ব্রহ্মপুত্র তীরে অষ্টমী স্নান, কুড়িগ্রামে লাখো পুণ্যার্থীর মিলনমেলা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৬ মার্চ- কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঐতিহ্যবাহী অষ্টমী তীর্থ স্নান উৎসব উপলক্ষে জমে উঠেছে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই পাপমোচন ও পুণ্য অর্জনের আশায় হাজার হাজার পুণ্যার্থী নদীতে স্নান করতে ভিড় জমাতে শুরু করেন। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই ভিড় লাখে পৌঁছায়, আর নদীর দুই পাড় জুড়ে সৃষ্টি হয় এক অনন্য ধর্মীয় আবহ।
অষ্টমী স্নানকে কেন্দ্র করে তিন দিন আগ থেকেই চিলমারী উপজেলায় উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। দূর-দূরান্ত থেকে পুণ্যার্থী ও ব্যবসায়ীদের আগমনে পুরো এলাকা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। উপজেলার রমনা ইউনিয়নের জোড়গাছ পুরাতন বাজার থেকে শুরু করে উত্তরে প্রায় তিন কিলোমিটার বিস্তৃত রমনাঘাট পর্যন্ত নদীর বালুচরে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী বিশাল মেলার আয়োজন। এই দীর্ঘ এলাকায় সারি সারি দোকানপাট, পণ্যের স্টল, খেলনার দোকান এবং বিনোদনের নানা আয়োজন পুণ্যার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

দূর-দূরান্ত থেকে পুণ্যার্থী ও ব্যবসায়ীদের আগমনে পুরো এলাকা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলায় ঘুরে দেখা যায়, মাটির তৈরি হাড়ি-পাতিল, থালা, বদনা, কলসিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রীর পাশাপাশি বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি, পুতুল, পশুপাখির আকৃতির খেলনা, বাঘ, আম, নৌকা ইত্যাদি। ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ শিল্পের এমন সমাহার শুধু ধর্মীয় অনুষঙ্গই নয়, বরং স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বছরের এই সময়টিকে কেন্দ্র করে তাদের পণ্য বিক্রির বড় সুযোগ পান।
পরিবার-পরিজন নিয়ে আসা দর্শনার্থীদের জন্য এটি এক ধরনের আনন্দমেলা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বিনোদনের এই আয়োজন মেলাকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। এই মেলার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বড় আকারের মাছ কেনা-বেচা। দর্শণার্থীরা মেলায় এসে বড় আকারের মাছ কিনে বাড়ি নিয়ে যাওয়া এবং আত্মীয়দের উপহার দেয়া এই মেলার একটি প্রাচীন রীতি।

সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ শাখার শিক্ষার্থীরা. ছবিঃ সংগৃহীত
এই মেলায় মূল আয়োজক কমিটির পাশাপাশি সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ শাখার শিক্ষার্থীরাও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। তারা পূণ্যার্থীদের প্রাথমিক চিকিৎসা, খাবার জল, তথ্যগত সহায়তা ও নারীদের পোষাক পরিবর্তনের জন্য চেঞ্জিং রুমসহ বিভিন্ন সেবা প্রদান করেন।
রণপাগলী সার্বজনীন পূজা মন্দিরের পুরোহিত বুদ্ধদেব চক্রবর্তী জানান, এ বছর অষ্টমী তিথির স্নানের নির্ধারিত সময় ছিল বুধবার বিকাল ৫টা ১৭ মিনিট ৫ সেকেন্ড থেকে শুরু হয়ে বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা ৫৮ মিনিট ৩৩ সেকেন্ড পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যেই পুণ্যার্থীরা ব্রহ্মপুত্র নদে স্নান সম্পন্ন করেন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই নির্দিষ্ট সময়ে স্নান করলে পাপমোচন ঘটে এবং পুণ্য লাভ হয়।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের চিলমারী উপজেলা শাখার সভাপতি কর্ণধর বর্মা জানান, প্রতি বছরের মতো এবারও দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, চীনসহ বিভিন্ন স্থান থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা অষ্টমী স্নানে অংশ নিতে চিলমারীতে এসেছেন। তিনি বলেন, এবারের আয়োজনে পুণ্যার্থীর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় বেশি হতে পারে বলে তারা আশা করছেন।
অষ্টমী স্নান মেলা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মিলন চন্দ্র বর্মণ বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে আগত পুণ্যার্থীদের জন্য সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। তাদের থাকা, খাওয়া, বিশ্রাম এবং নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবক দল মেলায় আগতদের সহায়তায় কাজ করছে।
চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে মেলা এলাকায় ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া বিশুদ্ধ পানীয় জলের জন্য নলকূপ বসানো হয়েছে এবং নারীদের কাপড় পরিবর্তনের জন্য পৃথক তাঁবুর ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা এবং এনজিওগুলোর সহযোগিতায় এই ব্যবস্থাগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, পুণ্যার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে স্নান করতে পারেন এবং কোনো ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে, সে জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মেলা এলাকায় সার্বক্ষণিক তদারকি করা হচ্ছে এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে প্রশাসন।
চিলমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, অষ্টমী স্নান উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রায় দুই শতাধিক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তারা মেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে বাড়তি নজরদারি রাখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের পাশাপাশি পর্যাপ্ত সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবকও মাঠে কাজ করছেন। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আগত পুণ্যার্থীদেরও সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।
প্রতি বছর চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে এই স্নানোৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনে ব্রহ্মপুত্র নদে স্নান করলে পাপমোচন হয় এবং জীবনে শুভ ফল লাভ করা যায়। এই বিশ্বাস থেকেই প্রতিবছর লাখো পুণ্যার্থী এই উৎসবে অংশ নেন।
চিলমারীর অষ্টমী স্নান শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। এখানে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও পেশার মানুষ একত্রিত হয়ে এক অনন্য সম্প্রীতির চিত্র তুলে ধরেন। স্থানীয়দের মতে, এই মেলা শুধু ধর্মীয় অনুভূতিরই প্রতিফলন নয়, বরং এটি একটি সামাজিক বন্ধনেরও প্রতীক।
সব মিলিয়ে, ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অনুষ্ঠিত এই অষ্টমী স্নান উৎসব চিলমারীসহ পুরো অঞ্চলে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দিয়েছে। ধর্মীয় আচার, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হওয়া এই আয়োজন প্রতি বছরই নতুন মাত্রা যোগ করছে স্থানীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে।