বিশ্ব

বন্ডাই হামলা অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন নীতির কোন সত্য উন্মোচন করল- ক্লেয়ার লেম্যান এর মতামত অবলম্বনে

  • 9:27 am - December 24, 2025
  • পঠিত হয়েছে:২৬৩ বার
হামলার স্থানে নিহতদের স্মরণে দাঁড়িয়ে শোকাহত স্বজনরা। ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন ২৪ ডিসেম্বর: বন্ডাই বিচে সংঘটিত ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলাকে অনেকেই একটি বিচ্ছিন্ন, অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংস ঘটনা হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন। কিন্তু সাংবাদিক ও বিশ্লেষক ক্লেয়ার লেম্যান মনে করেন, এই হামলাটি মোটেও আকস্মিক নয়। বরং এটি অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘদিনের অভিবাসন ও একীভূতকরণ নীতির ব্যর্থতার একটি অনিবার্য পরিণতি।

তিনি দেখান, ১৯৯০–এর দশকের পর থেকে অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থা ধীরে ধীরে ‘একীভূতকরণ ও সামাজিক সংহতি’ থেকে সরে গিয়ে ‘সংখ্যা, গতি ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির’ দিকে ঝুঁকে পড়ে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ভিসা ও অস্থায়ী ভিসাগুলো নীরবে স্থায়ী বসবাসের পথে পরিণত হয়। একই সময়ে চরমপন্থা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সতর্ক সংকেতগুলোকে অবহেলা করা হতে থাকে।

সাজিদ আকরাম ১৯৯৮ সালে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশ করেন স্টুডেন্ট ভিসায়। স্টুডেন্ট ভিসা মানে অস্ট্রেলিয়ান জাতির অংশ হওয়া নয়, বরং সাময়িকভাবে পড়াশোনার অনুমতি, এই শর্তে যে শেষে নিজ দেশে ফিরে যাবেন। কিন্তু বাস্তবে এই ভিসাই হয়ে ওঠে স্থায়ী বসবাসের প্রথম ধাপ।

সেই সময় অভিবাসন দপ্তরের ডেপুটি সেক্রেটারি ছিলেন আবুল রিজভি। তিনি সম্প্রতি একটি পডকাস্টে বলেন, ২০০১ সালের অভিবাসন নীতির পরিবর্তনের পেছনে প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল জনসংখ্যা বৃদ্ধির চিন্তা, আর মাত্র ১০ শতাংশ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চাপ। 

গত দুই দশকে দুই মিলিয়নের বেশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী কর্মী অস্ট্রেলিয়ায় এসেছেন, যাদের বড় অংশ স্থায়ী হয়ে গেছেন। রিজভি স্বীকার করেন, আজ যদি এই নীতির ওপর গণভোট হতো, জনগণ তা সমর্থন করত না।

তিনি আরও বলেন, “২০০১ সালে ভাগ্য ভালো ছিল, কেউ খেয়াল করেনি।” কিন্তু ২৪ বছর পরে মানুষ খেয়াল করছে, কারণ তার মূল্য এখন রক্ত দিয়ে দিতে হচ্ছে।

যদি সাজিদ আকরামকে কখনো অস্ট্রেলিয়ায় ঢুকতে দেওয়া না হতো, তাহলে হয়তো বন্ডাইর সেই দিনে ১৫ জন মানুষ আজও জীবিত থাকতেন।

হামলার পর রিজভি সামাজিক মাধ্যমে বলেন, আকরাম ২৫ বছর ধরে স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন এবং তার ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেওয়া নাগরিক। এই তথ্যগুলো বরং আরও গভীর ভাবে উদ্বিগ্ন করে তোলে। যদি কেউ এখানে দশকের পর দশক থাকে, সন্তান জন্ম দেয়, তবুও সন্ত্রাসে জড়ায়, তাহলে প্রশ্নটা দাঁড়ায় আমরা কাকে দেশে ঢুকতে দিচ্ছি, সেটা কতটা যাচাই করছি।

আকরাম এর ছেলে অস্ট্রেলিয়াতেই চরমপন্থায় দীক্ষিত হয়। আদালতের নথি ও গণমাধ্যম অনুযায়ী, সে উগ্রপন্থী প্রচারক উইসাম হাদ্দাদ ও আল মাদিনা দাওয়াহ সেন্টারের প্রভাবে পড়ে, যাকে অনেকেই ‘ঘৃণার কারখানা’ বলে বর্ণনা করেছেন। এই উগ্রবাদ কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে নয়, জন্ম নেয় সিডনির উপশহরে।

এক পর্যায়ে তার নাম অস্ট্রেলিয়ান সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশন (ASIO) -র নজরদারি তালিকায় ওঠে। তবুও তার বাবা সাজিদ আকরাম বিদেশ ভ্রমণ অব্যাহত রাখেন, অস্ত্রের লাইসেন্স ধরে রাখেন, এমনকি দুজনেই ফিলিপাইনে সামরিক প্রশিক্ষণ নেন বলে অভিযোগ ওঠে। এতকিছুর পরেও তার ভিসা বাতিল করা হয়নি।

এটি কোনো একটি ভুল নয়। এটি একটি ব্যবস্থাগত ব্যর্থতা। একবার কাউকে স্থায়ী বাসিন্দা করে নেওয়ার পর রাষ্ট্র যেন দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ায়। ঝুঁকি চিহ্নিত হয়, কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

অবশ্যই অধিকাংশ অভিবাসী শান্তিপ্রিয় ও দেশের জন্য সম্পদ। সিরিয়া থেকে আসা আহমেদ আল আহমেদের সাহসী ভূমিকা সেটাই প্রমাণ করে। কিন্তু অভিবাসন নীতিও ঝুঁকি বহন করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অস্ট্রেলিয়া অর্থনৈতিক সুবিধা ও মানবিক ভাবমূর্তির জন্য নিরাপত্তা ও সামাজিক সংহতিকে বলি দিয়েছে, যার মূল্য আজ দিতে হচ্ছে ইহুদি সম্প্রদায়সহ সাধারণ নাগরিকদের।

বন্ডাই হামলা  নির্মমভাবে দেখিয়েছে, সময় নিজে থেকেই কাউকে অস্ট্রেলিয়ান করে তোলে না। এখানে জন্ম নেওয়াও আনুগত্যের নিশ্চয়তা নয়। কাগজপত্র বিশ্বাস বদলায় না।

আজ টনি বার্ক সেই একই ব্যবস্থা পরিচালনা করছেন, কিন্তু আরও বিপজ্জনক এক বিশ্বে, আরও কম ভুলের সুযোগ নিয়ে। আলবানিজ সরকার সম্প্রতি আইএস সদস্যদের পরিবারকে সিরিয়া থেকে ফিরিয়ে এনেছে, এমন সময়ে যখন ASIO নিজেই জনবল সংকটে ভুগছে।

দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি শুধু হাসপাতাল আর রাস্তায় চাপ ফেলে না, এটি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও ভেঙে দেয়, যারা হুমকি শনাক্তের দায়িত্বে রয়েছে।

বন্ডাইর এক নিহতের মেয়ের মুখোমুখি হয়ে টিভিতে টনি বার্কের অস্বস্তি ছিল স্পষ্ট। কারণ মানুষ মারা যাওয়ার পর এমন নীতি রক্ষা করা নৈতিকভাবে অসম্ভব।

অভিবাসন নীতি আর কাগজপত্রের খেলা হতে পারে না। মানুষ সংখ্যা নয়, তারা বিশ্বাস ও আদর্শ বহন করে। কিছু আদর্শ শান্তিপূর্ণ বহুত্ববাদী সমাজের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

আকরাম এর ঘটনা দেখিয়েছে, অবিবেচক সিদ্ধান্তের মূল্য কত ভয়াবহ হতে পারে।

রিজভি একসময় বলেছিলেন, “ঝুঁকি না নিলে লাভও হয় না।”
বন্ডাই র সেই রোববার, অস্ট্রেলিয়া সেই ঝুঁকির মূল্য রক্ত দিয়ে দিয়েছে।

লেখক | Claire Lehmann
ক্লেয়ার লেহমান আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত সাময়িকী Quillette–এর প্রতিষ্ঠাতা, স্বত্বাধিকারী ও প্রধান সম্পাদক। তিনি অস্ট্রেলিয়ার প্রভাবশালী দৈনিক The Australian এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণধর্মী প্ল্যাটফর্ম The Dispatch–এ নিয়মিত কলাম ও মতামত লিখে থাকেন। অভিবাসন, গণতন্ত্র, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক চরমপন্থা নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ পশ্চিমা বিশ্বে ব্যাপকভাবে আলোচিত ও উদ্ধৃত হয়।

অনুবাদ ও বিশ্লেষণ: ড. প্রদীপ রায়

এই শাখার আরও খবর

সরকার চায় ঐক্য, একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি: প্রধানমন্ত্রী

দেশের সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্য গড়ে তুলতে চায় সরকার। তবে সরকার যখন সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন একটি মহল দেশে বিভ্রান্তি ছড়ানোর…

ইশরাকের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে প্রজ্ঞাপন জারি

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি। এ বিষয়ে মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে…

মসজিদে বয়ানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য খতিবের, নিরব প্রশাসন

ঢাকার খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ এলাকার টানপাড়ার জামতলা জামে মসজিদে জুমার বয়ানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রসাদ নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে মসজিদটির অস্থায়ী খতিব…

কিম জং উনের স্বাস্থ্য নিয়ে গুঞ্জন, কী জানা যাচ্ছে?

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের শারীরিক অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জল্পনা ছড়িয়েছে। সম্প্রতি তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে কোমায় আছেন বলে কিছু…

ফ্রান্সজুড়ে চলছে দাঙ্গা-লুটপাট, প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে কারফিউ জারি

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ থেকে ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় রাজধানী প্যারিসের কয়েকটি এলাকা এবং দেশটির বিভিন্ন শহরে রাতের কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে…

নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ১৪, আহত ৩২

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩২ জন। আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au