বাংলাদেশ

চীনের সামরিক ও অবকাঠামো প্রস্তাব

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ কী দীর্ঘমেয়াদি ফাঁদে পড়ছে

  • 11:31 pm - January 25, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৮২ বার

মেলবোর্ন ২৫ জানুয়ারি- বাংলাদেশ ধীরে ধীরে এমন এক কৌশলগত পথে এগোচ্ছে, যা আগামী কয়েক দশকে দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা কাঠামোকে আমূল বদলে দিতে পারে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের সময়ে ঢাকা ক্রমেই চীনের ঘনিষ্ঠ বলয়ে প্রবেশ করছে। যেখানে পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। সরকার যাকে উন্নয়ন সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন হিসেবে তুলে ধরছে, সমালোচকদের চোখে তা হয়ে উঠছে দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামো।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এই উদ্বেগ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন চীনা সম্পৃক্ততার সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করলে তা শুধু বেইজিং নয়, ঢাকাতেও আলোড়ন তোলে। তার মন্তব্য আসে এমন এক সময়ে, যখন ইউনুস প্রশাসন চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামো খাতে একাধিক বড় চুক্তি দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে।

যুদ্ধবিমান কেনায় আলোচনা
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে সামরিক সহযোগিতা। বাংলাদেশ চীনের জে–১০সি যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাবনা পর্যালোচনা করছে এবং একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান নিয়েও আলোচনা চালাচ্ছে। উভয় প্ল্যাটফর্মই চীনা প্রযুক্তিনির্ভর।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এসব অস্ত্রব্যবস্থা শুধু এককালীন কেনাকাটায় সীমাবদ্ধ নয়। এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ, সফটওয়্যার আপডেট ও লজিস্টিক সহায়তা, যা কার্যত বাংলাদেশকে চীন ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা অবকাঠামোর সঙ্গে বহু বছরের জন্য যুক্ত করে ফেলতে পারে।

পাকিস্তানের অতি আগ্রহ
পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও এই সম্পৃক্ততার বিষয়টি গোপন রাখা হয়নি। ইসলামাবাদের সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জহির আহমেদ বাবর সিধু বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর প্রধান হাসান মাহমুদ খানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সেই আলোচনায় জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রির পাশাপাশি সুপার মুশশাক প্রশিক্ষণ বিমান দ্রুত সরবরাহের প্রস্তাব ছিল, যার সঙ্গে থাকবে পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ প্যাকেজ।

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান নিজেকে চীনা সামরিক সরঞ্জামের একটি কার্যকর প্রবেশদ্বার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সামরিক আলোচনায় শুধু যুদ্ধবিমান নয়, বরং দ্রুত সরবরাহ, প্রশিক্ষণ কাঠামো ও সমন্বিত সহায়তা ব্যবস্থার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এটিকে পরিকল্পিত কৌশলগত নির্ভরতার উদাহরণ হিসেবে দেখছেন অনেকে।

তিস্তা মাস্টার প্ল্যান নিয়েও প্রশ্ন
চীনের প্রভাব সামরিক খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রস্তাবিত তিস্তা নদী মাস্টার প্ল্যান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বেইজিং যে পরিকল্পনাটি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে চায়, তার ব্যাপ্তি, স্বচ্ছতার অভাব এবং ভৌগোলিক অবস্থান উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। শিলিগুড়ি করিডরের কাছাকাছি এলাকায়, চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের উপস্থিতিতে পরিকল্পনাটি ঘোষিত হওয়ায় সীমান্তসংলগ্ন সংবেদনশীল অঞ্চলে চীনের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি নিয়ে আশঙ্কা জোরালো হয়েছে।

মার্কিন ও চীনা রাষ্ট্রদূতের পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া
এ প্রেক্ষাপটে ২২ জানুয়ারি মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বেইজিং। চীনা দূতাবাসের এক মুখপাত্র মন্তব্যগুলোকে দায়িত্বজ্ঞানহীন ও ভিত্তিহীন বলে আখ্যা দেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক উন্নয়নের পক্ষে সহায়ক আচরণে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান।

কূটনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, এই অস্বাভাবিকভাবে কঠোর প্রতিক্রিয়া চীনের উদ্বেগকেই প্রকাশ করে, বিশেষ করে বাংলাদেশের কৌশলগত সিদ্ধান্তে তাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক নজর বাড়ছে বলে।

সিনেট শুনানিতে ঝুঁকির কথা স্বীকার
মার্কিন সিনেটে নিজের নিশ্চিতকরণ শুনানিতে রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেনও এসব ঝুঁকির কথা স্বীকার করেছিলেন। সিনেটর পিট রিকেটসের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চীনা যুদ্ধবিমান কেনা হলে বাংলাদেশ বহু দশক ধরে বেইজিংয়ের প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়তে পারে। তিনি আশ্বাস দেন, যুক্তরাষ্ট্র এই ধরনের নির্ভরতার ঝুঁকি স্পষ্টভাবে তুলে ধরবে এবং একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগিতার সম্ভাব্য সুফলও ব্যাখ্যা করবে।

এর মধ্যেই দেশে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দ্রুত বদলাচ্ছে। ইউনুস আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি একটি গণভোট আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছেন। সমালোচকদের মতে, এই পদক্ষেপ তার ক্ষমতা বৈধতা ও সংহত করার কৌশল। রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় হলে, চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে গভীর সমন্বয়ের পথে অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ কমে যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও পরিস্থিতি কঠিন
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরিস্থিতি সহজ নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি ইউনুসের দীর্ঘদিনের বৈরিতা এবং ক্লিনটন ও সোরোস নেটওয়ার্কের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার কথা ওয়াশিংটনে আলোচিত।

বিশ্লেষকদের মতে, আগের অনেক বাংলাদেশি নেতা যেখানে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেছেন, সেখানে ইউনুস প্রশাসনের নীতি তুলনামূলকভাবে একদিকে ঝুঁকে পড়ছে।

এই প্রক্রিয়ার মূল ঝুঁকি শুধু বিদেশি প্রভাব নয়, বরং বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ক্ষয়। অভিজ্ঞতা বলছে, চীনা প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামো চুক্তিতে প্রবেশ করা দেশগুলোর জন্য সেখান থেকে বেরিয়ে আসার খরচ অনেক সময় অত্যন্ত বেশি হয়ে ওঠে। ঋণ, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা এবং কূটনৈতিক অবস্থান ধীরে ধীরে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
গণভোট যত কাছে আসছে এবং চুক্তির সংখ্যা যত বাড়ছে, প্রশ্নটি আর শুধু বাংলাদেশ কোন দিকে ঝুঁকছে তা নয়। মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে, ভবিষ্যতে এই পথ থেকে ফিরে আসার বাস্তব সুযোগ আদৌ থাকবে কি না।

ইতিহাস বলছে, ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য এমন কৌশলগত সমন্বয় খুব কম ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদে অনুকূল ফল বয়ে আনে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে, মুহাম্মদ ইউনুস হয়তো রাজনৈতিক ক্ষমতা সংহত করতে পারবেন, তবে তার মূল্য দিতে হতে পারে বাংলাদেশের স্বাধীন কৌশলগত ভবিষ্যৎকে।

 

এই শাখার আরও খবর

কিম জং উনের স্বাস্থ্য নিয়ে গুঞ্জন, কী জানা যাচ্ছে?

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের শারীরিক অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জল্পনা ছড়িয়েছে। সম্প্রতি তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে কোমায় আছেন বলে কিছু…

ফ্রান্সজুড়ে চলছে দাঙ্গা-লুটপাট, প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে কারফিউ জারি

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ থেকে ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় রাজধানী প্যারিসের কয়েকটি এলাকা এবং দেশটির বিভিন্ন শহরে রাতের কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে…

নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ১৪, আহত ৩২

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩২ জন। আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন…

পূজা দেখে ফেরার পথে ট্রলারডুবি, মেয়ে নিহত মা নিখোঁজ

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  পিরোজপুরে দুর্গাপূজা দেখে বাড়ি ফেরার পথে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ট্রলারডুবিতে প্রাণ গেছে আট বছরের শিশু অর্পিতা বেপারীর। এ ঘটনায় তার মা রিনা…

রেমিট্যান্স নেবে সরকার, প্রবাসীদের মরদেহের দায় কেন নেবে না?

সৌদি আরবে দুই চ নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিথি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা, প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে…

ছেলেকে নায়ক বানাতে বাড়ি-গাড়ি বন্ধক রেখেছিলেন হৃতিকের বাবা

হৃতিক রোশন এখন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা। তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে তার পরিবারের এই অবস্থানে আসার পথটি সহজ…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au