বাংলাদেশ

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা, বাংলাদেশ-চীন-ভারত ত্রিমুখী কূটনৈতিক চাপ

  • 5:39 pm - May 07, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৩ বার
তিস্তা নদী। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৭ মে- বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের চলমান চীন সফরকে ঘিরে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পানি বণ্টন ইস্যু। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার আড়াই মাসের মাথায় হওয়া এই সফরকে কেবল দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সফর হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক ভূরাজনীতি ও বড় উন্নয়ন প্রকল্পের সম্ভাব্য মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তিন দিনের এই রাষ্ট্রীয় সফরে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ এবং বিশেষ করে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হচ্ছে তিস্তা নদী ঘিরে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সংকট ও এর সম্ভাব্য সমাধানের রূপরেখা।

তিস্তা নদীর পানি বণ্টন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বহু দশকের পুরোনো একটি অমীমাংসিত ইস্যু। ২০১১ সালে দুই দেশের মধ্যে একটি খসড়া চুক্তি চূড়ান্ত হলেও সেটি এখনো কার্যকর হয়নি। ফলে বাস্তবে কোনো বাধ্যতামূলক পানি বণ্টন কাঠামো না থাকায় পরিস্থিতি প্রতিবছরই জটিল হয়ে ওঠে।

২০২৫ সালে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন উত্তরাঞ্চলের তিস্তা নদী সংশ্লিষ্ট একটি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে যান। ছবিঃ দ্য ডেইলি স্টার

শুষ্ক মৌসুমে ভারতীয় অংশে নদীর উজানে অবস্থিত একাধিক ব্যারেজে পানি আটকে রাখায় বাংলাদেশ অংশে তিস্তা প্রায় শুকিয়ে যায়। এতে রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে বর্ষাকালে উজান থেকে হঠাৎ করে অতিরিক্ত পানি ছাড়ার কারণে ভয়াবহ বন্যা, নদীভাঙন ও বসতভিটা হারানোর ঘটনা নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীরা বলছেন, তিস্তা এখন আর শুধু একটি নদী নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবিকা ও অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সংকটের নাম।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ সরকার একটি দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে, যার নাম “কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট”। এই মহাপরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল নদী ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ, ভাঙন রোধ, পানি সংরক্ষণ এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া।

প্রাথমিক সমীক্ষা শুরু হয় ২০১৬ সালে এবং ২০২৩ সালে এর একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পাওয়ার চায়না যৌথভাবে দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করে।

প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ১০২ কিলোমিটার নদী খনন, প্রায় ২০৩ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ, ১৭১ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার এবং নদীর দুই পাড়ে আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা। এর মধ্যে স্যাটেলাইট শহর, পর্যটন কেন্দ্র, হোটেল ও রেস্তোরাঁ অঞ্চল এবং প্রায় ১৫০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বাংলাদেশ ও চীনের পতাকা। সংগৃহীত

প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশ আসবে বিদেশি ঋণ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে।

চীন দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রকল্পে অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। তাদের মতে, এটি শুধু একটি নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নয়, বরং আঞ্চলিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক করিডোর উন্নয়নের অংশ।

অন্যদিকে ভারত শুরু থেকেই এই প্রকল্প নিয়ে সতর্ক অবস্থানে ছিল। ২০২৪ সালে বিষয়টি নিয়ে ঢাকায় এবং নয়াদিল্লিতে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। তখন ভারতও তিস্তা প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। ফলে প্রকল্পটি একটি ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও পরিণত হয়।

পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রকল্পের গতি আবারও চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বর্তমান সরকারও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান চীন সফরের আগে সাংবাদিকদের বলেন, তিস্তা প্রকল্প উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-মরণ প্রশ্ন। সরকার এই সমস্যাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং চীনের সঙ্গে আলোচনায় বিষয়টি গুরুত্বসহকারে উপস্থাপন করা হবে।

তিনি আরও বলেন, এটি কোনো একক প্রকল্প নয়, বরং একটি জাতীয় অঙ্গীকার। সরকার কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি বাস্তব উন্নয়ন কাজও এগিয়ে নিতে চায়।

তিস্তা নিয়ে স্থানীয় আন্দোলনও দীর্ঘদিন ধরে চলমান। “তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ”সহ বিভিন্ন সংগঠন নিয়মিত কর্মসূচি পালন করে আসছে। তাদের দাবি, কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, প্রথমে আন্তর্জাতিক পানি বণ্টন চুক্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

সংগঠনের নেতারা বলছেন, উজান থেকে পানি আটকে রাখার সমস্যা সমাধান না হলে যেকোনো প্রকল্পই আংশিক সমাধান দেবে। তাই ভারতের সঙ্গে কার্যকর পানি চুক্তি ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা প্রকল্প এখন কেবল একটি উন্নয়ন উদ্যোগ নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি বড় শক্তি বাংলাদেশ, ভারত ও চীনের মধ্যে কৌশলগত ভারসাম্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

চীনের “বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ” বা বিআরআই কাঠামোর অধীনে এই প্রকল্পকে অনেকেই একটি বড় আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্প হিসেবে দেখছেন। এর মাধ্যমে চীন মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ ও ভারতীয় সীমান্ত পর্যন্ত অর্থনৈতিক করিডোর সম্প্রসারণ করতে চায় বলে বিশ্লেষকদের মত।

ভারত আবার এই ধরনের করিডোরকে নিরাপত্তা ও প্রভাব বলয়ের দিক থেকে সংবেদনশীল বলে বিবেচনা করে। তাই তিস্তা প্রকল্পে চীনের ভূমিকা নিয়ে তাদের দীর্ঘদিনের সন্দেহ রয়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের মূল আগ্রহ অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন, সরাসরি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নয়। অন্যদিকে ভারতের উদ্বেগ মূলত ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে।

তিস্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনে বাস্তব সংকট তৈরি করেছে। বন্যা, খরা ও নদীভাঙনের কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা এখন খুবই স্পষ্ট, তারা দ্রুত এবং বাস্তব সমাধান চান।

সরকার বলছে, তারা কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভর না করে বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক ও উন্নয়ন কৌশলের মাধ্যমে সমাধান খুঁজছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীও একই অবস্থান জানিয়ে বলেছেন, “বসে থাকার সময় নেই, উন্নয়নও চলবে, কূটনীতিও চলবে।”

তিস্তা ইস্যু এখন আর শুধু একটি নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নয়। এটি বাংলাদেশ-ভারত-চীন সম্পর্কের মধ্যে একটি জটিল কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণের নাম, যার ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে চীন সফরের আলোচনার ফলাফলের ওপর।

সূত্রঃ বিবিসি

এই শাখার আরও খবর

‘আপনি তিন লাখ টাকা দেন’: চোরাই পণ্য জব্দের পর এসআই

মেলবোর্ন, ৭ মে- নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় চোরাই পথে আনা ভারতীয় প্রসাধনী জব্দ এবং দুই যুবক আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের এক উপপরিদর্শকের (এসআই) বিরুদ্ধে ঘুষ…

ড. ইউনূসসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন

মেলবোর্ন, ৭ মে- রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মাদ…

বাগেরহাটে হিন্দু পরিবারে ভাঙচুর–লুটপাট, কি ঘটেছিল

মেলবোর্ন, ৭ মে- বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের বাগেরহাটের শরণখোলায় জমি সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের বিরোধকে কেন্দ্র করে এক হিন্দু পরিবারের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এতে…

নির্বাচনের পরও মাঠে সেনা, সহযোগিতা নাকি নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত?

মেলবোর্ন, ৭ মে- বাংলাদেশে মাঠ পর্যায়ে সেনাবাহিনীর দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি এবং প্রশাসনের সঙ্গে তাদের সমন্বিত ভূমিকা ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নির্বাচন…

খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফ সদস্যকে গুলি করে হত্যা

মেলবোর্ন, ৭ মে- খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক) সদস্য মো. ইমন হোসেনকে (২৫)। বৃহস্পতিবার (৭ মে)…

বাবার শ্রাদ্ধ শেষে ফেরার পথে ৬ ভাইয়ের মৃত্যু ‘দুর্ঘটনা’ নয়, ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড

মেলবোর্ন, ৭ মে- কক্সবাজারের চকরিয়ায় এক পরিবারের ছয় ভাইয়ের বাবার শ্রাদ্ধ শেষে মৃত্যু প্রথমে সড়ক দুর্ঘটনা বলে মনে হলেও, দীর্ঘ তদন্ত শেষে সেটি যে আসলে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au