বিশ্ব

এসআইআর কি বদলে দিল পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল? নির্বাচন কমিশনের তথ্য কী বলছে

যেসব আসনে সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়েছিল, সেখানেই শেষ পর্যন্ত সেই রাজনৈতিক দলগুলোই জয়ী হয়েছে, যারা এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করেছিল।

  • 2:55 pm - May 09, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৪২ বার
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয়। ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৯ মে- ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন) কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য ঘিরে নতুন করে বিস্তৃত আলোচনা শুরু হয়েছে। ভোটের আগে এই প্রক্রিয়াটি রাজ্যের অন্যতম বড় রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়েছিল। তৃণমূল কংগ্রেসসহ একাধিক বিরোধী দল অভিযোগ তুলেছিল, এই সংশোধন কার্যক্রমের মাধ্যমে সংখ্যালঘু, অভিবাসী শ্রমিক এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ভোটারদের নাম ইচ্ছাকৃতভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয় এবং নির্বাচন কমিশনকে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। বিরোধী নেতারা বারবার দাবি করেন, লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটার ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

তবে ভোটের পর নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত পরিসংখ্যান এই পুরো বিতর্ককে অনেক বেশি জটিল ও বহুমাত্রিক বাস্তবতার দিকে নিয়ে গেছে। তথ্য বলছে, এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় যেমন বিপুল সংখ্যক “অযোগ্য” ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তেমনি সমান গুরুত্বপূর্ণভাবে বৈধ ভোটারদের নতুন সংযোজনও হয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যেসব আসনে সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়েছিল, সেখানেই শেষ পর্যন্ত সেই রাজনৈতিক দলগুলোই জয়ী হয়েছে, যারা এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করেছিল।

এসআইআর প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া ৯১ লাখ ভোটারের ৬৩ শতাংশই হিন্দু। ছবিঃ সংগৃহীত

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ভোটার নাম বাদ পড়েছে মালদা ও মুর্শিদাবাদ অঞ্চলের আসনগুলোতে। সুজাপুরে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ভোটার বাদ পড়েন। রঘুনাথগঞ্জে ১ লাখ ৩০ হাজার, সামশেরগঞ্জে ১ লাখ ২৫ হাজার, রতুয়ায় ১ লাখ ২৩ হাজার এবং সুটিতে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ যায়। এই অঞ্চলগুলোতেই এসআইআর নিয়ে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল এবং বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোকে লক্ষ্য করে ভোটার তালিকা সংশোধন করা হয়েছে।

তবে ভোটের ফলাফল সেই অভিযোগকে সরাসরি সমর্থন করেনি। এই পাঁচটি আসনেই জয় পেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। অর্থাৎ, বড় পরিসরে ভোটার নাম বাদ পড়া সত্ত্বেও এই অঞ্চলগুলোতে বিরোধী শিবিরের ভোটভিত্তি ভেঙে পড়েনি।

এর পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, একই সময় এই আসনগুলোতে বিপুল সংখ্যক নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মনোনয়ন জমার শেষ দিন পর্যন্ত সময়ে সুজাপুরে প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার নতুন ভোটার যোগ হয়। রানিনগরে প্রায় ৭৬ হাজার, হরিশচন্দ্রপুরে ৭৪ হাজারের বেশি, চাঁচলে ৭২ হাজারের বেশি এবং রতুয়ায় ৭১ হাজারের বেশি ভোটার যুক্ত হয়।

এই তথ্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, প্রাথমিকভাবে যাদের নাম বাদ পড়েছিল, তাদের একটি বড় অংশ পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়ে আবার ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন অথবা আপিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাম পুনর্বহাল হয়েছে। নির্বাচন কমিশন শুরু থেকেই বলে আসছিল, এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্য ছিল মৃত, স্থানান্তরিত, ডুপ্লিকেট বা অযোগ্য ভোটারদের বাদ দেওয়া, আর যোগ্য নাগরিকদের আইনগত প্রক্রিয়ায় পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পরবর্তী পরিসংখ্যান সেই অবস্থানকে অনেকাংশে সমর্থন করে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবিঃ সংগৃহীত

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি এসআইআর সত্যিই একপেশে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হতো, তাহলে সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়া আসনগুলোতে বিরোধীরা জয়ী হতো না এবং এত বড় সংখ্যায় নতুন ভোটার সংযোজনও দেখা যেত না। বরং তথ্য বলছে, পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল গতিশীল এবং ধারাবাহিক সংশোধনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে, যা ভোটের আগ পর্যন্ত চলেছে।

অন্যদিকে, যেসব আসনে নাম বাদ পড়ার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল, সেখানে বিজেপি ভালো ফল করেছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী সাবং, খেজুরি, ভগবানপুর, রায়পুর এবং কাতুলপুরে মাত্র ৮ হাজার থেকে ৯ হাজার ভোটার বাদ পড়েন এবং এই পাঁচটি আসনেই জয় পেয়েছে বিজেপি।

একইভাবে, যেখানে এসআইআর-পরবর্তী সময়ে নতুন ভোটার সংযোজন খুব কম হয়েছে, সেখানেও বিজেপির সাফল্য দেখা গেছে। কৃষ্ণনগর দক্ষিণ, গোসাবা, কৃষ্ণনগর উত্তর, রায়পুর এবং নারায়ণগড় আসনে নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছে মাত্র কয়েকশ থেকে প্রায় ১ হাজারের মধ্যে। এই আসনগুলোতেও বিজেপি জয়ী হয়েছে।

এই প্রবণতা নির্বাচন পরবর্তী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্থিতিশীল ভোটার তালিকা এবং কম পরিবর্তন থাকা অঞ্চলগুলোতে বিজেপির সাফল্য বেশি দেখা গেলেও, যেখানে বড় পরিসরে নাম বাদ পড়া এবং পরে পুনরায় সংযোজন হয়েছে, সেখানে তৃণমূল কংগ্রেস এবং কিছু ক্ষেত্রে কংগ্রেস তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে থেকেছে।

ভোটদানের হার নিয়েও কমিশনের তথ্য আগের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। কিছু আসনে অত্যন্ত উচ্চ ভোটদানের হার দেখা গেছে। ভাঙড়ে ভোট পড়েছে ৯৮ দশমিক ০৭ শতাংশ, ক্যানিং পূর্বে ৯৮ দশমিক ০২ শতাংশ এবং সিতাইচকে ৯৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ। মিনাখাঁ ও হারোয়াতেও ভোটদানের হার ৯৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে রেকর্ডভাঙা ভোট। ছবিঃ সংগৃহীত

এই উচ্চ ভোটার অংশগ্রহণ সেই দাবিকে দুর্বল করে দেয় যে বড় সংখ্যক ভোটার ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বরং দেখা যাচ্ছে, যেসব এলাকায় এসআইআর নিয়ে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক উত্তেজনা ছিল, সেখানেই ভোটার অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি।

নারী ভোটারদের অংশগ্রহণও ছিল অত্যন্ত উচ্চ। রঘুনাথগঞ্জে নারী ভোটদানের হার ছিল ৯৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। সিতাইচক, ভগবানগোলা, ক্যানিং পূর্ব এবং ভাঙড়েও ৯৭ শতাংশের বেশি নারী ভোট দিয়েছেন। এই অধিকাংশ আসনই তৃণমূল কংগ্রেস জিতেছে, যা নারী বা সংখ্যালঘু ভোটারদের ব্যাপকভাবে বঞ্চিত হওয়ার দাবিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

অন্যদিকে, দার্জিলিং, কালিম্পং এবং কার্শিয়াংয়ের মতো পাহাড়ি এলাকায় ভোটদানের হার তুলনামূলকভাবে কম ছিল, প্রায় ৮২ থেকে ৮৪ শতাংশের মধ্যে। এই তিনটি আসনই বিজেপির দখলে যায়।

ভোটের ফলাফলে খুব অল্প ব্যবধানের লড়াইও দেখা গেছে। রাজারহাট নিউ টাউন মাত্র ৩১৬ ভোটের ব্যবধানে বিজেপি জেতে। সাতগাছিয়ায় ব্যবধান ছিল ৪০১ ভোট। রায়না, জাঙ্গিপাড়া এবং ইন্দাসেও এক হাজার ভোটের কম ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়।

জয়ের পর শুভেন্দু অধিকারী। ছবিঃ সংগৃহীত

অন্যদিকে, কিছু আসনে বিপুল ব্যবধানে জয় এসেছে। মতিগাড়া-নকসালবাড়িতে বিজেপি এক লাখেরও বেশি ভোটে জয়ী হয়েছে। ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি এবং ইংলিশ বাজারেও বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে দলটি। তৃণমূল কংগ্রেসও ক্যানিং পূর্ব এবং মেটিয়াবুরুজে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, এসআইআর নিয়ে যে রাজনৈতিক বয়ান ভোটের আগে তৈরি হয়েছিল, বাস্তব ফল তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও ভিন্ন। তৃণমূল কংগ্রেস দাবি করেছিল এই প্রক্রিয়া তাদের ভোটব্যাংককে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলবে। কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফল দেখাচ্ছে, সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়া আসনগুলোতে যেমন বিপুল পরিমাণে নাম পুনরায় যুক্ত হয়েছে, তেমনি ভোটাররা শেষ পর্যন্ত সেই দলগুলোর পক্ষেই ভোট দিয়েছেন, যারা এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি আপত্তি তুলেছিল।

তবে বিতর্ক এখানেই শেষ হয়নি। বিরোধীরা এখনও প্রশ্ন তুলছে, যদি শেষ পর্যন্ত অনেক নাম পুনরায় যুক্তই করতে হয়, তাহলে এত বড় পরিসরে নাম বাদ দেওয়ার প্রয়োজন কী ছিল। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের যুক্তি, এটি একটি নিয়মিত ও প্রযুক্তিগত সংশোধন প্রক্রিয়া।

নির্বাচনী ফলাফল ও ভোটার অংশগ্রহণের পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দিচ্ছে, এসআইআর পশ্চিমবঙ্গে কোনো একমুখী রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটায়নি। বরং এটি একটি এমন প্রক্রিয়া হয়ে উঠেছে, যেখানে ভোটার তালিকা সংশোধন, রাজনৈতিক প্রচারণা এবং ভোটার অংশগ্রহণ একে অপরের সঙ্গে জটিলভাবে মিশে গেছে এবং এর ফলাফল অনেক ক্ষেত্রেই পূর্বাভাসের বাইরে গেছে।

সূত্রঃএনডিটিভি

এই শাখার আরও খবর

নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ১৪, আহত ৩২

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩২ জন। আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন…

পূজা দেখে ফেরার পথে ট্রলারডুবি, মেয়ে নিহত মা নিখোঁজ

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  পিরোজপুরে দুর্গাপূজা দেখে বাড়ি ফেরার পথে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ট্রলারডুবিতে প্রাণ গেছে আট বছরের শিশু অর্পিতা বেপারীর। এ ঘটনায় তার মা রিনা…

রেমিট্যান্স নেবে সরকার, প্রবাসীদের মরদেহের দায় কেন নেবে না?

সৌদি আরবে দুই চ নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিথি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা, প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে…

ছেলেকে নায়ক বানাতে বাড়ি-গাড়ি বন্ধক রেখেছিলেন হৃতিকের বাবা

হৃতিক রোশন এখন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা। তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে তার পরিবারের এই অবস্থানে আসার পথটি সহজ…

সিডনি ও পার্থে বিএইচএসএএ’র শারদীয় পূজা পরিক্রমা সম্পন্ন

শতদল তালুকদার, সিডনি, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ও পার্থে উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশি হিন্দু শিক্ষার্থীদের সংগঠন বিএইচএসএএ’র (BHSAA) শারদীয় দুর্গাপূজা পরিক্রমা। শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, পারস্পরিক সৌহার্দ্য…

মহানবমী আজ, কাল প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হবে দুর্গোৎসব

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমী আজ মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর)। দিনভর নানা ধর্মীয় আচার, পূজা-অর্চনা, অঞ্জলি ও প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে উদ্‌যাপিত…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au