বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে হত্যার কূটকৌশল ও প্রাসঙ্গিক কিছু আখ্যান

মতামত- সরদার সেলিম রেজা 

  • 3:07 pm - May 26, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩২৬ বার
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: ফাইল

মেলবোর্ন, ২৬ মে- বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একটি কালো দিবস হয়ে থাকবে। শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, এদিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য এক সুপরিকল্পিত, বহুস্তরীয় ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত পর্যায় কার্যকর করার চেষ্টা হয়েছিল। বিভিন্ন সূত্রের মাধ্যমে যে তথ্য বেরিয়ে এসেছে, তা শুনলে যে কোনো দেশপ্রেমিক মানুষ হতবাক হয়ে যাবেন।

এই ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রে ছিল জামায়াত-শিবির, হেফাজত, হিযবুত তাহরীর ও বিএনপির একটি চরমপন্থী চক্র। তাদের লক্ষ্য ছিল একটাই—শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা নয়, সরাসরি হত্যা করা। এবং শুধু হত্যা নয়, তাকে টুকরো টুকরো করে গণভবনেই মাটিচাপা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। আরেকটি নৃশংস পরিকল্পনা ছিল—তাকে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়ে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগতভাবে মানহানি করা।

৫ আগস্ট গণভবনে জঙ্গি হামলার দিন স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের সদস্যরা ভল্টে ৩২টি অত্যাধুনিক অস্ত্র জমা রেখে স্থান ত্যাগ করেন। পরে অভ্যুত্থানকারীরা গণভবনে ঢুকে অ্যাসল্ট রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল, এসএমজি টি-৫৬-সহ সব অস্ত্র লুট করে নিয়ে যায়। এসএসএফের তৎপরতায় সেদিন অধ্যাপক আসিফ নজরুলের ভাড়া করা স্নাইপার গুলি চালাতে পারেনি। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় দেড় হাজার আগ্নেয়াস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি। বিভিন্ন কারাগার ভেঙে পালিয়ে যাওয়া ৭৮ জন জঙ্গিসহ ৭০-এর বেশি বন্দিও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। তাদের মধ্যে ৮০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী।

হত্যার পাঁচ স্তরের পরিকল্পনা

তথ্য বলছে, শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য পাঁচটি বিকল্প পরিকল্পনা সাজানো হয়েছিল:

১. গণভবনে সরাসরি হত্যা: গণভবনে ঢুকে তাকে টুকরো টুকরো করে মাটিচাপা দেওয়া।

২. মানহানিকর হত্যা: মেরে বিবস্ত্র করে ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া।

৩. গাদ্দাফি স্টাইল: ভারতের দ্রুত সহায়তা না পেলে গাদ্দাফির মতো নির্মমভাবে হত্যা।

৪. সাদ্দাম স্টাইল: প্রথমে আইনের কাস্টডিতে নিয়ে বিচারের নামে ফাঁসি কার্যকর করা।

৫. আকাশপথে হত্যা: সেনাবাহিনী ও জামায়াতের পরামর্শ ছিল, যদি উপরের সব ব্যর্থ হয়, তবে ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের কাছে আমেরিকা যাওয়ার পথে পাকিস্তানের আকাশসীমায় পাক বিমান বাহিনীর মাধ্যমে বিমান ভূপাতিত করা।

এই পরিকল্পনাগুলো শুনলে বোঝা যায়, এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক অভ্যুত্থান ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্রীয় হত্যার একটি ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’—সুনির্দিষ্ট, ধাপে ধাপে সাজানো, আন্তর্জাতিক যোগাযোগসম্পন্ন।

গোয়েন্দা ব্যর্থতা এবং অলৌকিক রক্ষা

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এত বড় ষড়যন্ত্রের তথ্য আগাম প্রধানমন্ত্রীকে দিতে ব্যর্থ হলো কেন? ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মতো ২০২৪ সালের ৫ আগস্টেও একই চক্র মরিয়া হয়ে উঠেছিল। ৫০ বছরের ব্যবধানে পিতার মতো কন্যাকেও হত্যার চেষ্টা হলো।

কথায় আছে, “রাখে আল্লাহ মারে কে।” মহান আল্লাহর মেহেরবানীতে এবারও অলৌকিকভাবে বেঁচে যান শেখ হাসিনা। জানা যায়, এটি ছিল তার ওপর ২৪তম হত্যাচেষ্টা। যদি ভারত দ্রুত সময়ের মধ্যে সহায়তা না করত, তবে আমরা জাতির পিতার কন্যাকে জীবিত পেতাম না। ভারত যে আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু রাষ্ট্র, তা আবারও প্রমাণিত হলো।

রাওয়া ক্লাব: পাকিস্তানি জঙ্গিদের তথ্যকেন্দ্র?

আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজধানীর মহাখালীর রাওয়া ক্লাব নাকি পাকিস্তানের সাবেক জুনিয়র ও সিনিয়র সেনা কর্মকর্তাদের তথ্য বিনিময় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সেখানে পাকিস্তানি জঙ্গিদের সঙ্গে বৈঠক, পরিকল্পনা—সবই চলছে। বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাজ তাহলে কী? এই অপতৎপরতা বন্ধ হবে কবে?

পাকিস্তানের অবস্থা নিজেই শোচনীয়। তাদের ভান্ডারে খাদ্য নেই, মানুষ দু’বেলা না খেয়ে থাকে। অথচ কিছুদিন আগেই জাহাজভর্তি কনটেইনার কী এসেছে বাংলাদেশে? জনগণ জানতে চায়। এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তানের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্কের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। পরাজিত পাকিস্তানের দোসররা আবারও সক্রিয় হয়ে বাংলাদেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বিচারের নামে প্রতিশোধের রাজনীতি

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর মো. তাজুল ইসলাম বলছেন, গত জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশে গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। তিনি বলেন, যারা অপরাধ করেছে তাদের সবার বিচার হবে। শেখ হাসিনাকে ভারতের কাছে চাওয়া হবে, বিচারের মুখোমুখি করা হবে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট—যারা নিজেরা অস্ত্র লুট করেছে, জঙ্গি ছেড়ে দিয়েছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে, তারাই এখন বিচারকের ভূমিকায়। এটি বিচার নয়, এটি রাজনৈতিক প্রতিশোধ। বঙ্গবন্ধু পরিবার ও বাংলাদেশের মানুষ বারবার ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছে।

সর্বনাশের হিসাব

ইউনুস শাহীর ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’-এর ফলাফল কী দাঁড়াল?

– রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ভেঙে পড়েছে। হাজার হাজার অস্ত্র, শত শত জঙ্গি এখনও বাইরে।

– গোয়েন্দা ব্যবস্থা অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

– পাকিস্তানি চক্রের প্রভাব বেড়েছে।

– মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ইতিহাস, জাতির পিতার পরিবার—সবকিছু আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।

– অর্থনীতি, আইন-শৃঙ্খলা, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি—সবখানে ধস নেমেছে।

এটি শুধু শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আক্রমণ ছিল না। এটি ছিল ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার বিরুদ্ধে আক্রমণ।

ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব কি?

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সত্যি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়? পারবে, যদি আমরা ইতিহাস ভুলে না যাই। যদি ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ খুলে দিই। যদি জনগণ সত্য জানতে পারে এবং ঐক্যবদ্ধ হয়।

ইতিহাস সাক্ষী, ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেও বাংলাদেশকে থামানো যায়নি। ২০২৪-এ তার কন্যাকে হত্যার চেষ্টা করেও পারা যাবে না। কারণ এই মাটি, এই মানুষ, এই চেতনা—সবই বঙ্গবন্ধুর রক্তে লেখা।

আজ সময় এসেছে সত্য বলার, সত্য লেখার। যারা দেশকে ধ্বংস করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর। নইলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।

সরদার সেলিম রেজা। ছবিঃ সংগৃহীত

লেখক- সরদার সেলিম রেজা; কবি, সভাপতি: বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র 

এই শাখার আরও খবর

রেমিট্যান্স নেবে সরকার, প্রবাসীদের মরদেহের দায় কেন নেবে না?

সৌদি আরবে দুই চ নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিথি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা, প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে…

ছেলেকে নায়ক বানাতে বাড়ি-গাড়ি বন্ধক রেখেছিলেন হৃতিকের বাবা

হৃতিক রোশন এখন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা। তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে তার পরিবারের এই অবস্থানে আসার পথটি সহজ…

সিডনি ও পার্থে বিএইচএসএএ’র শারদীয় পূজা পরিক্রমা সম্পন্ন

শতদল তালুকদার, সিডনি, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ও পার্থে উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশি হিন্দু শিক্ষার্থীদের সংগঠন বিএইচএসএএ’র (BHSAA) শারদীয় দুর্গাপূজা পরিক্রমা। শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, পারস্পরিক সৌহার্দ্য…

মহানবমী আজ, কাল প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হবে দুর্গোৎসব

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমী আজ মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর)। দিনভর নানা ধর্মীয় আচার, পূজা-অর্চনা, অঞ্জলি ও প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে উদ্‌যাপিত…

নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে ঝরল ১০ প্রাণ, আহত আরও ২০

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: নাটোরের বড়াইগ্রামে ভোরের আলো ফোটার আগেই সড়কে ঝরল ১০ প্রাণ। যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০ জন।…

‘আমি ভয় পাই না’, ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা আবারও বললেন শেখ হাসিনা

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথা আবারও জানিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার, নির্যাতন কিংবা হত্যার শিকার হতে পারেন বলে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au