স্পেনে বৈধ হওয়ার পথে বাংলাদেশিসহ প্রায় ৫ লাখ অভিবাসী
মেলবোর্ন, ১৫ এপ্রিল- ইউরোপজুড়ে যখন অভিবাসনবিরোধী মনোভাব ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, ঠিক সেই সময় ভিন্নধর্মী সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনায় এসেছে স্পেন সরকার। দেশটিতে অবস্থান করা নথিহীন অভিবাসীদের…
মেলবোর্ন, ১৫ এপ্রিল- ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট গভীর রাতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি টেলিকনফারেন্সেই বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কার্যত নির্ধারিত হয় বলে জানিয়েছে ভারতের গণমাধ্যম নর্থইস্ট নিউজ। সেদিন রাতের আলোচনার বিষয়ে অবগত দুইটি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বৈঠকেই শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে এক ধরনের ‘পরোক্ষ বা নীরব অভ্যুত্থান’-এর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই টেলিকনফারেন্সে অংশ নেওয়া শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে একজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান। তখনকার পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে ওই রাতেই সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছিলেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ ও মানসিক চাপের মুখে নৌবাহিনীর রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ সোহেল ভেঙে পড়ার উপক্রম হন। ঢাকার ধানমন্ডির একটি নিরাপদ স্থানে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং অন্তত একবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ে জ্ঞান হারান বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা , ছবি: সংগৃহীত
মোহাম্মদ সোহেলকে ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট ঢাকার বনানী এলাকা থেকে আটক করা হয়। এর আগে তিনি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গ্রেপ্তারের ১৩ দিন আগে তাকে ওই পদ থেকে সরিয়ে নৌ প্রশিক্ষণ ও মতবাদ বিভাগের কমান্ডার হিসেবে বদলি করা হয়। তিনি এর আগে র্যাবের মিডিয়া উইংয়ের প্রধান এবং পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
তার গ্রেপ্তার ও চাকরিচ্যুতির পেছনে সাবেক সেনাপ্রধান (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) হাসিনুর রহমানের সক্রিয় ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নৌবাহিনী প্রধান নাজমুল হাসানেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সোহেলকে ভবিষ্যতে নৌবাহিনী প্রধান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল বলেও উল্লেখ রয়েছে।
৬ আগস্ট তাকে দিয়ে একটি স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হয়, যেখানে বলা হয় তিনি সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক সিদ্দিকীকে সমুদ্রপথে দেশত্যাগে সহায়তা করেছিলেন। পরে তাকে শেখ হাসিনা, তারিক সিদ্দিকী এবং মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল হাসানের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিনিময়ে তাকে পরিবারসহ বিদেশে নিরাপদে বসবাসের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
র্যাবের মিডিয়া শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সোহেল দেশে সক্রিয় বিদেশি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। যদিও তাকে একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়, তবে মূল অভিযোগ ছিল তারিক সিদ্দিকীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অস্থিরতার সময় সোহেল নিয়মিত বার্তায় তারিক সিদ্দিকীকে জানান, সেনাবাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে রাষ্ট্র, সরকার, পুলিশ, বেসামরিক প্রশাসন ও বিচার বিভাগের সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করছে না। তার মতে, এই অবহেলা ছিল পরিকল্পিত এবং নীতিগত সিদ্ধান্তের অংশ।
এদিকে ছাত্র আন্দোলন তীব্রতর হলে তারিক সিদ্দিকী সেনাবাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারান। সামরিক সচিব (অব.) কবির আহমেদ সমন্বয়ে অনীহা দেখান এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (অব.) মাহমুদুল হাসান শামীমকে দায়িত্ব পালনে দুর্বল বলে আখ্যা দেয়া হয়। চিফ অব জেনারেল স্টাফ (অব.) সাইফুল আলম এবং কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল (অব.) মুজিবুল হকের সঙ্গে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামানের দ্বন্দ্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলন। ছবিঃ ওটিএন বাংলা
২০০৪ সাল থেকে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা মেজর (অব.) শোয়েব ও মেজর (অব.) মামুনকে ২০২১ সালে সরিয়ে দেওয়া হয়, যা প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জুলাই-আগস্টের অস্থিরতার সময় সংসদ ভবন, গণভবন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনাগুলো পর্যাপ্ত নিরাপত্তাহীন অবস্থায় ছিল। এসব স্থাপনায় লুটপাটের ঘটনা ঘটে এবং ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু জাদুঘর ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে সেনাসদস্যদের উপস্থিতিতেই।
একই সময়ে দেশের ৪০০টির বেশি থানায় হামলা চালিয়ে নিরস্ত্র পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণ করা হয়। অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়ে যায়, যার বেশিরভাগই এখনো উদ্ধার হয়নি। ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনায় পুলিশকে বাধা দেওয়া হয়। এর ফলে পুলিশ বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে এবং প্রশাসনিক কাঠামো ধীরে ধীরে সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
২০২৪ সালের ২৪ জুন দায়িত্ব নেওয়ার পর সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান শুরুতে সেনাবাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হন। তিনি পরবর্তীতে অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
১৬ জুলাই থেকে দেশজুড়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলেও তাদের নিষ্ক্রিয়তার কারণে পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটে। সঠিক গোয়েন্দা তথ্য সরকারকে না দেওয়ার অভিযোগও উঠে কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
রংপুরে আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোটা সংস্কার আন্দোলন সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। সহিংসতায় ৪৩ জন নিহত হওয়ার পর সরকার পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। অজ্ঞাত হামলাকারীদের গুলিতে হতাহতের ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেলেও তাদের শনাক্ত করা যায়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার এবং সেনাবাহিনী এই হামলাকারীদের শনাক্তে আগ্রহ দেখায়নি। এমনকি যারা সহিংসতায় অংশ নিয়েছিলেন বলে দাবি করেন, তাদের বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া ব্রিগেডিয়ার (অব.) সাখাওয়াত হোসেন স্নাইপার ও ব্যবহৃত গোলাবারুদ নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর তাকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, পুলিশের হত্যার বিচার হবে না এবং এটি ‘মাঠেই নিষ্পত্তি’ হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী জুলাইয়ের ঘটনাকে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে নিহতদের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তুলনা করেছে।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, অতীতের মতোই বিদেশি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা এবং সেনাবাহিনীর একটি অংশের সঙ্গে তাদের সমন্বয়ের বিষয়টি আড়াল করতে তদন্তকে সীমিত রাখা হয়েছে। এতে করে সামগ্রিকভাবে জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহের প্রকৃত চিত্র এখনো আড়ালেই রয়ে গেছে।
সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au