যুদ্ধের কারণে মহাকাশ গবেষণা ও প্রতিরক্ষাশিল্পে এ বছর সুসময় যাচ্ছে। ছবিঃ রয়টার্স
মেলবোর্ন, ১৮ এপ্রিল- ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, তার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ইরানের বন্দরগুলোকে ঘিরে নৌ-অবরোধ—সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতিকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশে নামিয়েছে। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয় এবং জ্বালানি সরবরাহে সংকট অব্যাহত থাকে, তাহলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি আরও নেমে ২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম নিম্ন পর্যায় হবে।
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ বহনকারী হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সরাসরি প্রভাব পড়েছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন ও সরবরাহ উভয়ই ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ আরোপ করায় দেশটিতে প্রবেশ ও প্রস্থানকারী জাহাজের চলাচল সীমিত হয়ে গেছে। ফলে তেল, গ্যাস, রাসায়নিক, সারসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের বৈশ্বিক সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

হরমুজ প্রণালী। ছবিঃ সংগৃহীত
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্ন আয়ের এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলো। জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের আমদানি ব্যয় বাড়ছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি হচ্ছে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক শিপিং ও লজিস্টিক খাতেও সংকট তৈরি হয়েছে। আগে যেখানে প্রতিদিন শতাধিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করত, সেখানে এখন সেই সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। এর ফলে পণ্য পরিবহনে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
তবে সামগ্রিক এই নেতিবাচক চিত্রের মধ্যেও অর্থনীতির কিছু খাত অপ্রত্যাশিতভাবে লাভবান হচ্ছে। অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং অনিশ্চয়তা অনেক সময় নির্দিষ্ট কিছু খাতের জন্য সুযোগ তৈরি করে দেয়, বর্তমান পরিস্থিতিও তার ব্যতিক্রম নয়।
বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ বাজারে অস্থিরতা বাড়ার ফলে বড় বিনিয়োগ ব্যাংকগুলো উল্লেখযোগ্য মুনাফা করছে। অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা ঘন ঘন শেয়ার কেনাবেচা করছেন, ফলে বাজারে লেনদেনের পরিমাণ বেড়ে গেছে। এতে ব্যাংকগুলোর কমিশন ও ক্রয়-বিক্রয় মূল্যের পার্থক্য থেকে আয় বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে বড় কয়েকটি মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা করেছে। তারা জানিয়েছে, “শক্তিশালী গ্রাহক সম্পৃক্ততা” এবং “লেনদেনের উল্লম্ফন” তাদের আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি।
অন্যদিকে ক্রিপ্টো-ভিত্তিক পূর্বাভাস প্ল্যাটফর্মগুলোও এই অস্থিরতা থেকে লাভবান হচ্ছে। ‘পলিমার্কেট’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীরা যুদ্ধ, নির্বাচন বা অন্যান্য ঘটনার সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে বাজি ধরতে পারছেন। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই প্ল্যাটফর্মে লেনদেনের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ফি কাঠামো পরিবর্তনের পর তাদের আয় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অল্প সংখ্যক ব্যবহারকারীই এখানে বড় অঙ্কের মুনাফা করছে, যা এই বাজারে বৈষম্যের চিত্রও তুলে ধরছে।
বিশ্বজুড়ে সংঘাত বাড়ার আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ খাতে। বিভিন্ন দেশ নিজেদের নিরাপত্তা জোরদার করতে সামরিক বাজেট বাড়াচ্ছে। ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং মহাকাশ গবেষণায় বিনিয়োগ বেড়েছে। এর ফলে এই খাতের শেয়ারমূল্য ও মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক সূচকে দেখা গেছে, প্রতিরক্ষা খাতের প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক শেয়ারবাজারের চেয়েও বেশি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতও এই অস্থিরতার মধ্যেও স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে এআই-এর চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে এবং যুদ্ধ পরিস্থিতিও এই প্রবৃদ্ধিকে থামাতে পারেনি। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর চিপের চাহিদা বাড়ায় পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো বড় সুবিধা পাচ্ছে। তাইওয়ানের মতো দেশ রেকর্ড পরিমাণ রপ্তানি করছে এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো উল্লেখযোগ্য মুনাফা অর্জন করছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন করে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা এই খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন।
একই সঙ্গে জ্বালানি সংকটের কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নতুন গতি এসেছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে বিশ্বজুড়ে দেশগুলো সৌর, বায়ু এবং পারমাণবিক জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ইতোমধ্যে বহু দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে নতুন নীতিমালা গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজতে দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে, কারণ তারা হরমুজ প্রণালির ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল।
দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ গৃহস্থালি সৌর প্যানেলে কর ছাড়, নতুন প্রকল্প চালু এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সূচক উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে এবং এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
ইরান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে একদিকে গভীর অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি ও সরবরাহ সংকট তৈরি করলেও অন্যদিকে কিছু খাত এই পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে সামগ্রিক বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের মন্দার মুখে পড়তে পারে এবং তখন এই ইতিবাচক প্রবণতাও ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠবে।
সূত্রঃ আল জাজিরা