ক্যানসার চিকিৎসায় হল ভারতে চালু ‘টিসেন্ট্রিক’ ইনজেকশন। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৮ মে- ভারতে ফুসফুসের ক্যানসারের চিকিৎসায় নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। দেশটিতে প্রথমবারের মতো মাত্র সাত মিনিটে প্রয়োগযোগ্য বিশেষ ধরনের ক্যানসার ইনজেকশন চালু করেছে বহুজাতিক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রোশ ফার্মা ইন্ডিয়া। ‘টিসেন্ট্রিক’ নামে এই নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি মূলত নন-স্মল সেল লাং ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের জন্য তৈরি করা হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রচলিত ইমিউনোথেরাপি চিকিৎসায় রোগীদের দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থেকে শিরায় স্যালাইনের মাধ্যমে ওষুধ গ্রহণ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিটি সেশন শেষ হতে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। তবে নতুন এই পদ্ধতিতে ওষুধটি সরাসরি ত্বকের নিচে ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সময় লাগে মাত্র সাত মিনিট। ফলে রোগীদের দীর্ঘ সময় হাসপাতালে অবস্থান করতে হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, এই প্রযুক্তি ক্যানসার চিকিৎসাকে আরও সহজ ও রোগীবান্ধব করে তুলতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক রোগী, দুর্বল শারীরিক অবস্থার রোগী এবং দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষ এতে বেশি সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোর ওপরও চাপ কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই চিকিৎসায় ব্যবহৃত মূল ওষুধটির নাম অ্যাটেজোলিজুম্যাব। এটি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। সাধারণত ক্যানসার কোষ শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে ‘পিডি-এল১’ নামের একটি প্রোটিন ব্যবহার করে নিজেদের আড়াল করে রাখে। অ্যাটেজোলিজুম্যাব সেই প্রোটিনকে ব্লক করে দেয়। ফলে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ক্যানসার কোষ শনাক্ত করতে পারে এবং সেগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করে।
চিকিৎসকদের মতে, যেসব রোগীর শরীরে পিডি-এল১ প্রোটিনের মাত্রা বেশি থাকে, তারা এই চিকিৎসা থেকে বেশি উপকার পেতে পারেন। ধারণা করা হচ্ছে, নন-স্মল সেল লাং ক্যানসারে আক্রান্ত প্রায় অর্ধেক রোগী এই চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত হতে পারেন।
তবে নতুন এই চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে আশাবাদের পাশাপাশি উদ্বেগও রয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে এর উচ্চ ব্যয়। প্রতি ডোজ ইনজেকশনের দাম ধরা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার ভারতীয় রুপি। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ টাকার বেশি। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, রোগীর অবস্থা অনুযায়ী অনেক ক্ষেত্রে ছয়টি পর্যন্ত ডোজ প্রয়োজন হতে পারে। ফলে পুরো চিকিৎসা ব্যয় কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
ব্যয় কমাতে রোশ ফার্মা ইন্ডিয়া ‘ব্লু ট্রি’ নামে একটি সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছে। এর মাধ্যমে কিছু রোগী আর্থিক সহায়তা পাবেন। পাশাপাশি ওষুধটি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে সরকারি সুবিধাভোগীরাও চিকিৎসা সহায়তা নিতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যয়বহুল হলেও এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের ক্যানসার চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ এতে হাসপাতালে থাকার সময় কমে যাবে, রোগীদের শারীরিক ভোগান্তি হ্রাস পাবে এবং তুলনামূলক কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে। চিকিৎসা বিশ্লেষকদের ভাষ্য, আধুনিক ক্যানসার চিকিৎসাকে আরও সহজ ও কার্যকর করতে এই ধরনের দ্রুত প্রয়োগযোগ্য ইমিউনোথেরাপি ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।