ইরানে আজ রাতেই ‘কঠোর আঘাত’ হানার হুমকি ট্রাম্পের। ফাইল ছবি
মেলবোর্ন, ৮ মার্চ- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, শনিবার ইরানের ওপর ‘কঠোর আঘাত’ হানা হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, ইরান ইতোমধ্যে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে এবং ভবিষ্যতে তাদের বিরুদ্ধে হামলা চালাবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
শনিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। সেখানে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছে ইরান ক্ষমা চেয়েছে এবং আত্মসমর্পণ করেছে। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার মুখে পড়েই ইরান এমন প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হয়েছে।
তবে ট্রাম্পের এ বক্তব্যের আগেই ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ভিন্ন ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভাষণে তিনি বলেন, দেশটির অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদ গত শুক্রবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে যদি ইরানের ওপর হামলা না আসে, তবে তেহরানও সেসব দেশের বিরুদ্ধে আর কোনো সামরিক হামলা চালাবে না।
একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে হওয়া হামলার কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে দুঃখপ্রকাশ করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, ইরানের অন্য কোনো দেশের ভূখণ্ড দখল বা আক্রমণের উদ্দেশ্য নেই।
ট্রাম্পের হুমকির পর পাল্টা প্রস্তুতির ইঙ্গিত ইরানের
এদিকে ট্রাম্পের হুমকির পর ইরানও সম্ভাব্য হামলার জন্য নতুন মার্কিন লক্ষ্যবস্তু খুঁজছে বলে জানিয়েছে দেশটির এক কর্মকর্তা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় ওই কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিস্তারের হুমকি দিয়েছে।
তার ভাষায়, এই হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে ইরান এখন নতুন করে মার্কিন অঞ্চল, সামরিক বাহিনী ও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান পর্যালোচনা করছে। যেসব মার্কিন স্থাপনা এখনো ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু তালিকায় নেই, সেগুলোও নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।
এর আগে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং নিশ্চিত মৃত্যু’ ডেকে আনতে পারে এমন নতুন লক্ষ্যবস্তু বিবেচনা করছে।
ট্রাম্পের দাবি ‘পুরোপুরি মিথ্যা’: ইরানি বিশ্লেষক
ট্রাম্প যে দাবি করেছেন ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, তা পুরোপুরি অসত্য বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের চিন্তন প্রতিষ্ঠান ডিপ্লো হাউসের পরিচালক ও বিশ্লেষক হামিদরেজা গোলামজাদে।
তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের বক্তব্যকে ‘আত্মসমর্পণ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা সম্পূর্ণ ভুল। তার মতে, ইরান কেবল প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে অনুরোধ জানিয়েছে যেন তারা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে নিজেদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা চালাতে না দেয়।
গোলামজাদে বলেন, একটি রাষ্ট্র হিসেবে এমন অনুরোধ করা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে স্বাভাবিক এবং বৈধ।
নতুন দফার হামলায় হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবি
এদিকে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, নতুন দফার হামলায় তারা হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলা হয়, চলমান সংঘাতের ২৫তম দফার হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও সামরিক সহায়তা কেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
এই হামলায় হাইপারসনিক ‘ফাতাহ’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ব্যালিস্টিক ‘এমাদ’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতির পাঁচ গুণেরও বেশি গতিতে উড়তে সক্ষম। ঘণ্টায় প্রায় ৬ হাজার ১৭৪ কিলোমিটার গতিতে এগুলো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।
লেবাননে রাতভর ইসরায়েলের হামলা
অন্যদিকে লেবাননে হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে রাতভর হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল ও বেকা উপত্যকায় হিজবুল্লাহর রকেট লঞ্চার, অস্ত্রভাণ্ডার ও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
আইডিএফ আরও জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর এলিট কমান্ডো ইউনিট ‘রাদওয়ান ফোর্স’-এর কয়েকজন কমান্ডারকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননের মাজদাল সেল এলাকায় রাদওয়ান ফোর্সের দুটি কমান্ড সেন্টারেও আঘাত হানা হয়েছে।
ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার দাবি কুয়েতের
এদিকে কুয়েত জানিয়েছে, তারা একটি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে। দেশটির ন্যাশনাল গার্ড এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানায়।
এর আগের দিন কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ১২টি ইরানি ড্রোন এবং ১৪টি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূপাতিত করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাল্টাপাল্টি হামলা ও সামরিক তৎপরতার কারণে পুরো অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, ইসরায়েল এবং তাদের মিত্রদের মধ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে তা বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
সূত্রঃ আল জাজিরা