এসআই আবু হানিফা। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৭ মে- নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় চোরাই পথে আনা ভারতীয় প্রসাধনী জব্দ এবং দুই যুবক আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের এক উপপরিদর্শকের (এসআই) বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেন নিয়ে দর–কষাকষির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় কথিত অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ প্রশাসনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত এসআই মো. আবু হানিফাকে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং ঘটনাটি তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বুধবার রাত ১০টার পর দুটি অডিও ক্লিপ ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অডিওগুলো প্রকাশের পরপরই স্থানীয় এলাকাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। পরে রাত ১১টার দিকে নেত্রকোনার পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। অডিওটি নজরে আসার পরই এসআই আবু হানিফাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সজল কুমার সরকারকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা মিললে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার গভীর রাতে কলমাকান্দা উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের রাঙ্গামাটিয়া এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় একটি পিকআপ গাড়ি থেকে ১৮ বস্তা ভারতীয় প্রসাধনী জব্দ করা হয়। জব্দ করা পণ্যের মধ্যে ছিল বডি স্প্রে, শ্যাম্পু ও অলিভ অয়েলসহ বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনী সামগ্রী। ঘটনাস্থল থেকে পিকআপের চালক নাজিরপুরের শিংপুর গ্রামের নাছিম (২৩) এবং তাঁর সহকারী সেইচাহানি গ্রামের মনির হোসেনকে (২১) আটক করা হয়।
এ ঘটনায় পরে রাজনগর গ্রামের জসিম উদ্দিনসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় জসিম উদ্দিনকে চোরাই পণ্যের মূল হোতা হিসেবে উল্লেখ করেছে পুলিশ।
তবে অভিযানের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিও ক্লিপগুলো নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। প্রথম অডিওটির দৈর্ঘ্য ৫ মিনিট ২৩ সেকেন্ড। সেখানে জসিম উদ্দিনকে বলতে শোনা যায়, “স্যার, আপনাকে ৮০ হাজার টাকা দেব। আপনি আমাকে মামলা দেবেন না। শুধু দুই বস্তা মাল আটক দেখাবেন।”
এর জবাবে অপর প্রান্তের এক ব্যক্তিকে, যাঁকে স্থানীয়রা এসআই আবু হানিফা বলে দাবি করছেন, বলতে শোনা যায়, “না ভাই, যা বলছি তার কম হবে না। আপনি তিন লাখ টাকা দেন।”
একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি আরও বলেন, “এক লাখ টাকা দিব। ওসি স্যার কিন্তু বিপক্ষে যাবে না। ওসি স্যার বলছেন, যেহেতু আমাকে জানিয়ে আপনারা করেছেন, দারোগার সঙ্গে কথা বলেন।”
রাত ১টা ৪১ মিনিটে রেকর্ড করা হয়েছে বলে দাবি করা দ্বিতীয় অডিওটির দৈর্ঘ্য ৩ মিনিট ১২ সেকেন্ড। সেখানে ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলে দাবি করা ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, “আপনি যা করবেন, তাড়াতাড়ি করেন। আমি এখন ভবানীপুর ব্রিজ পার হচ্ছি…আপনার জন্য আমি ছাড় দিলাম, আড়াই লাখ টাকা নিয়ে আসেন।”
এর জবাবে জসিম উদ্দিনকে বলতে শোনা যায়, “আমি কষ্ট করে হলেও আপনাকে দুই লাখ টাকা দিচ্ছি। আমাকে একটু সময় দেন।”
অডিওর একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি আরও বলেন, “দেইখেন, হোয়াটসঅ্যাপে কথা অন্য ফোনে রেকর্ড করা যায়, এটা করবেন না।”
অডিও ফাঁসের পর ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। অনেকেই নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত এসআই আবু হানিফা এবং মামলার আসামি জসিম উদ্দিনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
কলমাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সিদ্দিক হোসেন বলেন, বিষয়টি পুলিশ সুপার সরাসরি দেখছেন। এসআই আবু হানিফাকে ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি চোরাই পণ্যের মূল অভিযুক্ত জসিম মিয়াকে আটকের চেষ্টা চলছে। নিজের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি দাবি করেন, “এসব ঘটনার সঙ্গে আমি জড়িত নই।”
ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের ওপর বাড়তি নজরদারি শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে এখন তাকিয়ে রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট মহল।