মার্কিন অবরোধ ভেঙে দক্ষিণের বন্দরে ইরানি জাহাজ, দাবি ইরানি সেনাবাহিনীর
মেলবোর্ন, ২১ এপ্রিল- ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, একটি ইরানি তেলবাহী জাহাজ মার্কিন অবরোধ অমান্য করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি বন্দরে সফলভাবে নোঙর করেছে। সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে…
মেলবোর্ন, ৯ ফেব্রুয়ারি: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর একটি লেখা হয়েছে নির্বাচনকে ঘিরে সংখ্যালঘুদের ওপর সংঘটিত সহিংসতার মধ্য দিয়ে। জাতীয় নির্বাচন যখন আসে, তখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে দুর্বল মানুষেরা সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ হয়ে পড়ে!
এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও কার্যকর সুরক্ষা কাঠামোর ঘাটতি এই ঝুঁকিকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন সপ্রাণের সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদন এই বাস্তবতাকে শুধু তুলে ধরেনি, বরং পরিসংখ্যান দিয়ে রাষ্ট্রকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন ঠেকানো তো দূরের কথা, উল্টো অনেক সময় তা উসকে দেওয়া হয়।
গত দুই দশকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা ঘটে। ওই সময় অন্তত ৭৮টি বড় ধরনের ঘটনার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়—যা এই সময়সীমার মধ্যে সর্বোচ্চ। পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে ঘটনার সংখ্যা ওঠানামা করলেও সহিংসতার ধরন বদলেছে – তা হয়েছে আরও লক্ষ্যভিত্তিক, আরও পরিকল্পিত। অর্থাৎ, হামলা এখন আর কেবল উন্মত্ততার বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি কৌশলগতভাবে ভয় দেখানো ও জায়গা দখলের অস্ত্র।
সহিংসতা ধরন বিশ্লেষণ করলে আরো ভয়ঙ্কর চিত্র ফুটে ওঠে। মোট ঘটনার ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল সরাসরি শারীরিক আক্রমণ ও হত্যাকাণ্ড। প্রায় ২৯ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক সহিংসতা – প্রাণনাশের হুমকি, এলাকা ছাড়ার আলটিমেটাম, জমি দখলের মতো অপরাধ এতে অন্তর্ভুক্ত। ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ে হামলার হার ছিল ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ। আর ৩ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা – যার নির্মম উদাহরণ ২০১৮ সালের সুবর্ণচরের ঘটনা। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো একটি ধারাবাহিক সহিংসতার মানচিত্র।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো – নির্বাচনের দিনের চেয়ে নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সহিংসতার মাত্রা বেশি থাকে। অর্থাৎ, ভোটের আগের ভীতি প্রদর্শন ও ভোটের পর প্রতিহিংসা – এই দুই ধাপে সংখ্যালঘুদের ওপর আঘাত নেমে আসে বেশি। এটি প্রমাণ করে, সহিংসতা কেবল আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বিকৃত রূপ। ক্ষমতার পালাবদলে প্রতিশোধ নেওয়ার যে প্রবণতা, তার সহজ শিকার হয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়।
এই প্রেক্ষাপটে “ভোটব্যাংক” রাজনীতির ধারণা আরও বিপজ্জনক। সংখ্যালঘু ভোটারদের নাগরিক হিসেবে না দেখে সংখ্যার হিসাব হিসেবে দেখা হলে তারা ক্ষমতার লড়াইয়ে দরকষাকষির বস্তুতে পরিণত হয়। মাঠের রাজনীতিতে শোনা যায় – কোন আসনে কে জিতবে তা নাকি নির্ভর করে সংখ্যালঘু ভোটের সমীকরণের ওপর। এই ভাষা নিজেই সহিংসতার বীজ বপন করে, কারণ তখন ভোটার নয় – টার্গেট তৈরি হয়। প্রথম আলোর কয়েকটি প্রতিবেদনে ফুটে এসেছে অনেক আসনেই ফলাফল নির্ধারণ করবে সংখ্যালঘুরা!
এবারের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিযোগিতা তীব্র, শক্তির ভারসাম্য বদলেছে, স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভ জমেছে। কিন্তু এই উত্তাপের দায় সংখ্যালঘু নাগরিকদের ওপর চাপানো যাবে না। যে রাজনীতি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, সে রাজনীতি গণতন্ত্রের নামে ক্ষমতার দখলদারি মাত্র।
সপ্রাণ যে সুপারিশগুলো দিয়েছে, সেগুলো কোনো বিলাসী দাবি নয় – এগুলো ন্যূনতম রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে – চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রংপুর, দিনাজপুরসহ – আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান ও কার্যকর উপস্থিতি বাড়াতে হবে। সংখ্যালঘু নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক সম্পৃক্ততা জোরদার করতে হবে। অনলাইন গুজব ও উসকানি ঠেকাতে ডিজিটাল মনিটরিং ও ফ্যাক্ট-চেক ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় জরুরি প্রতিক্রিয়া ইউনিট গঠন করে ঘটনার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
এখন প্রশ্ন একটাই: রাষ্ট্র কি এবারও ঘটনার পর শোকবার্তা দিয়ে দায় সারবে, নাকি আগাম প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে? নির্বাচন মানে শুধু ব্যালট বাক্স বসানো নয়; নির্বাচন মানে নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোনো নির্বাচনই অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই সত্য অস্বীকার করলে আমরা বারবার একই আগুনে পুড়ব – আর প্রতিবারই পুড়বে সেই একই মানুষগুলো, যাদের সুরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপরই ন্যস্ত। তাহলে রাষ্ট্র কি এবার অন্তত সেই দায় সত্যিকার অর্থে নেবে?
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au