আই দিয়ে তৈরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার কন্যা জাইমা রহমানের আপত্তিকর ছবি।
মেলবোর্ন, ২৪ এপ্রিল- ফেসবুকে এআই দিয়ে তৈরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার কন্যা জাইমা রহমানের একটি আপত্তিকর ছবি ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বিষয়টি কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় মুখোমুখি অবস্থান নেয়, যা পরে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতিতে রূপ নেয়।
একই ঘটনায় তথ্য যাচাই, পাল্টা অভিযোগ এবং অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া স্ক্রিনশট এডিট নিয়ে নতুন বিতর্কও তৈরি হয়েছে। শুধু শাহবাগই নয়, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কুমিল্লা, ঈশ্বরদীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে জড়িয়েছে দুইপক্ষ।
শুরু যেভাবে
ঘটনার সূত্রপাত একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ ওঠে, ‘ইশান চৌধুরী’ নামের একটি আইডি থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি বিকৃত ও আপত্তিকর ছবি পোস্ট করা হয়। ওই ছবিতে জাইমা রহমানকে অন্তঃসত্ত্বা হিসেবে দেখানো হয় এবং সেই সন্তানের পিতা হিসেবে তারেক রহমানকে ইঙ্গিত করা হয়।
এই পোস্টটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। পরে বিষয়টি আরও জটিল আকার নেয় যখন একটি এডিট করা স্ক্রিনশট ভাইরাল হয়, যেখানে দাবি করা হয় যে পোস্টটি ডাকসুর শিবির-সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচিত আবদুল্লাহ আল মাহমুদের ফেসবুক আইডি থেকে দেওয়া হয়েছে।
তবে অনুসন্ধান ও যাচাইয়ে দেখা যায়, ওই স্ক্রিনশটটি মূল পোস্টের পরিবর্তিত সংস্করণ। প্রকৃত পোস্টটি ছিল ‘ইশান চৌধুরী’ নামের আইডি থেকে করা, আর সেখানে থাকা মন্তব্যসহ সময়ের তথ্য মিলিয়ে দেখা যায় যে স্ক্রিনশটটি বিকৃত করে আবদুল্লাহ আল মাহমুদের নাম বসানো হয়েছে। অর্থাৎ মূল পোস্টের ওপর অন্য একটি আইডির নাম বসিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই এডিটেড স্ক্রিনশট প্রথমে কিছু রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট আইডি থেকে ছড়ানো হয়। পরে ছাত্রদলের কিছু নেতা সেটি শেয়ার করে আবদুল্লাহ আল মাহমুদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। এর পরপরই বিষয়টি রাজনৈতিক উত্তেজনায় রূপ নেয়।
অভিযোগের মুখে আবদুল্লাহ আল মাহমুদ ফেসবুক পোস্টটি সরিয়ে ফেলেন এবং নিজের প্রোফাইল প্রাইভেট করে দেন বলে জানা যায়। তবে তিনি ঘটনার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন।
শাহাবাগে সংঘর্ষ
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার রাতেই শাহবাগ থানার সামনে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন এবং বিক্ষোভ শুরু করেন। রাত সাড়ে আটটা থেকে সেখানে স্লোগান ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পরে শিবিরের ও ডাকসুর শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা শাহবাগ থানার দিকে গেলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দুই পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি থেকে ধাক্কাধাক্কি এবং পরে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে ডাকসু নেতা এ বি জুবায়ের ও মুসাদ্দিকের ওপর হামলা হলে তারা আহত হন। রাত আনুমানিক ৯টা ২০ মিনিটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

শাহবাগে ডাকসু নেতা এ বি জুবায়ের ও মুসাদ্দিকের ওপর হামলা। ছবিঃ সংগৃহীত
শাহবাগ থানার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, পুরো ঘটনাটি তারা গুরুত্বসহকারে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পুলিশি উপস্থিতিতে দুই পক্ষই এলাকায় অবস্থান করছে।
ছাত্রী সংস্থা নেত্রীর নোংরামি
জাইমা রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে একটি বিতর্কিত স্টাটাস দিয়েছেন ছাত্রী সংস্থার নেত্রী সুমাইয়া বন্যা। তিনি সেখানে তারেক রহমানের কন্যাকে দাঁত নিয়ে কটাক্ষ করে ‘কৃষ্ণাঙ্গদের রাতের রানী’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
গতকাল(বৃহস্পতিবার) শাহাবাগে ডাকসু নেতা মোসাদ্দেকের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে এমন বিতর্কিত মন্তব্য করেন তিনি।

ছাত্রী সংস্থা নেত্রীর ফেসবুক পোস্ট। ছবিঃ সংগৃহীত
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যাম্পাস সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, চট্টগ্রাম সিটি কলেজে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকেই বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। সামাজিক মাধ্যমে একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও প্রচারণা সেই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
এর মধ্যেই পৃথক আরেক ঘটনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি জাইমা রহমানের আপত্তিকর ছবি ফেসবুকে ছড়ানোর অভিযোগে পঞ্চগড়ে এক কলেজ শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, অভিযুক্ত ওই শিক্ষার্থী তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে এআই-জেনারেটেড একটি বিকৃত ছবি পোস্ট করেছিলেন, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষোভ তৈরি হয়। পরে তার বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া ও বিকৃত ছবি তৈরি এবং তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা এখন নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। একদিকে গুজব ও বিভ্রান্তি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট আরও গভীর হচ্ছে।