বাংলাদেশ

নর্থইস্ট নিউজের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

‘সামরিক নির্ভরতা’ই বড় ভুল, পরিকল্পিতভাবে সরানো হয় শেখ হাসিনাকে

সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠার পর রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা না করে সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভর করাই শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল ছিল।

  • 12:33 pm - April 18, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৮৪ বার
শেখ হাসিনা সরকার পতনের আগে সেনাবাহিনীর ভেতরের দ্বন্দ্ব। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৮ এপ্রিল- ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেলে রাজধানীর গণভবনে অবস্থানরত স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) কর্মকর্তারা তখনো কোনো সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছিলেন না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কোথায় নেওয়া হবে, সে বিষয়ে তাদের কাছে কোনো পরিষ্কার ধারণা ছিল না। কুর্মিটোলার বাশার ঘাঁটিতে রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের কোনো ঘাটতি না থাকলেও পরিস্থিতির ভেতরে ভেতরে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছিল। শেখ হাসিনা তখন বুঝতে পারেন, তাকে ঘিরে বিশ্বাসঘাতকতা ঘটেছে এবং ক্ষমতা হারানো এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

এমন তথ্য উঠে এসেছে নর্থইস্ট নিউজের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনের দাবি করা হয়, এর প্রায় এক ঘণ্টা আগে তিনি(শেখ হাসিনা) জানতে পারেন, উত্তরা এলাকায় কারফিউ ব্যারিকেড হঠাৎ তুলে নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে ঘোষণা আসে, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। এই ঘোষণা কার্যত ক্ষমতার পালাবদলের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠার পর রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা না করে সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভর করাই শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল ছিল। ৫ আগস্ট সেই ভুলেরই মূল্য দিতে হয় তাকে। জীবন রক্ষার্থে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। বিশেষ করে আর্টিলারি ডিভিশনের ব্রিগেডিয়ার রফিক উত্তরা এলাকায় কারফিউ ব্যারিকেড সরিয়ে নেওয়ার পর সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।

শেখ হাসিনা। ছবিঃ সংগৃহীত

আন্দোলন শুরুতে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের সুযোগ থাকলেও সেনাপ্রধানসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা শেখ হাসিনাকে সে পথে না যেতে নিরুৎসাহিত করেন। পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠার পর তারা সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করার পরামর্শ দেন। যদিও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা এতে সন্তুষ্ট ছিলেন না এবং রাজনৈতিক সমাধানের আশ্বাস দেন।

তবে শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানা ও তার ব্যক্তিগত বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মাধ্যমে সেনাপ্রধান, ডিজিএফআই ও এনএসআই প্রধানরা তাকে সামরিক নির্ভরতার পথেই রাখতে সক্ষম হন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

৫ আগস্ট কুর্মিটোলার বাশার ঘাঁটি থেকে তাকে কৌশলে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। পরে এক টেলিভিশন বার্তায় শেখ হাসিনা জানান, তিনি মনে করেছিলেন নিরাপত্তার কারণে তাকে টুঙ্গিপাড়ায় নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ঘাঁটিতে পৌঁছেই তিনি বুঝতে পারেন, তার ক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে।

৫ আগস্ট কুর্মিটোলার বাশার ঘাঁটি থেকে শেখ হাসিনাকে কৌশলে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। ছবিঃ সংগৃহীত

এর আগে ওইদিন সকালে সেনাপ্রধান ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীর কাছ থেকে বাংলাদেশের একটি সামরিক বিমান ভারতীয় আকাশসীমায় প্রবেশের অনুমতি নেন। শেখ হাসিনার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এসএসএফ, পুলিশ ও র‍্যাব সদস্যরাও তার গন্তব্য সম্পর্কে অবগত ছিলেন না, যদিও তিনি দেশ ছাড়তে অনিচ্ছুক ছিলেন।

এরও আগে, ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের আগেই তাকে গোয়েন্দা সংস্থার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল করে তোলা হয়। তাকে ঘিরে একটি ‘চট্টগ্রাম বলয়’ গড়ে ওঠে। চট্টগ্রামের মোহাম্মদ কায়কোস প্রধান সচিব হন, হাতিয়ার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ হোসেন আল মোরশেদ এনএসআই প্রধান এবং কক্সবাজারের মেজর জেনারেল হামিদুল হক ডিজিএফআই প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। সামরিক সচিব মেজর জেনারেল কবির আহমেদও এই বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জাতিসংঘের তৎকালীন আবাসিক প্রতিনিধি গুইন লুইস নিয়মিত এই বলয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং সেনাপ্রধানের সঙ্গেও বৈঠক করতেন। তিনি শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন এবং রামু ক্যান্টনমেন্টকে স্থায়ী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা ঘাঁটিতে রূপান্তর ও রাখাইন অঞ্চলে সামরিক করিডর তৈরির মতো বিতর্কিত প্রস্তাব দেন।

এমনকি ৫ আগস্ট জনতার সহিংসতার মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে একটি যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করা যায়। তবে ভারতের এক শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে এই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। তার সমন্বয়ে রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে শেখ হাসিনাকে নিরাপদে দিল্লিতে নেওয়া হয়।

৫ আগস্ট রাতেই সেনা সদর দপ্তরে দুটি বিকল্প পরিকল্পনা ছিল, তাকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বা টুঙ্গিপাড়ায় রাখা হবে। কিন্তু উত্তরা এলাকায় ব্যারিকেড তুলে নেওয়ার পর পরিকল্পনা পরিবর্তন করা হয়।

শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ‘নন-স্টেট অ্যাক্টর’রা কোনো বাধা ছাড়াই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলা চালায়। গণভবন, সংসদ ভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ভাঙচুর করা হয়, কিন্তু এসএসএফ কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়নি।

বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলন। ছবিঃ ওটিএন বাংলা

পরিস্থিতির সুযোগে বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চাপে পড়ে। প্রধান বিচারপতিসহ কয়েকজন বিচারককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। সেনাবাহিনীর ‘নির্বাচিত নিষ্ক্রিয়তা’ বিচার বিভাগ ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, ৬২৭ জন ব্যক্তি বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এদের মধ্যে কর্মকর্তা, রাজনীতিক, পুলিশ সদস্য, বিচারক ও ব্যবসায়ীরা ছিলেন। অনেককে দেশ ছাড়তে সহায়তা করা হয়, আবার কিছুজনকে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

পুলিশ মহাপরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মামুনও ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নেওয়ার পর গ্রেপ্তার হন। সাবেক ডিজিএফআই কর্মকর্তা মেজর জেনারেল আকবর হোসেন স্বল্প সময়ের জন্য দেশে ফিরে কমান্ড পুনর্গঠনে সহায়তা করেন।

প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, ১৬ জুলাইয়ের পর থেকে ডিজিএফআই ও এনএসআই সরকারের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখে এবং কোটা আন্দোলনকে সশস্ত্র সংঘর্ষে রূপ দিতে ভূমিকা রাখে। ছয়জন ছাত্রনেতাকে আটক করে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণায় স্বাক্ষর করানো হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

এই ক্ষমতা পরিবর্তনের একটি বড় ফল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী পুনরায় রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ৫ আগস্টের পর প্রশাসন ও সামরিক কাঠামোয় তাদের প্রভাব বাড়ে এবং ৩০ জনের বেশি বিচারককে পদত্যাগে বাধ্য করে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এটি কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে একটি সুপরিকল্পিত পুনর্বিন্যাস, যেখানে সামরিক ও বেসামরিক বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা ছিল এবং যার প্রভাব পড়ে রাষ্ট্রের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে।

সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ

এই শাখার আরও খবর

কোন পথে হাঁটছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র

মেলবোর্ন, ৬ জুন- ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সংঘাতের আশঙ্কা জোরালো হয়ে উঠেছে। গত এপ্রিলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর উভয়…

ইউরোপের মাটিতে ইতিহাস গড়ে সান মারিনোকে হারালো বাংলাদেশ

মেলবোর্ন, ৬ জুন- ইউরোপের মাটিতে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। স্বাগতিক সান মারিনোকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ইউরোপের কোনো দলের বিপক্ষে জয় পেয়েছে…

আইভীর মুক্তি: আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনের ইঙ্গিত নাকি নতুন সমীকরণ?

মেলবোর্ন, ৬ জুন- বিএনপি সরকার সেলিনা হায়াৎ আইভীকে কেন জামিন দিলো? হ্যাঁ, বাংলাদেশে আদালত জামিন দেয় না, জামিন দেয় যারা সরকারে থাকে। তো, আইভীকে কেন…

তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য বাউবির দরজা সবসময় খোলা: উপাচার্য

মেলবোর্ন,০৬জুন-তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান। তিনি বলেছেন, শিক্ষা…

অস্ট্রেলিয়া সিরিজে জাতীয় দলে ফিরছেন সালাউদ্দিন, কোচিং স্টাফে বড় পরিবর্তন

মেলবোর্ন,০৬জুন-আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সিরিজকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের কোচিং স্টাফে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। কোচিং স্টাফে জনবল সংকট দেখা দেওয়ায় আবারও জাতীয় দলের…

বউকে বাঁচাতে গিয়ে শাশুড়ির মৃত্যু, কটিয়াদীতে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল দুজনের

মেলবোর্ন,০৬জুন-কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় মর্মান্তিক বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ঘটনায় এক গৃহবধূ ও তার শাশুড়ির মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের উখরাশাল গ্রামে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পরিবারের এক…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au