বুলেট বৈরাগী(বামে) ও নায়ন সাধু(ডানে)। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৮ এপ্রিল- বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগে সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ২জন ব্যক্তির রহস্যজনকভাবে হত্যার ঘটনা ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে কক্সবাজারে এক মন্দির সেবায়েতের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার এবং কুমিল্লায় এক কাস্টমস কর্মকর্তার রহস্যজনক মৃত্যুর পর বিভিন্ন মহলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব ঘটনায় সংখ্যালঘু অধিকার সংগঠনগুলো দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
তারা বলছেন, প্রতিটি মৃত্যুর পেছনের প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা না গেলে সমাজে আস্থাহীনতা আরও বাড়বে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অবশ্য বলছে, ঘটনাগুলো গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটনে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সংখ্যালঘু অধিকার সংগঠনগুলো এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল ইউনিয়নের একটি শিব-কালী মন্দিরের সেবায়েত ও তত্ত্বাবধায়ক নয়ন সাধু নামে ৪০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির মরদেহ নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর একটি গাছ থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তিনি চট্টগ্রাম জেলার দোহাজারী এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ শনিবার রাতে এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানায়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ এপ্রিল রাতে দুই অজ্ঞাত ব্যক্তি নয়ন সাধুকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। তিন দিন পর ২২ এপ্রিল কক্সবাজারের একটি পাহাড়ি এলাকায় গ্রামের বাইরে একটি গাছ থেকে তার মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। মরদেহ উদ্ধারের সময় তা আংশিক পচে গিয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনাটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্ত চলছে। এদিকে নয়নের স্ত্রী ১৯ এপ্রিলই একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন, যার ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়।
ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির এক নেতা কাজল দেবনাথ বলেন, একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছোট মন্দিরের সাধারণ সেবায়েতকে কেন হত্যা করা হতে পারে, তা বোঝা কঠিন। কক্সবাজার জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জনি ধর বলেন, নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা হত্যার আশঙ্কাকে জোরালো করে।
এদিকে গত ২৫ এপ্রিল(শনিবার) কুমিল্লায় আরেক ঘটনায় এক কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় চারজনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। শনিবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে ৩৫ বছর বয়সী বুলেট বৈরাগীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার পরিবারের দাবি, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
র্যাবের একটি কোম্পানির অধিনায়ক মেজর সাদমান ইবনে আলম জানান, শনিবার রাত থেকে কুমিল্লার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ৫ সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
দন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ওই রাতে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওনা হন বুলেট বৈরাগী। বাস থেকে তিনি পদুয়ার বাজার বাসস্ট্যান্ডের কিছুটা সামনে নামেন। সেখান থেকে স্ট্যান্ডে ফেরার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন। কিন্তু সেই অটোরিকশাতেই আগে থেকে অবস্থান করছিল চার ছিনতাইকারী। সামনে চালকসহ দুজন এবং পেছনে বসা ছিল আরও দুজন।
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, অটোরিকশায় ওঠার পর চালক বুলেটকে বলে, ‘আর একজন হলেই গাড়ি ছাড়ব।’ এরপর তাকে বসতে দেওয়া হয় এবং কিছু দূর যেতেই শুরু হয় ছিনতাইয়ের চেষ্টা। এ সময় অস্ত্রের মুখে ফেলে তাকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করে তারা।
র্যাব কর্মকর্তাদের ধারণা, দীর্ঘ যাত্রার কারণে বুলেট বৈরাগী ক্লান্ত ছিলেন। ছিনতাইকারীদের হাতে অস্ত্র দেখে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। এই পরিস্থিতিতে চলন্ত অটোরিকশা থেকেই তাকে মহাসড়কে ফেলে দেয় দুর্বৃত্তরা।
বুলেট বৈরাগী কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি কুমিল্লায় পরিবারসহ বসবাস করতেন এবং তার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলায়। তার মৃত্যু ঘিরেও এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং পরিবারের পক্ষ থেকে দ্রুত বিচার দাবি করা হয়েছে।