বাংলাদেশে এক হিন্দু পোশাকশ্রমিকের হত্যার প্রতিবাদে ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ। পুলিশের বসানো ব্যারিকেড ভেঙে বাংলাদেশি হাইকমিশনের খুব কাছে চলে আসে বিক্ষোভ মিছিল। (AFP)
মেলবোর্ন ২৪ ডিসেম্বর: বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সহিংস বিক্ষোভের সময় এক হিন্দু যুবকের নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঢাকা ও দিল্লির মধ্যকার ইতোমধ্যে টানাপোড়েনে থাকা সম্পর্ককে আরও গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছে। দুই প্রতিবেশী দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে সম্পর্ক অস্থিতিশীল করার অভিযোগ তুলছে, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে প্রশ্ন-দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত এই সম্পর্ক কি ভাঙনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে?
ভারতে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো বিক্ষোভে নেমেছে। নিহত ব্যক্তি, ২৭ বছর বয়সী দিপু চন্দ্র দাস, বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন সদস্য। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে গত সপ্তাহে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তাঁকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়।
রাজধানীতে ছাত্রনেতা শরীফ ওসমান হাদীর হত্যার প্রতিবাদে এই হত্যাকাণ্ডের সময়ই ঢাকায় চলছিল তীব্র বিক্ষোভ। হাদীর সমর্থকেরা দাবি করেন, মূল সন্দেহভাজন ব্যক্তি, যিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ, তিনি ভারতে পালিয়ে গেছেন। এই দাবি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাবকে আরও উসকে দেয়। তবে বাংলাদেশ পুলিশ জানায়, সন্দেহভাজনের দেশত্যাগের কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।
এই উত্তেজনার মধ্যে দুই দেশই দিল্লিসহ কয়েকটি শহরে ভিসা সেবা স্থগিত করেছে এবং একে অপরের কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ তুলেছে। দুই দেশ একে অপরের হাইকমিশনারকে তলবও করেছে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাস বিবিসিকে বলেন, “আমি আন্তরিকভাবে আশা করি পরিস্থিতি দুই পক্ষেই আর খারাপের দিকে যাবে না।” তিনি যোগ করেন, বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিরতা ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে তা অনুমান করা কঠিন করে তুলেছে।
বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে ভারতের প্রভাব নিয়ে অনেক বাংলাদেশি সবসময়ই ক্ষুব্ধ ছিলেন। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর সেই ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে, বিশেষ করে দিল্লি তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে রাজি না হওয়ায়।
হাদীর হত্যার পর কিছু তরুণ নেতা প্রকাশ্যে ভারতবিরোধী উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিক্ষোভকারীরা ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের দিকে অগ্রসর হতে চাইলে নিরাপত্তা বাহিনী বাধা দেয়। চট্টগ্রামে ভারতের সহকারী হাইকমিশনের ভবনে পাথর ছোড়া হয়। পুলিশ ১২ জনকে আটক করলেও পরে অভিযোগ ছাড়াই মুক্তি দেয়।
ভারতেও পাল্টা বিক্ষোভ হয়েছে। দিল্লিতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভবনের সামনে একটি হিন্দু সংগঠনের বিক্ষোভকে বাংলাদেশ সরকার “অযৌক্তিক” বলে নিন্দা জানিয়েছে।
বাংলাদেশের সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, “আমি আগে কখনো দুই দেশের মধ্যে এমন সন্দেহ আর অবিশ্বাস দেখিনি।” তিনি উভয় পক্ষকে কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
দিপু দাসের নির্মম হত্যাকাণ্ড ভারতীয় জনমনে ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে। পোশাক কারখানার শ্রমিক দাসকে নবী মুহাম্মদকে অবমাননার অভিযোগে গাছে বেঁধে পুড়িয়ে মারা হয়। এই হত্যার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দুই দেশেই প্রবল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার বলেছে, “নতুন বাংলাদেশে এ ধরনের সহিংসতার কোনো জায়গা নেই।” পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনায় ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, দিপু দাসের মৃত্যু আবারও বাংলাদেশে সংখ্যালঘু ও নাগরিক সমাজের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। শেখ হাসিনার পতনের পর ধর্মীয় মৌলবাদীরা আরও সাহসী ও অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। তারা সুফি দরগাহ ভাঙচুর করেছে, হিন্দুদের ওপর হামলা চালিয়েছে, কোথাও নারীদের ফুটবল খেলতে বাধা দিয়েছে এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী বলেন, “কট্টরপন্থীরা এখন নিজেদের মূলধারার অংশ মনে করছে। তারা বহুত্ববাদ বা ভিন্নমত সহ্য করতে চায় না।” তিনি বলেন, “কাউকে ‘ভারতপন্থী’ বলে দাগিয়ে দিলে তাকে আক্রমণের সামাজিক অনুমোদন তৈরি হয়।”
অনেকেই মনে করছেন, কট্টর ইসলামপন্থীরাই গত সপ্তাহে বাংলাদেশের দুটি শীর্ষ দৈনিক পত্রিকা ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো–র ভবন এবং একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে জড়িত ছিল।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোও গত এক বছরে গণপিটুনি ও সহিংসতা বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।
বিশ্লেষক আশোক স্বাইন বলেন, দুই দেশেরই ডানপন্থী রাজনীতিকেরা নিজেদের স্বার্থে উত্তেজনা উসকে দিচ্ছেন। সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলেন, “ভারতের বড় একটি অংশের মিডিয়াও বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক অরাজকতায় নিমজ্জিত দেশ হিসেবে দেখাচ্ছে।”
তিনি সতর্ক করেন, বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন নির্ধারিত। এর আগে পর্যন্ত ইউনুস সরকারকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায় বিএনপি জয়ী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে জামায়াতে ইসলামীর মতো দল বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
আসিফ বিন আলী বলেন, “এই ভারতবিরোধী রাজনীতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী ভারত নয়, বরং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও উদারপন্থীরা।”
ভারতের নীতিনির্ধারকরাও পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝছেন। দেশটির সংসদীয় একটি কমিটি বলেছে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি ১৯৭১–এর পর ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ।
হুমায়ুন কবির বলেন, “আমরা প্রতিবেশী ও পারস্পরিক নির্ভরশীল।” দিল্লি ইতোমধ্যেই জানিয়েছে, নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত তারা।
ততদিন পর্যন্ত বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন-রাস্তায় জমে ওঠা ক্ষোভ যেন দুই দেশের সম্পর্ককে আরও বিপজ্জনক পথে ঠেলে না দেয়।
প্রতিবেদক: আনবার্সন এথিরাজন, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স করেসপন্ডেন্ট, BBC, প্রকাশিত: ২৪ ডিসেম্বর
অনুবাদ ও সম্পাদনায়: ড. প্রদীপ রায়