যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। ছবিঃ বিবিসি
মেলবোর্ন, ১৮ মে- যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে অস্থিরতা যেন এখন নতুন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। একের পর এক প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন, ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক সংকট এবং ভোটারদের ক্রমবর্ধমান হতাশা দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে একাধিক প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের ঘটনায় এখন প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাজ্যে কি স্থায়ীভাবে সরকার পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে পড়ছে?
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীদের জীবনীকার অ্যান্টনি সেলডন এই পরিবর্তনগুলো খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছেন। নব্বইয়ের দশকে তিনি যখন প্রধানমন্ত্রীদের জীবনী লেখা শুরু করেন, তখন পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। সে সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীরা দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকতেন। ফলে তাদের নীতি, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণের সুযোগ পাওয়া যেত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা এতটাই বেড়েছে যে ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে তাল মেলানোই কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন তিনি।
রক্ষণশীল সরকারের শেষ সময়ে মাত্র এক বছরের মধ্যেই তিনবার প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হয়। বরিস জনসনের বিদায়ের পর লিজ ট্রাস ক্ষমতায় এলেও মাত্র ৪৯ দিনের মাথায় তাকে সরে যেতে হয়। পরে দায়িত্ব নেন ঋষি সুনাক। কিন্তু ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় পেয়ে ক্ষমতায় আসা কিয়ার স্টারমারের সরকারও এখন চাপে পড়েছে।
নির্বাচনের সময় স্টারমার ও তার দল লেবার পার্টি দেশ পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তারা বলেছিল, দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল সরকার গড়ে তোলা হবে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার দুই বছরের মধ্যেই স্থানীয় নির্বাচনে ব্যাপক ধাক্কা খেয়েছে লেবার পার্টি। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচনে ভোটারদের বড় অংশ সরাসরি লেবার প্রার্থীদের প্রত্যাখ্যান করেছেন। এতে দলটির ভেতরেও স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে শুধু নেতৃত্বের দুর্বলতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত সমস্যাও বড় ভূমিকা রাখছে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পর যুক্তরাজ্য পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় দীর্ঘ সময় স্থবির ছিল। এরপর কোভিড মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও মানুষের আয়ে তেমন উন্নতি হয়নি।
এর পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বা ব্রেক্সিট দেশের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেয়। বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ব্রেক্সিটের কারণে দেশটির মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধিও দুর্বল হয়ে পড়েছে। সরকারি ঋণ বেড়েছে এবং শিল্প খাতে বিদ্যুতের ব্যয়ও এখন জি-সেভেনভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতার আরেকটি বড় কারণ হলো ব্রিটেনের প্রচলিত নির্বাচনব্যবস্থার পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা। দেশটির ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ পদ্ধতি মূলত দুই দলের আধিপত্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। দীর্ঘদিন ধরে লেবার ও কনজারভেটিভ পার্টিই ছিল মূল শক্তি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে।
বর্তমানে ইংল্যান্ডে রাজনীতি পাঁচমুখী প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসে আরও বেশি দল সক্রিয়। লিবারেল ডেমোক্র্যাটস, গ্রিন পার্টি, কট্টর ডানপন্থী রিফর্ম ইউকে এবং আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদী দলগুলো এখন বড় শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। ফলে বড় দুই দলের ভোটভিত্তি ভেঙে যাচ্ছে।
স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের স্বাধীনতাপন্থী দলগুলোর উত্থানও যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দীর্ঘমেয়াদে এটি যুক্তরাজ্যের ঐক্যের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অ্যান্টনি সেলডনের মতে, বর্তমান সংকটের জন্য শুধু কাঠামোগত সমস্যা দায়ী নয়; সাম্প্রতিক প্রধানমন্ত্রীরাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছেন। তিনি মনে করেন, ব্রিটেন শাসন-অযোগ্য দেশ নয়, তবে সাম্প্রতিক নেতাদের ব্যর্থতা দেশটিকে সেই অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
বরিস জনসন সম্পর্কে সেলডনের মূল্যায়ন, তিনি বড় স্বপ্ন দেখতেন, কিন্তু বাস্তবায়নে ব্যর্থ হন। অন্যদিকে লিজ ট্রাসের মুক্তবাজারমুখী নীতি ব্রিটেনের আর্থিক বাজারকে প্রায় ধসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। তহবিলবিহীন কর কমানোর পরিকল্পনার কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাকে দ্রুত বিদায় নিতে হয়।
ঋষি সুনাকের ক্ষেত্রে সেলডন মনে করেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই জনগণ রক্ষণশীলদের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল। ফলে তার জয়ের সুযোগ খুব কম ছিল।
কিয়ার স্টারমার সম্পর্কে বিশ্লেষকদের মত, তিনি ব্যক্তিগতভাবে সৎ ও পরিশ্রমী হলেও জনগণের কাছে নিজের রাজনৈতিক দর্শন পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে পারেননি। তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তার অভাবকে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বেন আনসেলের মতে, স্টারমার জনগণকে বোঝাতে পারেননি যে তিনি ঠিক কীভাবে দেশের সংকট সমাধান করবেন। তিনি পরিবর্তনের কথা বললেও সেই পরিবর্তনের রূপরেখা স্পষ্ট নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক রাজনীতিতে শুধু নীতি নয়, জনগণের সামনে সেটি আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করাও গুরুত্বপূর্ণ। ডেভিড ক্যামেরন কঠোর ব্যয় সংকোচনের নীতিকে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক গল্প হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছিলেন। কিন্তু স্টারমারের সেই সক্ষমতা এখনো দেখা যায়নি।
লেবার পার্টির ভেতরে এখন বিকল্প নেতৃত্ব নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের নজর গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যামের দিকে। ব্যবসাবান্ধব সমাজতন্ত্র এবং জনসেবামুখী নীতির কারণে তিনি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। তবে জাতীয় রাজনীতিতে উঠে এসে স্টারমারকে চ্যালেঞ্জ জানানো তার জন্য সহজ হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি লেবার পার্টি নিজেদের অবস্থান দ্রুত শক্ত করতে না পারে, তাহলে রিফর্ম ইউকের মতো দল আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। এতে ব্রিটিশ রাজনীতিতে অস্থিরতা আরও বাড়বে।
এখন যুক্তরাজ্যের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, দেশটি কি আবার স্থিতিশীল রাজনৈতিক নেতৃত্ব ফিরে পাবে, নাকি ঘন ঘন সরকার পরিবর্তনের এই ধারা আরও দীর্ঘ হবে।
সূত্রঃ সিএনএন