মেলবোর্ন, ১০ ফেব্রুয়ারি- নরসিংদী জেলায় গত ১৮ মাসে খুন, ধর্ষণ ও চুরি–ছিনতাইয়ের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এই সময়ে জেলায় ১৪৭টি খুন, ৯৫টি ধর্ষণ এবং ১৯৫টি চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ছয়টি উপজেলাজুড়ে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার এবং নানা ধরনের অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সাধারণ ভোটাররা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ওই সময় কারাগার থেকে রাইফেল ও শটগানসহ ৮৫টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৮ হাজার ১৫ রাউন্ড গুলি লুট হয়। দেড় বছরে ৫৮টি অস্ত্র উদ্ধার হলেও এখনো ২৭টি অস্ত্র এবং ৬ হাজার ৩৩৬ রাউন্ড গুলির কোনো সন্ধান মেলেনি।
অভিযোগ রয়েছে, লুট হওয়া অস্ত্র আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, মাদক ও অবৈধ বালু ব্যবসা এবং চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে। আগে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বেশি থাকলেও এখন ছিনতাই, জমিসংক্রান্ত বিরোধ, ইন্টারনেট–ডিশ সংযোগ কিংবা বালু ব্যবসার মতো তুচ্ছ ঘটনাকেও কেন্দ্র করে খুনের ঘটনা ঘটছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ৬ জন, আগস্টে ২৩ জন, সেপ্টেম্বরে ১২ জন, অক্টোবরে ১২ জন, নভেম্বরে ৬ জন এবং ডিসেম্বরে ৭ জন খুন হন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ১০ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪ জন, মার্চে ৯ জন, এপ্রিলে ১০ জন, মে মাসে ১২ জন, জুনে ৫ জন, জুলাইয়ে ৩ জন, আগস্টে ৩ জন, সেপ্টেম্বরে ৮ জন, নভেম্বরে ৩ জন এবং ডিসেম্বরে ৭ জন খুন হন। চলতি বছরের জানুয়ারিতেও আরও ৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলা, ফটক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ৮২৬ বন্দি পালিয়ে যায়। পরে ৪৮৬ জন স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেন এবং ১৬৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে অস্ত্র ও গুলির একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার না হওয়ায় অপরাধীদের হাতে সেগুলো ব্যবহারের আশঙ্কা বাড়ছে।
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার চরাঞ্চল, বিশেষ করে বাঁশগাড়ী ও সায়দাবাদ গ্রাম দীর্ঘদিন ধরেই ‘ক্রাইম জোন’ হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব এলাকায় অপরাধীরা প্রকাশ্যে অবৈধ অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্ত্রাসীদের হাতে থাকা অবৈধ রাইফেলের ছবিও ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, নরসিংদীতে এত অস্ত্র আসছে কোথা থেকে। তাঁদের মতে, নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই রায়পুরা ও নরসিংদী সদর উপজেলার চরাঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ে এবং অস্ত্রের ঝনঝনানি শোনা যায়।
নরসিংদীর পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ্-আল-ফারুক বলেন, লুট হওয়া অস্ত্রের বেশির ভাগই ইতোমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলমান রয়েছে এবং অপরাধ দমনে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হচ্ছে। তাঁর আশা, নির্বাচনের আগেই বাকি অস্ত্র উদ্ধার এবং জড়িত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।
এর মধ্যেই রোববার নরসিংদীর রায়পুরার দুর্গম চরাঞ্চলের চরমধুয়া ইউনিয়নের গাজীপুরা গ্রামে রফিকুল ইসলাম সরকার নামে এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নিহত রফিকুল কৃষিপণ্যের ব্যবসায়ী ছিলেন এবং তিনি মঙ্গল মিয়ার ছেলে। তাঁর স্ত্রী চরমধুয়া ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য। সাম্প্রতিক এই হত্যাকাণ্ড এলাকায় আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।