বিপিএল ফিক্সিং কাণ্ডে সাময়িক নিষিদ্ধ ক্রিকেটারসহ ৫ জন। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৮ মে- বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) ২০২৫ আসরে ম্যাচ ফিক্সিং ও দুর্নীতির অভিযোগে অবশেষে কঠোর অবস্থানে গেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। দীর্ঘ তদন্ত শেষে একজন ক্রিকেটার, দুই টিম কর্মকর্তা ও এক ফ্র্যাঞ্চাইজি সহ-মালিকসহ মোট চারজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেছে বিসিবি। একই সঙ্গে আগের কয়েকটি বিপিএল আসরে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আরও একজনের বিরুদ্ধে বহিষ্কারাদেশ জারি করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিসিবি জানায়, বিপিএলের ১২তম আসরকে কেন্দ্র করে পরিচালিত তদন্তে জুয়া, ম্যাচ ফিক্সিং, তদন্তে অসহযোগিতা, তথ্য গোপন ও দুর্নীতি সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তদন্ত শেষে অভিযুক্তদের সাময়িকভাবে সব ধরনের ক্রিকেট কার্যক্রম থেকে স্থগিত করা হয়েছে।
বিসিবি জানিয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) দুর্নীতি দমন বিধিমালার বিভিন্ন ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের নোটিশ পাঠানো হয়েছে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য ১৪ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে তারা অভিযোগের জবাব দিতে পারবেন।
যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন ঘরোয়া ক্রিকেটার অমিত মজুমদার, টিম ম্যানেজার মো. লাবলুর রহমান, টিম ম্যানেজার রেজওয়ান কবির সিদ্দিকী এবং একটি ফ্র্যাঞ্চাইজির সহ-মালিক মো. তৌহিদুল হক তৌহিদ।
বিসিবির অভিযোগ অনুযায়ী, অমিত মজুমদারের বিরুদ্ধে ক্রিকেট ম্যাচের ফলাফল, অগ্রগতি বা অন্যান্য বিষয়ে বাজি ধরা বা বাজি গ্রহণের অভিযোগ আনা হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে টিম ম্যানেজার রেজওয়ান কবির সিদ্দিকীর বিরুদ্ধেও।
অন্যদিকে টিম ম্যানেজার লাবলুর রহমান ও ফ্র্যাঞ্চাইজি সহ-মালিক তৌহিদের বিরুদ্ধে তদন্তে সহযোগিতা না করা, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও যোগাযোগ গোপন করা, তদন্তকাজে বাধা সৃষ্টি এবং প্রমাণ নষ্ট করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিসিবির ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্ত চলাকালে দুর্নীতি দমন কর্মকর্তার (ড্যাকো) নোটিশ উপেক্ষা করা, মোবাইল ও যোগাযোগসংক্রান্ত তথ্য মুছে ফেলা এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি গোপনের মতো ঘটনাও সামনে এসেছে।
এদিকে বিপিএলের নবম, দশম ও একাদশ আসরে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সামিনুর রহমানের বিরুদ্ধে ‘বিসিবি এক্সক্লুডেড পারসন পলিসি’র আওতায় বহিষ্কারাদেশ জারি করা হয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, তিনি জুয়া সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম, খেলোয়াড় ও এজেন্টদের দুর্নীতির প্রস্তাব দেওয়া এবং দেশি-বিদেশি বেটিং সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যমে ম্যাচসংক্রান্ত দুর্নীতিতে ভূমিকা রেখেছেন।
বিসিবি জানিয়েছে, নোটিশ পাওয়ার পর সামিনুর রহমান আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার ত্যাগ করে বহিষ্কারাদেশ মেনে নিয়েছেন।
২০২৫ সালের বিপিএল চলাকালেই বিভিন্ন ম্যাচ ঘিরে অনিয়ম ও ফিক্সিংয়ের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিলে বিসিবির তৎকালীন সভাপতি ফারুক আহমেদ একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করেন।
দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে তদন্ত কমিটি প্রায় ৯০০ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে সেই প্রতিবেদন বিসিবির ইন্টিগ্রিটি ইউনিটের প্রধান অ্যালেক্স মার্শালের কাছে পাঠানো হয়। যাচাই-বাছাই শেষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে দুর্নীতির সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়।
ক্রিকেট অঙ্গনে তখন থেকেই আলোচনা ছিল, ফিক্সিং সন্দেহে কয়েকজন পরিচিত ক্রিকেটারকে ২০২৫ বিপিএলে খেলতে দেওয়া হয়নি। সর্বশেষ বিপিএলের নিলামে জাতীয় দলের বাইরে থাকা কয়েকজন পরিচিত ক্রিকেটার, যেমন এনামুল হক বিজয় ও মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতও জায়গা পাননি। যদিও বিসিবির চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
বিপিএলকে ঘিরে এমন দুর্নীতির অভিযোগ দেশের ক্রিকেটের ভাবমূর্তিতে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, ফিক্সিং ও বেটিং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।
বিসিবি জানিয়েছে, তদন্ত কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে এবং নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।