সেনাবাহিনীর টহল দল। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৭ মে- বাংলাদেশে মাঠ পর্যায়ে সেনাবাহিনীর দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি এবং প্রশাসনের সঙ্গে তাদের সমন্বিত ভূমিকা ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নির্বাচন শেষ হওয়ার পরও সেনাবাহিনী পুরোপুরি ব্যারাকে ফিরে না গিয়ে মাঠ প্রশাসনে সক্রিয় থাকায় দেশটির শাসন কাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কেউ কেউ এটিকে বেসামরিক প্রশাসনের ওপর সামরিক প্রভাবের সম্প্রসারণ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন এটি কেবল সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ।
ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন এই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে আসে। সম্মেলনের তৃতীয় দিনে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, যেকোনো প্রয়োজনে সেনাবাহিনী দ্রুত সহায়তা দেবে। দুর্যোগ, দুর্ঘটনা বা যেকোনো সংকটে সংশ্লিষ্ট সেনা ফরমেশনে জানালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করায় জনগণের আস্থা সেনাবাহিনীর প্রতি আরও বেড়েছে।
ডিসি সম্মেলনে অংশ নেওয়া কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন এখন সেনাবাহিনীর শক্তিশালী প্রভাবের মধ্যেই কাজ করছে। তাদের মতে, এটি এমন এক পরিস্থিতি যেখানে বেসামরিক প্রশাসন পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করছে না। কেউ কেউ এটিকে “পরোক্ষ সামরিক প্রভাবের কাঠামো” বলেও বর্ণনা করেছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই প্রশাসনিক কাঠামোয় সেনাবাহিনীর ভূমিকা বাড়তে থাকে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে সেনাপ্রধান বলেছিলেন, রাজনৈতিক সরকার গঠিত হলে সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাবে। তবে বাস্তবে এখনো তাদের মাঠ পর্যায়ের উপস্থিতি অব্যাহত রয়েছে এবং তাদের “স্ট্রাইকিং ফোর্স” হিসেবে ব্যবহারের কথাও আলোচনায় এসেছে।
সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এ কে এম শামসুল ইসলাম বলেন, জাতীয় স্বার্থে ডিসিদের সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। তিনি জানান, সরকার সেনাবাহিনীকে আরও জনমুখী করতে চায় এবং ভবিষ্যৎ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা নেওয়া হবে।
এই বক্তব্যগুলো প্রশাসনিক কাঠামোয় সামরিক কর্তৃত্বের প্রভাব আরও দৃশ্যমান করেছে বলে বিশ্লেষকদের মত। তাদের মতে, এতে সেনাবাহিনীর ব্যারাকে ফেরার প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য বিলম্বিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে শুধু মাঠ প্রশাসন নয়, বিভিন্ন আধাসামরিক ও বিশেষায়িত বাহিনীতেও সেনা কর্মকর্তাদের নেতৃত্ব রয়েছে। আনসার ও ভিডিপি, ফায়ার সার্ভিস এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে (বিজিবি) উচ্চপদে সেনা কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। র্যাবসহ পুলিশের কিছু বিশেষ ইউনিটেও সামরিক প্রভাব রয়েছে বলে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।
ডিসি সম্মেলনে সেনাপ্রধান দাবি করেন, সাম্প্রতিক নির্বাচন দেশের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ছিল এবং এটি প্রমাণ করে যে প্রশাসন সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছে। তিনি বলেন, একসময় দেশে অনিশ্চয়তা ছিল এবং নির্বাচন নিয়ে সংশয় ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে।
এই সম্মেলনেই প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের সঙ্গে পৃথক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ১ হাজার ৭২৯টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৯৮টি আলোচনায় আনা হয়, যেখানে স্থানীয় উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে।
সেনাসদরের একটি সূত্র জানিয়েছে, মাঠ প্রশাসনের সক্ষমতা এখনো সীমিত, ফলে পুলিশ ও জেলা প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতাই প্রশাসনিক কাঠামোয় সামরিক উপস্থিতিকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করছে বলে অনেকে মনে করছেন।
অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির সাম্প্রতিক সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, ধাপে ধাপে সেনাবাহিনীকে মাঠ থেকে প্রত্যাহার শুরু হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমে দূরবর্তী জেলা, পরে বড় জেলা ও বিভাগীয় শহর থেকে সেনা সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া হবে। সব মিলিয়ে জুন মাসের মধ্যে মাঠ পর্যায় থেকে সেনাবাহিনী পুরোপুরি প্রত্যাহারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের আন্দোলন ও রাজনৈতিক সংকটের সময় সেনাবাহিনী মাঠে নামে এবং পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় ধরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। সেই সময় পুলিশ প্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়ায় সেনাবাহিনী মাঠেই থেকে যায় এবং পরবর্তীতে বিচারিক ক্ষমতাও পায়।
সেনাপ্রধান আগেও একাধিকবার বলেছেন, পুলিশ ও বেসামরিক প্রশাসন পুনর্গঠিত হলে সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাবে। তবে সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলোতে দেখা যাচ্ছে, প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া এখন ধাপে ধাপে হলেও সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বর্তমানে দেশে আনুমানিক ১৭ হাজার সেনাসদস্য মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে। স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের ধীরে ধীরে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এই পুরো পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু কোথায় অবস্থান করছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। কেউ এটিকে নিরাপত্তা সহযোগিতা হিসেবে দেখলেও, কেউ বলছেন এটি বেসামরিক শাসনের ওপর সামরিক প্রভাবের এক ভিন্ন রূপ।
সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ