হামে বাড়ছে মৃত্যু ও সংক্রমণ, ছবি : সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৪ এপ্রিল- বাংলাদেশে হাম রোগের বিস্তার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটির সর্বশেষ মূল্যায়নে বলা হয়েছে, দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি এখন জাতীয়ভাবে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সংক্রমণ দেশের প্রায় সব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া, বিপুলসংখ্যক শিশুর আক্রান্ত হওয়া, টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনা বাড়তে থাকায় এই ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় ইতোমধ্যে হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা মোট জেলার প্রায় ৯১ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে, সংক্রমণ এখন আর কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে এবং মার্চ-এপ্রিল মাসে তা আরও তীব্র আকার ধারণ করে। ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দেশে ১৯ হাজার ১৬১ জন সন্দেহভাজন হাম রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৬৬ জনের, যার মধ্যে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হাম-সম্পর্কিত মৃত্যু রয়েছে ৩০টি।
হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও উদ্বেগজনক। এই সময়ের মধ্যে ১২ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং প্রায় ১০ হাজার রোগী চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, রোগটির বিস্তার যেমন দ্রুত, তেমনি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও এর চাপ বাড়ছে।
ভৌগোলিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ঘটছে ঢাকা বিভাগে। এখানে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৮ হাজারের বেশি। রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকাগুলোতে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল, মিরপুর ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের মতো এলাকায় রোগীর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। জনসংখ্যার ঘনত্ব, স্বাস্থ্যসচেতনতার ঘাটতি এবং টিকাদানের অসম কভারেজ এই বিস্তারের পেছনে বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী শনাক্ত হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আক্রান্তদের বড় অংশই শিশু। হাসপাতালে যাওয়া রোগীদের প্রায় ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী। এর মধ্যে দুই বছরের কম বয়সী শিশু ৬৬ শতাংশ এবং নয় মাসের কম বয়সী শিশু ৩৩ শতাংশ। এই তথ্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ এ বয়সী শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। আরও দেখা গেছে, মোট আক্রান্তদের প্রায় ৯১ শতাংশই ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু, যা এই বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ধরনের ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
হাম-সম্পর্কিত মৃত্যুর ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অধিকাংশ মৃত্যুই ঘটছে টিকা না পাওয়া বা আংশিক টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে, বিশেষ করে দুই বছরের কম বয়সীদের মধ্যে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগেই আক্রান্ত হচ্ছে, যা সংক্রমণের উচ্চমাত্রা নির্দেশ করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বাতাসের মাধ্যমে খুব সহজে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি বা কথা বলার সময় বের হওয়া ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং মুখের ভেতরে সাদা দাগ দেখা যায়। পরে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়, যা মাথা থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তি ফুসকুড়ি ওঠার কয়েকদিন আগে এবং পরে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
যদিও অধিকাংশ রোগী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠে, তবে অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ, মস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস, এমনকি অন্ধত্ব ও মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। প্রতি এক হাজার আক্রান্তের মধ্যে দুই থেকে তিনজনের মৃত্যু হতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, এই প্রাদুর্ভাবের অন্যতম প্রধান কারণ টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি। বাংলাদেশ একসময় হাম নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। তবে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এমআর টিকার সরবরাহ ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং দীর্ঘদিন ধরে সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি না থাকায় অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে। এর ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় বড় ধরনের ফাঁক তৈরি হয়েছে, যা বর্তমান সংক্রমণের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোকে বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে নিয়মিত মানুষের চলাচল থাকায় সীমান্ত পেরিয়ে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে মিয়ানমারে টিকাদান কাভারেজ কম এবং চলমান সংঘাতের কারণে স্বাস্থ্যব্যবস্থা দুর্বল থাকায় সেখান থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি। একই সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজারের মতো বড় শহর আন্তর্জাতিক যাতায়াতের কেন্দ্র হওয়ায় ভ্রমণকারীদের মাধ্যমেও সংক্রমণ বিস্তারের সম্ভাবনা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একাধিক জরুরি সুপারিশ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হামপ্রতিরোধী টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজে অন্তত ৯৫ শতাংশ কভারেজ নিশ্চিত করা, রোগ শনাক্তকরণ ও নজরদারি জোরদার করা, সীমান্ত এলাকায় বিশেষ নজরদারি চালু করা এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে আরও প্রস্তুত করা। হাসপাতালগুলোতে রোগী আলাদা রাখার ব্যবস্থা, দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের লক্ষ্য করে এই কর্মসূচি চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন, দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল সক্রিয় করা এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। একসময় যে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিল, তা এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দ্রুত এবং সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই টিকাদান জোরদার করা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।