাচনের চিত্র ও দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।

 

এই শাখার আরও খবর

ঢাকা: কংক্রিটের দোজখ, মুক্তির রোডম্যাপ

মেলবোর্ন, ২৭ জুন- এক. দীর্ঘশ্বাসের শহর পঁচিশ বছরের বেশি সময় আমি ঢাকায় বসবাস করেছি। একটা প্রজন্ম। এই শহর আমাকে রুটি দিয়েছে, পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু আজ যখন…

রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে ১৬০ জন করে যুদ্ধবন্দি বিনিময়

মেলবোর্ন, ২৭ জুন- রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান যুদ্ধের মধ্যেই আরও এক দফা যুদ্ধবন্দি বিনিময় সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার (২৬ জুন) উভয় দেশই ১৬০ জন করে যুদ্ধবন্দিকে…

রোমে ছুরিকাঘাতে একই পরিবারের তিন বাংলাদেশি নিহত, গুরুতর আহত ছেলে

মেলবোর্ন, ২৭ জুন- ইতালির রাজধানী রোমে একই পরিবারের তিন বাংলাদেশি নাগরিককে নৃশংসভাবে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। ভয়াবহ এ হামলায় পরিবারের ১৮ বছর বয়সী ছেলে গুরুতর আহত…

ভেনিজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ৯২০

মেলবোর্ন, ২৭ জুন- ভেনিজুয়েলায় আঘাত হানা শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯২০ জনে পৌঁছেছে। দেশটির এক শতকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ এ প্রাকৃতিক দুর্যোগে…

কাঁটাবনে আল বারাকা টাওয়ারে আগুন, ২ জনের মৃত্যু

মেলবোর্ন, ২৭ জুন- রাজধানীর কাঁটাবনের একটি আবাসিক ভবনের দুটি ফ্ল্যাটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে দুই যুবকের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (২৭ জুন) দিবাগত রাতে আগুন লাগার এ…

যেভাবে ভবিষ্যৎ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী

মেলবোর্ন, ২৭ জুন- ভবিষ্যতের যুদ্ধকে সামনে রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মহাকাশ প্রযুক্তি, সাইবার যুদ্ধ, স্যাটেলাইট যোগাযোগ এবং ইলেকট্রনিক স্পেকট্রাম সক্ষমতা বাড়াতে ব্যাপক পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au