ইরানি হ্যাকারদের সাইবার হামলার পর অস্ট্রেলিয়ার হাসপাতালগুলোতে সতর্কতা জারি। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৩ মার্চ- মার্কিন বহুজাতিক চিকিৎসা প্রযুক্তি কোম্পানি স্ট্রাইকার কর্পোরেশনের ওপর ইরান-সমর্থিত এক হ্যাকার গোষ্ঠীর সাইবার হামলার পর অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন হাসপাতাল সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো যেমন জ্বালানি, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতও সাইবার হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে ধারণা করা একটি সাইবার মিলিশিয়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওই কোম্পানিতে হামলা চালানোর পর দেশটির স্বাস্থ্যখাতে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কারণ প্রতিষ্ঠানটি অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম সরবরাহ করে থাকে।
মঙ্গলবার মধ্যরাতের কিছুক্ষণ পর হ্যাকার গোষ্ঠী হান্ডালা গ্রুপ ঘোষণা দেয় যে তারা স্ট্রাইকারে সাইবার হামলা চালিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের বৃহৎ কোম্পানিগুলোর তালিকায় থাকা একটি প্রযুক্তি কোম্পানি, যা চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের জন্য বিভিন্ন উন্নত যন্ত্রপাতি উৎপাদন ও সরবরাহ করে।
এই হ্যাকার গোষ্ঠীটির সঙ্গে ইরানের গোয়েন্দা ও সাইবার নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। গোষ্ঠীটি দাবি করেছে, দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের শাজেরেহ তায়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তারা এই সাইবার আক্রমণ চালিয়েছে। ওই হামলায় ১৬৫ জন নিহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়, যাদের বেশিরভাগই শিশু।
অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া ও নিউ সাউথ ওয়েলস অঙ্গরাজ্যের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত হাসপাতালগুলোর কার্যক্রমে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি। তবে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি আমেরিকান কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ধারাবাহিক সাইবার হামলার প্রথম ধাপ হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক থাকায় ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানে সাইবার হামলা হলে তার প্রভাব অস্ট্রেলিয়ার জ্বালানি, ব্যাংকিং এবং আর্থিক খাতেও পড়তে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে হ্যান্ডালা গ্রুপ স্ট্রাইকারকে “জায়নবাদী শিকড়সম্পন্ন করপোরেশন” বলে উল্লেখ করে দাবি করেছে, তারা কোম্পানিটির দুই লাখ সিস্টেম, সার্ভার ও ডিভাইস মুছে ফেলেছে এবং ৫০ টেরাবাইট গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি করেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর একটি অভ্যন্তরীণ তদন্তে ধারণা করা হয়েছে যে মিনাব শহরের ওই স্কুলে হামলার জন্য সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী ছিল এবং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে ভুল হতে পারে। মার্কিন গণমাধ্যমে এমন তথ্য প্রকাশ হয়েছে।

এখন পর্যন্ত হাসপাতালগুলোর কার্যক্রমে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি। ছবিঃ সংগৃহীত
স্ট্রাইকার বর্তমানে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জন্য চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করছে। এছাড়া ২০১৯ সালে কোম্পানিটি ইসরায়েলভিত্তিক চিকিৎসা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অরথোস্পেস অধিগ্রহণ করে।
কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কেভিন লোবো এক বার্তায় প্রতিষ্ঠানের ৫৩ হাজার কর্মীকে জানিয়েছেন, কোম্পানির পণ্য ও গ্রাহকরা নিরাপদ আছেন। তিনি বলেন, কর্মী, গ্রাহক ও রোগীদের সুরক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে এবং সাইবার হামলাটি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত সিস্টেম পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে।
তিনি আরও জানান, এই হামলায় কোনো র্যানসমওয়্যার বা ম্যালওয়্যার ব্যবহার করা হয়নি। ফলে সিস্টেমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নেই। হামলার প্রভাব মূলত কোম্পানির অভ্যন্তরীণ মাইক্রোসফট পরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, হ্যাকাররা প্রশাসনিক অনুমতি ব্যবহার করে ক্লাউডভিত্তিক ডিভাইস ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম মাইক্রোসফট ইনটিউনে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। এরপর সেখান থেকে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সংযুক্ত ডিভাইস দূর থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা চালানো হয়।
সিডনিভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান নোশন ডিজিটাল ফরেনসিকসের বিশেষজ্ঞ ম্যাট ও’কেন বলেন, হ্যাকাররা কিছু ডিভাইস মুছে ফেলতে সক্ষম হলেও সবগুলো নয়। তার মতে, অস্ট্রেলিয়ার হাসপাতালগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হতে পারে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন।
তিনি বলেন, যদি এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে স্ট্রাইকারের কাছ থেকে অস্ত্রোপচার যন্ত্রপাতি, ইমপ্লান্ট বা অন্যান্য চিকিৎসা সামগ্রী সংগ্রহে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হ্যালসিয়ন র্যানসমওয়্যার গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের দীর্ঘদিনের সাইবার যুদ্ধের ইতিহাস রয়েছে। অতীতে তারা মূলত নেটওয়ার্ক অচল করে দেওয়ার ধরনের হামলা এবং র্যানসমওয়্যার ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে সাইবার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তি কোম্পানি সিডিডব্লিউর নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জাস্টিন হেন্ডারসন বলেন, হ্যান্ডালা গোষ্ঠীর এই হামলা একটি বড় ধরনের পরিকল্পিত পদক্ষেপ। তার মতে, এত বড় আকারের হামলা এই গোষ্ঠী আগে কখনো চালায়নি।
তিনি জানান, ২০২৩ সালে হ্যান্ডালা গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটে এবং ইরান কখনো কখনো এমন বিকেন্দ্রীভূত সাইবার মিলিশিয়া ব্যবহার করে থাকে, যাতে সরাসরি দায় স্বীকার না করেও হামলা পরিচালনা করা সম্ভব হয়।
তার মতে, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে এমন সাইবার হামলা আরও বাড়তে পারে। বিশ্বব্যাপী সংযুক্ত প্রযুক্তি ও কোম্পানির কারণে অস্ট্রেলিয়াও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ ঘোষণা দিয়েছেন, দেশটি সংযুক্ত আরব আমিরাতে ই–৭এ ওয়েজটেইল নজরদারি বিমান এবং ৮৫ জন সামরিক সদস্য পাঠাবে, যাতে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা জোরদার করা যায়।
এদিকে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ক্রিস ম্যাকনটন অস্ট্রেলিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে হ্যাকার গোষ্ঠী হামলার অনেক আগে থেকেই কোনো প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে গোপনে প্রবেশ করে থাকে এবং উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করে।
তিনি বলেন, এসব গোষ্ঠী অত্যন্ত দক্ষ ও ধৈর্যশীল। তারা নীরবে সিস্টেমে ঢুকে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং পরে বড় ধরনের আক্রমণ চালায়। তার মতে, এমন হামলার মূল উদ্দেশ্য শুধু ক্ষতি করা নয়, বরং শক্তির প্রদর্শনও।
তিনি বলেন, এর প্রভাব অনেকটা হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো, যার প্রভাব বিশ্বব্যাপী পড়তে পারে।
সূত্রঃ এবিসি নিউজ