বাংলাদেশ

কক্সবাজারের চকরিয়া

বাবার শ্রাদ্ধ শেষে ফেরার পথে ৬ ভাইয়ের মৃত্যু ‘দুর্ঘটনা’ নয়, ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড

  • 2:08 pm - May 07, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৯০ বার
নিহত ছয় ভাই। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৭ মে- কক্সবাজারের চকরিয়ায় এক পরিবারের ছয় ভাইয়ের বাবার শ্রাদ্ধ শেষে মৃত্যু প্রথমে সড়ক দুর্ঘটনা বলে মনে হলেও, দীর্ঘ তদন্ত শেষে সেটি যে আসলে ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড ছিল, সেই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের তদন্তে। শুরুতে “দুর্ঘটনা” হিসেবে বিবেচিত এই ঘটনাই পরে পরিণত হয় দেশের অন্যতম আলোচিত হত্যামামলায়।

ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মালুমঘাট এলাকায় এক পরিবারের কয়েকজন সদস্য রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাদের বাবা সুরেশ চন্দ্র সুশীলের মৃত্যুর দশম দিনের শ্রাদ্ধের পূজা শেষে তারা বাড়ি ফিরছিলেন। সেই সময় মহাসড়ক পার হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন পরিবারের সদস্যরা।

হঠাৎ একটি সবজিবোঝাই পিকআপ দ্রুতগতিতে এসে তাদের ওপর উঠে যায়। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান অনুপম সুশীল, নিরুপম সুশীল, দীপক সুশীল ও চম্পক সুশীল। গুরুতর আহত হন আরও কয়েকজন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান স্মরণ সুশীল ও রক্তিম সুশীল। একই ঘটনায় আহত হন প্লাবন সুশীল ও তাদের বোন হীরা সুশীল। দীর্ঘ চিকিৎসার পর তারা বেঁচে যান।

ঘটনার পরপরই এটিকে সাধারণ সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবেই ধরে নেয় পুলিশ। মামলা হয় অজ্ঞাতনামা চালকের বিরুদ্ধে। তদন্তও এগোয় সেই ধারাতেই। এমনকি নিহতদের অধিকাংশ মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়। একটি মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় সড়ক দুর্ঘটনায় সৃষ্ট আঘাত ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ।

থানা পুলিশের তদন্তে বলা হয়, চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়েছেন। মাত্র নয় দিনের মধ্যেই চালককে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়। সবকিছুই তখন একটি ‘দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা’ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছিল।

কিন্তু ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়ভাবে নানা প্রশ্ন উঠতে থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং আহতদের বিবরণে অসঙ্গতি ধরা পড়ে। বিষয়টি চাঞ্চল্যকর আকার নিলে তদন্তভার দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে।

নতুন করে তদন্ত শুরু করে পিবিআই। তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন, গাড়ির গতি ও অবস্থান বিশ্লেষণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং আহতদের জবানবন্দি মিলিয়ে দেখতে থাকে। তখনই ধীরে ধীরে সামনে আসে ভয়ংকর এক চিত্র।

তদন্তে জানা যায়, প্রথম ধাক্কায় কয়েকজনকে চাপা দেওয়ার পর পিকআপটি একটি খুঁটিতে ধাক্কা খেয়ে থেমে যায়। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে চালকের গাড়ি থামিয়ে আহতদের উদ্ধারের চেষ্টা করার কথা। কিন্তু এই ঘটনায় ঘটেছিল উল্টোটা।

পিবিআইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, চালক ইচ্ছাকৃতভাবে গাড়িটি আবার স্টার্ট দেন। এরপর পেছনে নিয়ে আবারও আহতদের শরীরের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যান। শুধু তাই নয়, পরে সামনে এগিয়ে আরও দুজনকে চাপা দেন এবং আরেকজনকে ধাক্কা দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।

এই ধারাবাহিক আচরণ তদন্তকারীদের কাছে ঘটনাটিকে আর নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে রাখেনি। তারা মনে করেন, আহতদের বাঁচানোর বদলে নিশ্চিত মৃত্যু ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।

তদন্তে আরও উঠে আসে, পিকআপটির বৈধ ফিটনেস ছিল না। চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্সও বৈধ ছিল না। গাড়িটির রুট পারমিটেও নানা অনিয়ম পাওয়া যায়। ফলে শুরু থেকেই গাড়িটি অবৈধভাবে সড়কে চলছিল।

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় চালক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন বলে জানায় পিবিআই। পরে গাড়ির মালিককেও গ্রেফতার করা হয়। তদন্তে সংগৃহীত তথ্য, ঘটনাস্থলের আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং চালকের আচরণ বিশ্লেষণ করে পিবিআই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে এটি শুধুমাত্র বেপরোয়া গাড়িচালনার ঘটনা নয়, বরং ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড।

সবশেষে চালকের বিরুদ্ধে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর পাশাপাশি দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যা মামলা অন্তর্ভুক্ত করে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। মালিকসহ সংশ্লিষ্ট অন্যদের বিরুদ্ধেও পৃথক অভিযোগ আনা হয়।

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত চালককে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা জরিমানা করেন। মামলার অপর দুই আসামির বিচার এখনো চলমান রয়েছে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত পিবিআইয়ের ‘পরিচয়হীন অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ এবং ক্লুলেস মার্ডার মামলার তদন্ত’ শীর্ষক বইয়ে এই মামলাটি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সঠিক তদন্ত, ঘটনাস্থলের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এবং অভিযুক্তের আচরণগত মূল্যায়নের মাধ্যমে এমন অনেক ঘটনাই নতুন মোড় নিতে পারে, যেগুলো প্রথমে সাধারণ দুর্ঘটনা বলে মনে হয়।

পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এই মামলাটি প্রমাণ করেছে যে সড়ক দুর্ঘটনার আড়ালেও কখনো কখনো লুকিয়ে থাকতে পারে পরিকল্পিত হত্যার মতো ভয়ংকর অপরাধ।

 

এই শাখার আরও খবর

মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়তে অস্বীকৃতি মমতার, নজিরবিহীন সাংবিধানিক সংকটে পশ্চিমবঙ্গ

মেলবোর্ন, ৭ মে- পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর রাজ্যজুড়ে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট। নির্বাচনে বড় ব্যবধানে পরাজয়ের দাবি উঠলেও মুখ্যমন্ত্রীর পদ…

‘আপনি তিন লাখ টাকা দেন’: চোরাই পণ্য জব্দের পর এসআই

মেলবোর্ন, ৭ মে- নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় চোরাই পথে আনা ভারতীয় প্রসাধনী জব্দ এবং দুই যুবক আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের এক উপপরিদর্শকের (এসআই) বিরুদ্ধে ঘুষ…

ড. ইউনূসসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন

মেলবোর্ন, ৭ মে- রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মাদ…

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা, বাংলাদেশ-চীন-ভারত ত্রিমুখী কূটনৈতিক চাপ

মেলবোর্ন, ৭ মে- বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের চলমান চীন সফরকে ঘিরে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পানি বণ্টন ইস্যু। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন…

বাগেরহাটে হিন্দু পরিবারে ভাঙচুর–লুটপাট, কি ঘটেছিল

মেলবোর্ন, ৭ মে- বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের বাগেরহাটের শরণখোলায় জমি সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের বিরোধকে কেন্দ্র করে এক হিন্দু পরিবারের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এতে…

নির্বাচনের পরও মাঠে সেনা, সহযোগিতা নাকি নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত?

মেলবোর্ন, ৭ মে- বাংলাদেশে মাঠ পর্যায়ে সেনাবাহিনীর দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি এবং প্রশাসনের সঙ্গে তাদের সমন্বিত ভূমিকা ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নির্বাচন…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au