হজরত খানজাহান (রহ.)-এর মাজারের দিঘিতে কুমিরের মুখে একটি কুকুর পড়ার ঘটনা ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১১ এপ্রিল- বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হজরত খানজাহান (রহ.)-এর মাজারের দিঘিতে কুমিরের মুখে একটি কুকুর পড়ার ঘটনা ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ভাইরাল হওয়া ভিডিও ও ছবি ঘিরে নানা ধরনের দাবি-দাওয়া, অভিযোগ ও আবেগঘন মন্তব্যে ভরে উঠেছে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো। তবে ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী, মাজারের খাদেম এবং নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অনেক তথ্যই বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
ঘটনার পরদিন শুক্রবার বিকেলে মাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ছুটির দিন হওয়ায় দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। মাজারের দক্ষিণ পাশে দিঘির প্রধান ঘাটে অনেকেই কুমির দেখার আশায় অপেক্ষা করছেন। যদিও ওই সময় ঘাটে কুমির দেখা যায়নি, তবু দর্শনার্থীদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কুকুরকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি।
অনেকে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিলেন, কেউ বলছিলেন কুকুরটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে কুমিরের সামনে দেওয়া হয়েছে, আবার কেউ প্রশ্ন তুলছিলেন কেন এমনটি করা হলো। দর্শনার্থীদের একজন কলেজশিক্ষার্থী জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলোতে লাখ লাখ মানুষ দেখছেন এবং বিভিন্ন মন্তব্য করছেন।
ঘটনার ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর অনলাইনে নানা ধরনের দাবি সামনে আসে। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, কুকুরটিকে বেঁধে বা পরিকল্পিতভাবে কুমিরের সামনে ফেলে দেওয়া হয়েছে। আবার অনেক পোস্টে ঘটনাটিকে নিষ্ঠুরতা হিসেবে তুলে ধরা হয়।
একটি ভাইরাল পোস্টে দাবি করা হয়, কুকুরটি বাঁচার জন্য ছটফট করছিল, কিন্তু কেউ তাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেনি; বরং দাঁড়িয়ে ভিডিও ধারণ করেছে। এসব পোস্টে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায় এবং শত শত মন্তব্য জমা পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যে ভিন্ন চিত্র
তবে মাজারের খাদেম, নিরাপত্তাকর্মী এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাটি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ঘটেছে। তাঁদের দাবি, কুকুরটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে কুমিরের সামনে দেওয়া হয়নি।
তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে গত ৮ এপ্রিল বুধবার বিকেলে। ওই দিন মাজার এলাকায় একটি অসুস্থ কুকুর কয়েকজন মানুষকে কামড়ায় এবং আতঙ্ক সৃষ্টি করে। কুকুরটি দোকানপাটের আশপাশে ঘোরাফেরা করে এবং সামনে যাকে পাচ্ছিল তাকেই তাড়া করছিল। এমনকি দুই-তিনটি মুরগিকেও মেরে ফেলে।
স্থানীয় এক প্রত্যক্ষদর্শী তরুণ জানান, কুকুরটির শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং আচরণ ছিল অস্বাভাবিক। কুকুরটিকে তাড়াতে কয়েকজন লাঠি ছুড়ে মারেন। তাড়া খেয়ে কুকুরটি নারীদের ঘাট থেকে দৌড়ে প্রধান ঘাটের দিকে চলে যায়।
প্রধান ঘাটে গিয়ে কুকুরটি মাজারের নিরাপত্তাকর্মী মো. ফোরকান হাওলাদারকে আঁচড় দেয়। তিনি তখন সেখানে উপস্থিত দর্শনার্থীদের সতর্ক করছিলেন, কারণ কুমির পানির কাছে ছিল। কুকুরের আক্রমণ থেকে বাঁচতে তিনি পা ঝাঁকালে কুকুরটি ভারসাম্য হারিয়ে দিঘির পানিতে পড়ে যায়।
এরপর মুহূর্তের মধ্যে পানিতে থাকা কুমিরটি কুকুরটিকে ধরে টেনে নিচে নিয়ে যায়। এই সংক্ষিপ্ত ঘটনাটুকুই ভিডিও আকারে ধারণ হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনায় আহত নিরাপত্তাকর্মী মো. ফোরকান হাওলাদার জানান, কুকুরটি তাকে কামড় ও আঁচড় দেয়। পরে তিনি চিকিৎসার জন্য বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে গিয়ে টিকা নিয়েছেন। তিনি বলেন, কুকুরটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে পানিতে ফেলা হয়নি, বরং পরিস্থিতির কারণে ঘটনাটি ঘটে।
স্থানীয়দের বক্তব্য: ‘মিথ্যা গল্প ছড়ানো হচ্ছে’
মাজার এলাকার দোকানি বিনা আক্তার বলেন, কুকুরটি কয়েকজন মানুষ, এমনকি একটি শিশুকেও কামড়ায়। পরে তাড়া খেয়ে পানিতে পড়ে গেলে কুমির সেটিকে ধরে নেয়। তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনাটি নিয়ে এখন অনেকেই মনগড়া গল্প ছড়াচ্ছেন।
স্থানীয় যুবক মেহেদী হাসান (তপু) বলেন, কুমিরটি সম্প্রতি ডিম পাড়ায় স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে পানিতে পড়ে গেলে কোনো প্রাণীকে উদ্ধার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, “এ ধরনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।”
মাজারের খাদেমরা জানিয়েছেন, বর্তমানে ওই দিঘিতে একটি মাত্র কুমির রয়েছে। এটি ঐতিহাসিকভাবে প্রচলিত সেই কুমির নয়; বরং ২০০৫ সালে ভারত থেকে এনে দিঘিতে ছাড়া হয়েছিল। এর আগে পুরোনো কুমিরগুলো বিলুপ্তির পথে চলে গেলে নতুন করে এই কুমির আনা হয়।