অস্ট্রেলিয়া

ফিচার প্রতিবেদন: মন্টি জ্যাকা, ABC News

জ্বালানি সংকটে ইভির দিকে ঝুঁকছে অস্ট্রেলিয়া, ‘নোভেটেড লিজ’ কি সত্যিই লাভজনক?

বেতন থেকে কেটে গাড়ি কেনার এই ব্যবস্থায় কর সাশ্রয়ের সুযোগ থাকলেও রয়েছে নানা ঝুঁকি—বিশেষ বিশ্লেষণ

  • 10:18 am - April 04, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৮৩ বার
অনিশ্চিত চাকরি বা ভবিষ্যতে বাড়ি কেনার পরিকল্পনা থাকলে নোভেটেড লিজ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৪ এপ্রিল: অস্ট্রেলিয়ায় পেট্রোলের মূল্য যখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, তখন অনেকেই নতুন করে ভাবছেন—গাড়ি কেনার বিকল্প কি হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ক্রমেই সামনে আসছে বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত আর্থিক পদ্ধতি—‘নোভেটেড লিজ’।

অনেকের কাছে এটি যেন এক ধরনের “গোপন সুবিধা”—যেখানে আগাম কোনো টাকা ছাড়াই বেতনের একটি অংশ ত্যাগ করে গাড়ি কেনা যায়, আবার একই সঙ্গে করেও সাশ্রয় করা সম্ভব। শুনতে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবতা কিছুটা জটিল, এবং এই ব্যবস্থার ভেতরে যেমন সুযোগ আছে, তেমনি রয়েছে কিছু সূক্ষ্ম ঝুঁকিও।

নোভেটেড লিজ কী?

নোভেটেড লিজ মূলত একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি—কর্মী, নিয়োগকর্তা এবং একটি লিজিং কোম্পানির মধ্যে। এখানে গাড়ি কেনার জন্য আলাদা করে ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে কর্মীর বেতন থেকে নির্দিষ্ট একটি অংশ কেটে নেওয়া হয়, যা গাড়ির মূল্য এবং তার পরিচালন ব্যয়—যেমন বীমা, রেজিস্ট্রেশন বা রক্ষণাবেক্ষণ—সবকিছুই কভার করে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই অর্থ কাটা হয় কর আরোপের আগেই। ফলে কর্মীর করযোগ্য আয় কমে যায়, আর সেখানেই তৈরি হয় সাশ্রয়ের সুযোগ।

লিজের মেয়াদ শেষে গাড়িটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার হয়ে যায় না। তখন একটি নির্দিষ্ট ‘রেসিডুয়াল ভ্যালু’ পরিশোধ করতে হয়। কেউ চাইলে এই অর্থ দিয়ে গাড়ির মালিক হতে পারেন, আবার কেউ গাড়ি বিক্রি করে সেই অর্থ মেটান, অথবা নতুন লিজে প্রবেশ করেন।

রোহান মার্টিন, যিনি

তবে এই সুবিধার গল্প এখানেই শেষ নয়। লিজের মেয়াদ শেষে গাড়িটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার হয়ে যায় না। তখন একটি নির্দিষ্ট ‘রেসিডুয়াল ভ্যালু’ পরিশোধ করতে হয়। কেউ চাইলে এই অর্থ দিয়ে গাড়ির মালিক হতে পারেন, আবার কেউ গাড়ি বিক্রি করে সেই অর্থ মেটান, অথবা নতুন লিজে প্রবেশ করেন।

গত কয়েক বছরে এই ব্যবস্থার জনপ্রিয়তা বেড়েছে মূলত একটি বড় নীতিগত পরিবর্তনের কারণে। ২০২২ সালের জুলাই থেকে নির্দিষ্ট বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে ‘ফ্রিঞ্জ বেনিফিটস ট্যাক্স’ বা FBT মওকুফ করা হয়েছে। আগে যেখানে এই কর অনেকের জন্য বড় বোঝা ছিল, এখন তা না থাকায় নোভেটেড লিজ অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে জ্বালানির দাম বাড়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এই আগ্রহকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।

জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে অস্ট্রেলিয়ায় বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। ছবি: facebook

তবে সবকিছুর মাঝেও কিছু বাস্তবতা রয়েছে, যা উপেক্ষা করলে বিপদ হতে পারে। স্বাধীন ভোক্তা অধিকারকর্মী চাঙ-ইয়াং যেও এই ব্যবস্থাকে একদিকে “অসাধারণ সুযোগ” হিসেবে দেখলেও অন্যদিকে সতর্ক করেন—অনেকেই এর জটিল শর্ত না বুঝেই এতে জড়িয়ে পড়েন।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো চাকরির ওপর নির্ভরশীলতা। নোভেটেড লিজ আপনার বর্তমান কর্মস্থলের সঙ্গে যুক্ত থাকে। যদি আপনি চাকরি পরিবর্তন করেন, বা নতুন নিয়োগকর্তা এই সুবিধা না দেন, তাহলে পুরো লিজ চুক্তি ভেঙে যেতে পারে। তখন অবশিষ্ট অর্থ একসঙ্গে পরিশোধ করতে হয়, এবং কর সাশ্রয়ের যে সুবিধা ছিল, তা পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এতে গাড়ির প্রকৃত মূল্য থেকেও বেশি খরচ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঋণ গ্রহণের সক্ষমতা। অনেকেই বাড়ি কেনার পরিকল্পনা করেন, কিন্তু নোভেটেড লিজ থাকলে ব্যাংক আপনার ঋণ নেওয়ার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে। কখনো কখনো এই হ্রাস গাড়ির মূল্যের তিনগুণ পর্যন্ত হতে পারে, যা নতুন ক্রেতাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্বাধীন আর্থিক পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ছবি: সংগৃহীত

এর পাশাপাশি বাজারের সীমিত প্রতিযোগিতাও একটি সমস্যা। অনেক প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট একটি লিজিং কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি থাকে, ফলে কর্মীদের বিকল্প খোঁজার সুযোগ থাকে না। এতে সুদের হার ও ফি তুলনামূলক বেশি হতে পারে, যদিও বাইরে থেকে তা “কর সাশ্রয়” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি রয়েছে। যদি গাড়িটি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বীমা পুরো ক্ষতি কভার না করে, তাহলে লিজ আগাম শেষ হয়ে যেতে পারে এবং বড় অঙ্কের অর্থ একসঙ্গে পরিশোধ করতে হতে পারে। এমনকি ইভির ক্ষেত্রে FBT ছাড় থাকলেও, এটি আপনার করযোগ্য আয়ের হিসাব পরিবর্তন করতে পারে, যার ফলে কিছু সরকারি সুবিধা কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।

সব মিলিয়ে নোভেটেড লিজ একটি শক্তিশালী আর্থিক হাতিয়ার হতে পারে, তবে এটি সবার জন্য সমানভাবে উপযোগী নয়। উচ্চ আয়ের ব্যক্তি, স্থিতিশীল চাকরি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকলে এটি উল্লেখযোগ্য সুবিধা দিতে পারে। কিন্তু অনিশ্চিত কর্মজীবন বা ভবিষ্যতে বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে এটি উল্টো বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ একটাই—এটি কোনো সহজ শর্টকাট নয়। অন্য যেকোনো বড় আর্থিক সিদ্ধান্তের মতোই, এখানে প্রবেশের আগে ভালোভাবে বুঝে নেওয়া জরুরি। স্বাধীন আর্থিক পরামর্শ নেওয়া এবং নিজের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

ফিচার প্রতিবেদন:
মন্টি জ্যাকা, ABC News
বাংলা অনুবাদ: OTN বাংলা

এই শাখার আরও খবর

শেষবার কি ছেলেকে দেখে যেতে পারবেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মা?

দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ শ্রীচিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর মা বর্তমানে চট্টগ্রামের মা ও শিশু হাসপাতালে অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন। ছেলের কারাবন্দি জীবনের প্রায় দুই বছর পার…

বাংলাদেশে সার নিয়ে আসলে কী চলছে?

আমন মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষক। কোথাও সার পাওয়া যাচ্ছে না, কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।…

ডেঙ্গুতে এ বছর একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১,৫৭১

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার…

গোপালগঞ্জে কনসার্টে শেখ হাসিনার পক্ষে স্লোগান, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আয়োজক গ্রেপ্তার

গোপালগঞ্জ পৌর পার্কে কনসার্ট আয়োজনের আগে পুলিশের অনুমতি না নেওয়া এবং অনুষ্ঠান চলাকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে স্লোগান দেওয়ার ঘটনায় এফএনএফ কনভেনশন হল অ্যান্ড…

বেদখল হচ্ছে ঝিলংজা কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানের জায়গা, ক্ষুব্ধ সনাতন ধর্মাবলম্বীরা

কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানের জায়গা দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শ্মশানসংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারীদের কেউ কেউ নিজেদের বসতি সম্প্রসারণের জন্য শ্মশানের…

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সময় সঙ্গে থাকতে পারেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দেশে ফেরার সময় তাঁর সঙ্গে একদল আন্তর্জাতিক স্বাধীন পর্যবেক্ষককে রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au