বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

শিশু যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে ব্যর্থতা, মেটাকে ৪৫০০ কোটি টাকা জরিমানা

  • 7:36 pm - March 26, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৯২ বার
মেটাকে ৪৫০০ কোটি টাকা জরিমানা। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২৬ মার্চ- শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা এবং ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মেটা-কে বিপুল অঙ্কের জরিমানা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল এই প্রতিষ্ঠানকে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ, জরিমানা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি আদালতে জুরি বোর্ডের ঐতিহাসিক রায়ে এই দণ্ড প্রদান করা হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স এই তথ্য জানিয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়ে জনগণের কাছে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছে মেটা এবং তাদের প্ল্যাটফর্মে সংঘটিত গুরুতর অপরাধ প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

এই মামলাটি ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দায়ের করেন নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেজ। মামলার ভিত্তি ছিল ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর একটি বিস্তৃত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, যেখানে উঠে আসে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্ম কীভাবে শিশুদের যৌন শোষণ ও পাচারের একটি সক্রিয় মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, মেটার অভ্যন্তরীণ কর্মী এবং বাইরের বিশেষজ্ঞরা একাধিকবার শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে সতর্কতা জারি করলেও প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়নি। বরং শিশু সুরক্ষার বিষয়টির চেয়ে ব্যবসায়িক লাভকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। বিচার প্রক্রিয়ায় উঠে আসে, প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে মেটা যে দাবি করেছে, বাস্তবে তার সঙ্গে পরিস্থিতির বিস্তর ফারাক রয়েছে।

শুনানির সময় ‘অপারেশন মেটাফাইল’ নামে একটি গোপন অভিযানের তথ্য আদালতে উপস্থাপন করা হয়। এই অভিযানে দেখা যায়, অপরাধীরা পরিকল্পিতভাবে মেটার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে শিশুদের টার্গেট করছে এবং বিভিন্ন উপায়ে তাদের ফাঁদে ফেলছে। এই তথ্য আদালতের সামনে আসার পর বিষয়টি আরও গুরুতর আকার ধারণ করে।

এছাড়া আদালতে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে একটি ছিল ফেসবুক মেসেঞ্জারে এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন চালুর বিষয়টি। অভিযোগ ওঠে, এই প্রযুক্তি চালুর ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর পক্ষে অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে, কারণ অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

আরেকটি বড় অভিযোগ ছিল অপরাধ দমনে মেটার অতিরিক্তভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভরতা। আদালতে বলা হয়, এই ব্যবস্থার কারণে বিপুল পরিমাণ ভুয়া রিপোর্ট তৈরি হচ্ছে, যা প্রকৃত অপরাধ শনাক্ত ও প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাজ আরও জটিল হয়ে উঠছে।

মামলার শুনানিতে মেটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গ এবং ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরি-এর জবানবন্দিও উপস্থাপন করা হয়। তারা তাদের বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বিপুল সংখ্যক ব্যবহারকারী থাকার কারণে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাজনিত কিছু ঝুঁকি সম্পূর্ণভাবে এড়ানো সম্ভব নয়। তবে এই বক্তব্য আদালতের দৃষ্টিতে সন্তোষজনক হিসেবে বিবেচিত হয়নি।

রায়ে আরও বলা হয়, একটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবে মেটার ওপর ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের মতো সংবেদনশীল গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব আরও বেশি গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেনি বলেই আদালত মনে করেছে।

তবে আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছে মেটা। প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নন এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবেন। তিনি বলেন, মেটা ইতোমধ্যে তাদের প্ল্যাটফর্মে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে এবং ভবিষ্যতেও এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

তিনি আরও দাবি করেন, কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন নতুন প্রযুক্তি ও নীতিমালা চালু করেছে এবং এই ক্ষেত্রে তারা নিজেদের অবস্থান নিয়ে আত্মবিশ্বাসী।

মামলার পরবর্তী ধাপ আগামী ৪ মে থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এই পর্যায়ে আদালত মেটার জন্য আরও কঠোর নির্দেশনা দিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্ল্যাটফর্মে শিশুদের জন্য শক্তিশালী বয়স যাচাইকরণ ব্যবস্থা চালু করা এবং অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িত ব্যবহারকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে অপসারণের বিষয়ে স্থায়ী পরিবর্তনের নির্দেশ আসতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা এই রায়ের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, মেটার বিরুদ্ধে দেওয়া এই রায় প্রযুক্তি খাত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রশ্নে ভবিষ্যতে কী ধরনের নীতিগত পরিবর্তন আসে এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করে, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্ট সকল মহলের।

এই শাখার আরও খবর

কবে দেশে ফিরবেন শেখ হাসিনা, সিদ্ধান্ত হবে ৭ নভেম্বর

ভাস্কর দত্ত :  সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা কবে দেশে ফিরবেন, তা নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা চলছে। আগামী ৭ নভেম্বর দলটির…

ডিবি হেফাজতে ইকবাল সোবহান ও রাজীব ঘোষ: সাংবাদিক মহলে উদ্বেগ

রাজধানীর মহাখালীতে কর্মস্থল থেকে সাংবাদিক নেতা ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও ডিবিসি নিউজের ক্রাইম চিফ রাজীব ঘোষকে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনায় সাংবাদিক সমাজে…

ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধে ৪০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি পাকিস্তানের

ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্য বন্ধ থাকায় প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে পাকিস্তান। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনরায় চালুর আহ্বান জানিয়েছেন…

কিশোরগঞ্জে জামায়াত নেতার ছেলেকে বুকে ছুরিকাঘাত

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় জামায়াত নেতা ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জনের বড় ছেলে শাহরিয়ার জামান রানাকে ছুরিকাঘাত করেছে দুর্বৃত্তরা। বুধবার (৪ নভেম্বর) রাত ৮টার দিকে…

মোদির সঙ্গে প্রকাশ্য বিতর্কে বসতে চান রাহুল গান্ধী

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রকাশ্য বিতর্কে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন দেশটির লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা ও কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। বিতর্কের বিচারক কে হবেন,…

ডিসেম্বরে নতুন মজুরি কাঠামোর আশ্বাস: তবুও কেন ‘অনিশ্চয়তায়’ শ্রমিকরা

তৈরি পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি কাঠামো আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত করে জানুয়ারি থেকে বর্ধিত বেতন দেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছেন মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা। বুধবার (৪ নভেম্বর)…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au