বোমা তৈরির গোপন কারখানায় আতঙ্কে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তঘেঁষা জনপদ। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৪ ফেব্রুয়ারি- চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন গত দুই বছরে একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ, গোপন প্রস্তুতকারক চক্রের সক্রিয়তা এবং পরিত্যক্ত বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের ভাষায়, “এটা আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, নিয়মিত আতঙ্ক।”
সংবাদ পর্যালোচনা ও স্থানীয় সূত্রে কথা বলে দেখা যায়, গত ২৪ মাসে অন্তত তিনটি বড় বিস্ফোরণ এবং একাধিক উদ্ধার অভিযানের ঘটনা ঘটেছে। প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত দুজন, আহত হয়েছেন শিশুসহ একাধিক ব্যক্তি। প্রতিটি ঘটনার পর অভিযান ও নজরদারির কথা বলা হলেও স্থায়ী সমাধান আসেনি।
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: ভোরের বিস্ফোরণে দুজন নিহত
সর্বশেষ ঘটনা ঘটে ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, শনিবার ভোরে। চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ফাটাপাড়া (কিছু সূত্রে পাঠাপাড়া) গ্রামে মো. আব্দুল কালাম (৪৫) নামে এক ব্যক্তির আধাপাকা বাড়িতে ককটেল তৈরির সময় বিকট বিস্ফোরণ ঘটে। সময় আনুমানিক ভোর ৫টা থেকে সাড়ে ৫টার মধ্যে।
ঘটনাস্থলেই অজ্ঞাত পরিচয় দুজন নিহত হন। গুরুতর আহত তিনজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বিস্ফোরণের তীব্রতায় ঘরের টিনের চাল উড়ে যায়, দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ভেতরের আসবাবপত্র দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে থাকে।
নিহত দুইজনের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। তবে আহতরা হলেন- চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ফাঁটাপাড়া গ্রামের মো. বজলুর রহমান (২০) ও মো. মিনহাজ (২২) এবং একই উপজেলার রাণিহাটি ইউনিয়নের উপরধুমি এলাকার মো. শুভ (২০)।
পুলিশ জানায়, নিহতদের মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। ঘটনাস্থলে একাধিক ককটেল বিস্ফোরিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাড়ির মালিক আব্দুল কালাম, মৃত মকবুল হোসেনের ছেলে, ঘটনার পর থেকেই পলাতক। তাকে গ্রেপ্তারে একাধিক টিম কাজ করছে বলে জানিয়েছেন সদর মডেল থানা কর্মকর্তারা। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তার অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, এখানে ককটেল তৈরির কাজ চলছিল। বিস্ফোরণে দুইজন মারা যান। সিআইডি আলামত সংগ্রহ করছে।
পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস জানান, ঘটনাস্থলে আরও বিস্ফোরক আছে কি না তা খতিয়ে দেখতে র্যাব-৫ এর বোম ডিস্পোজাল ইউনিটকে ডাকা হয়েছে। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রশ্নে তিনি বলেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাচ্ছে না।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। মনে হয়েছিল আকাশ ভেঙে পড়েছে। পুরো এলাকা ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। প্রথমে কেউ এগোতে সাহস পায়নি।”
১৪ ডিসেম্বর ২০২৫: শিশুর হাতে বিস্ফোরণ
এর আগে ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ইউনিয়নের সুপারপাড়া এলাকায় বাড়ির পাশে পড়ে থাকা একটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। মিজানুর রহমান (৮) নামে এক শিশু বল ভেবে সেটি হাতে নেয়। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণে সে গুরুতর আহত হয়।
আহত শিশু ওই এলাকার নয়ন আলীর ছেলে। স্থানীয়রা জানান, এলাকায় পরিত্যক্ত অবস্থায় ককটেল পড়ে থাকা নতুন কিছু নয়। ওই ঘটনার পর ক্ষোভ ছড়ালেও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
২৫ জানুয়ারি ২০২৬: নদীতীর থেকে ৮টি ককটেল উদ্ধার
চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি পুনর্ভবা নদীর তীরবর্তী এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ৮টি তাজা ককটেল উদ্ধার করে পুলিশ। ধারণা করা হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের খবর পেয়ে অপরাধীরা সেগুলো ফেলে পালিয়ে যায়।
২০২৪ সালেও একাধিকবার অভিযান চালিয়ে গানপাউডার ও ককটেল তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
‘সিন্ডিকেট’ ও স্থানীয় আধিপত্যের প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইউনিয়নে অন্তত ১০ সদস্যের একটি চক্র সক্রিয়। মূল হোতা বাইরে অবস্থান করে, মাঠপর্যায়ে কয়েকজন সদস্য নিয়মিত বিস্ফোরক তৈরি ও মজুদ করে। সাধারণ মারামারি বা আধিপত্য বিস্তারেও হাতবোমা ব্যবহার হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশের হাতে আগেও কয়েকজন আটক হলেও চক্রটি পুরোপুরি ভাঙা যায়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সদস্য স্বীকার করেছেন, সীমান্তসংলগ্ন ও দুর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় অভিযুক্তদের ধরতে বাড়তি চ্যালেঞ্জ থাকে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মাদক চোরাচালান ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে ককটেলকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যদিও প্রশাসন সরাসরি এমন কোনো যোগসূত্র এখনো নিশ্চিত করেনি।
প্রশাসনের বক্তব্য
সদর মডেল থানার ওসি নূরে আলম বলেন, সাম্প্রতিক বিস্ফোরণের পর পুরো এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। জড়িতদের ধরতে চিরুনি অভিযান চলছে।
তিনি দাবি করেন, গত দুই বছরে বেশ কয়েকটি সফল অভিযান হয়েছে। তবে চরাঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান অপরাধীদের পালানোর সুযোগ দেয় বলে জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, পলাতক বাড়ির মালিক আব্দুল কালামকে গ্রেপ্তার করা গেলে সাম্প্রতিক বিস্ফোরণের নেপথ্য ও জড়িতদের সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
জনমনে আতঙ্ক
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্কুলশিক্ষক বলেন, “সন্ধ্যার পর থেকে ভয় কাজ করে। কখন কোথায় বোমা ফাটে বলা যায় না। শিশুরা বাইরে খেলতে গেলেও চিন্তা হয়।”
গত দুই বছরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, চরবাগডাঙ্গা এখন বিচ্ছিন্ন সহিংসতার জায়গা নয়, বরং সংগঠিত বিস্ফোরক প্রস্তুত ও ব্যবহারের ঝুঁকিতে থাকা একটি এলাকা।
প্রশাসন বলছে অভিযান চলছে। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, কতদিন এভাবে আতঙ্কে থাকতে হবে? স্থায়ীভাবে চক্রটি ভাঙা ও বিস্ফোরক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না এলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।