‘আপনি তিন লাখ টাকা দেন’: চোরাই পণ্য জব্দের পর এসআই
মেলবোর্ন, ৭ মে- নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় চোরাই পথে আনা ভারতীয় প্রসাধনী জব্দ এবং দুই যুবক আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের এক উপপরিদর্শকের (এসআই) বিরুদ্ধে ঘুষ…
মেলবোর্ন, ৭ মে- পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর রাজ্যজুড়ে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট। নির্বাচনে বড় ব্যবধানে পরাজয়ের দাবি উঠলেও মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি। বিজেপি দাবি করেছে, ২৯৪ আসনের মধ্যে তারা ২০৭টি আসনে জয় পেয়েছে এবং স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। তবে মমতা ব্যানার্জির অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় পরিকল্পিতভাবে ভোটে কারচুপি করে ফলাফল পাল্টে দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনী ফল ঘোষণার পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে মমতা ব্যানার্জি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, তিনি নির্বাচন হারেননি এবং রাজভবনে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেবেন না। তার ভাষায়, “আমি হারিনি। এই ফলাফল জনগণের রায় নয়, এটি চুরি করা ফল।” তিনি অভিযোগ করেন, বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের যোগসাজশে ভোটার তালিকা পরিবর্তন, প্রশাসনিক প্রভাব এবং নানা অনিয়মের মাধ্যমে নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করা হয়েছে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে , ছবিঃ সংগৃহীত
এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের ইতিহাসে এ ধরনের পরিস্থিতির খুব কম নজির রয়েছে। কারণ, সাধারণত কোনো মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনে পরাজিত হলে সাংবিধানিক রীতি অনুযায়ী পদত্যাগ করেন এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত কেয়ারটেকার সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু এবার সেই প্রচলিত রীতি মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন মমতা ব্যানার্জি।
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের সংবিধানে কোথাও সরাসরি উল্লেখ নেই যে নির্বাচনে পরাজয়ের পর একজন মুখ্যমন্ত্রীকে বাধ্যতামূলকভাবে পদত্যাগ করতে হবে। তবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো বিধানসভার আস্থা। নির্বাচনের ফলাফলে যদি স্পষ্ট হয় যে কোনো মুখ্যমন্ত্রীর আর সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন নেই, তাহলে তার পদে থাকার নৈতিক ও সাংবিধানিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজ্যপাল আরএন রবির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজ্যপাল প্রথমে মুখ্যমন্ত্রীকে বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের নির্দেশ দিতে পারেন। যদি মমতা ব্যানার্জি তা প্রমাণে ব্যর্থ হন, তাহলে রাজ্যপাল সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিজেপিকে সরকার গঠনের আহ্বান জানাতে পারেন।
ভারতীয় সংবিধানের ১৬৪(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মুখ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা ‘গভর্নরের সন্তুষ্টি পর্যন্ত’ দায়িত্ব পালন করেন। অর্থাৎ বিশেষ পরিস্থিতিতে গভর্নর মুখ্যমন্ত্রীকে অপসারণের সুপারিশও করতে পারেন। এছাড়া পরিস্থিতি আরও জটিল হলে রাষ্ট্রপতির শাসন জারির সুপারিশ করার সাংবিধানিক সুযোগও রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বর্তমান মেয়াদ শেষ হচ্ছে বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর। কিন্তু নতুন সরকার শপথ নেওয়ার সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ৯ মে। ফলে মাঝের সময়টুকুতে প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অন্তর্বর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় অল্প সময়ের জন্য রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
প্রবীণ আইনজীবী হরিশ সালভে বলেছেন, রাজ্যপাল চাইলে মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করতে পারেন। তিনি পদত্যাগ করলে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত তাকে কেয়ারটেকার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালনের অনুরোধ জানানো হতে পারে। তবে সেই ব্যবস্থার মধ্যেও অল্প সময়ের জন্য সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হলে রাষ্ট্রপতি শাসনের প্রয়োজন হতে পারে।
ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন ২৯৩টি আসনের গেজেট নোটিফিকেশন রাজ্যপালের কাছে জমা দিয়েছে। বিজেপি জানিয়েছে, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সরকার গঠনের জন্য প্রস্তুত এবং রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীর দিন ৯ মে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন। ছবিঃ সংগৃহীত
তবে তৃণমূল কংগ্রেস এখনো ফলাফল মানতে নারাজ। মমতা ব্যানার্জি দাবি করেছেন, অন্তত ১০০টি আসনের ফলাফল “চুরি” করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক পক্ষপাতের মাধ্যমে বিরোধী ভোটকে প্রভাবিত করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফল অনুযায়ী, তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ৮০টি আসন, যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে অনেক দূরে। বিজেপির দাবি, জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে এবং এখন ক্ষমতা হস্তান্তর বিলম্বিত করার চেষ্টা চলছে।
সংবাদ সম্মেলনে মমতা ব্যানার্জি আরও অভিযোগ করেন, ভোট গণনার সময় তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে। তার দাবি, গণনাকেন্দ্রে তাকে পেট ও পিঠে লাথি মারা হয় এবং সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ রাখা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, একপর্যায়ে তাকে গণনাকেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়। যদিও এসব অভিযোগ এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মমতা ব্যানার্জি মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা ও বিহারের সাম্প্রতিক নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। তার ভাষায়, “গণতন্ত্র এভাবে চলে না। বিচারব্যবস্থা যখন কার্যকর থাকে না, নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়ে এবং কেন্দ্র একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তখন তা দেশের জন্য বিপজ্জনক বার্তা দেয়।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ৪৮ ঘণ্টা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মমতা ব্যানার্জি শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেন, রাজ্যপাল কী পদক্ষেপ নেন এবং বিজেপি সরকার গঠনের আমন্ত্রণ পায় কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে রাজ্যের সাংবিধানিক সংকট কোন দিকে মোড় নেয়।
একই সঙ্গে বিষয়টি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়াতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, নির্বাচন ফলাফল নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস আইনি লড়াইয়ে যেতে পারে এবং সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে আদালতের ব্যাখ্যা চাইতে পারে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন শুধু একটি রাজ্যের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, বরং ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্যও একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au