মেলবোর্ন, ১৮ জুন- ২০২৬ সালের মধ্যভাগে এসে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে এক নজিরবিহীন ও অত্যন্ত জটিল নিরাপত্তা এবং মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক একতরফা ও জোরপূর্বক বাংলাভাষী মানুষকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দেওয়ার (পুশ-ইন) ধারাবাহিক চেষ্টা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তীব্র টানাপোড়েন তৈরি করেছে। নো-ম্যানস ল্যান্ডের খোলা আকাশের নিচে, তীব্র রোদ, ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের অবরুদ্ধ থাকার দৃশ্য সমগ্র দেশবাসীকে আলোড়িত করেছে। একদিকে যেমন বিজিবির কঠোর প্রতিরোধ ও স্থানীয় সীমান্তবাসীর অতন্দ্র পাহারা এই আগ্রাসনকে রুখে দিচ্ছে, অন্যদিকে ঢাকার কূটনৈতিক অলিন্দ থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত এই সংকট সমাধানের পথ খোঁজার জোর তৎপরতা চলছে।
আসলে কি ঘটছে বাংলাদেশের সীমান্তে? এই সংকটের উৎসই বা কোথায় এবং এর স্থায়ী সমাধানই বা কি?
সংকটের রাজনৈতিক নেপথ্য
এই সংকটের মূল ভিত্তিটি তৈরি হয়েছে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিপথ এবং বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বিজয়ী হওয়ার পর রাজ্যটির রাজনৈতিক ও সীমান্ত নীতিতে এক আমূল পরিবর্তন আসে। নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই অত্যন্ত বিতর্কিত ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ (চিহ্নিত করো, বাদ দাও এবং বিতাড়িত করো) নীতি ঘোষণা করেন।

এসআইআর প্রক্রিয়ায় বাদ পড়েছে ৯১ লাখ ভোটার । ছবিঃ সংগৃহীত
এই নীতির প্রকাশ্য লক্ষ্য ছিল—তথাকথিত অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা, তাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব ও ভোটার তালিকা থেকে নাম বাতিল করা এবং কোনো প্রকার আনুষ্ঠানিক বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই সীমান্ত দিয়ে সরাসরি বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দাবি অনুযায়ী, এই জবরদস্তিমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে ইতিমধ্যে প্রায় ৫,০০০ মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ফেরত যেতে বাধ্য করা হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই বিতাড়ন প্রক্রিয়ার পদ্ধতিটি ছিল অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ, একপেশে এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতি চরম বিদ্বেষপূর্ণ। বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক পূর্বে ভারতের নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে ভোটার তালিকা সংশোধনের একটি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। এর ফলশ্রুতিতে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৯০ লক্ষ (৯ মিলিয়ন) বাংলাভাষী মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার এই ঘটনাটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বিএসএফ ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। তারা এই মানুষদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে সাব্যস্ত করে গ্রেফতার ও হয়রানি শুরু করে।
ভারতের সুশীল সমাজের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত এলাকায় স্থাপিত হোল্ডিং সেন্টার বা ডিটেনশন ক্যাম্পগুলোতে বর্তমানে প্রায় ৪০০ জন বন্দি রয়েছেন, যাদের বড় অংশই এই ত্রুটিপূর্ণ ভোটার তালিকা সংশোধনীর কারণে হঠাৎ করেই নিজেদের নাগরিকত্বের প্রমাণ হারিয়ে আটক হয়েছেন। এই পুরো প্রক্রিয়াটি ২০১৯ সালে ভারতের আসাম রাজ্যে পরিচালিত বিতর্কিত জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) প্রক্রিয়ার অবিকল রূপ, যার কারণে ১৯ লক্ষাধিক মানুষ রাষ্ট্রহীনতার ঝুঁকিতে পড়েছিল এবং যেখানে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাও বিভিন্ন সময় বাংলাভাষী মুসলমানদের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।

বিজিবি-বিএসএফ বৈঠকে ‘পুশ ইন’ ইস্যু আলোচনা করতে চায় না ভারত। ছবিঃ সংগৃহীত
পুশ-ইনের ধারাবাহিক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
এই সংকটটি হঠাৎ করে ২০২৬ সালের জুন মাসে তৈরি হয়নি, বরং এর পেছনে রয়েছে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ভারতের সুপরিকল্পিত তৎপরতা। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদর দপ্তরের সংগৃহীত পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ৮ মাসে বিএসএফ কর্তৃক ২,৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ২,৪৭৯ জনের মধ্যে ১২০ জন সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। ২০২৬ সালের মে মাস থেকে এই তৎপরতা আরও তীব্র আকার ধারণ করে এবং জুন মাসে তা এক চরম সংকটে রূপ নেয়।
বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে এই সংকটের রাজনৈতিক চরিত্রটি উন্মোচন করে বলেন: “পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনগুলোতে ‘পুশ-ইন’ একটি অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু ছিল। এটি সম্পূর্ণভাবে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণের ফল, যা এখন আন্তর্জাতিক সীমান্তে একটি বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি করছে।”
এই সংকটের তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পায় যখন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সীমান্তসংলগ্ন জেলাগুলোসহ দেশের প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চল ও মহানগরীতে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন পর্যালোচনা করার জন্য বিচারপতি প্রকাশ প্রভাকর নাওলেকরকে প্রধান করে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কমিটি গঠন করে। এই কমিটির তদন্তের পরিধিতে শুধু সীমান্ত অঞ্চলই ছিল না, বরং দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, নয়ডা, গুরুগ্রাম, আহমেদাবাদ এবং পুনের মতো বৃহৎ অর্থনৈতিক ও শিল্প কেন্দ্রগুলোও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কমিটিকে এসব অঞ্চলে আইনি ও অবৈধ অভিবাসনের ধরন বিশদভাবে বিশ্লেষণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। মূলত ভারতীয় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সংবেদনশীল অঞ্চলে অবৈধ অনুপ্রবেশ, জাল পরিচয়পত্র তৈরি, ভোটার তালিকায় অননুমোদিত ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্তি এবং অবৈধ বসতি স্থাপনের বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করার পরেই এই জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়, যা সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় ভারতের নীতি কঠোর করার সুদূরপ্রসারী বহিঃপ্রকাশ।

এক দিনে সীমান্তের ১১ পয়েন্টে ১২৯ জনকে পুশইনের চেষ্টা। ছবিঃ সংগৃহীত
সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবি
ভারতের এই একতরফা, পুশ-ইন তৎপরতা মোকাবিলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সীমান্তজুড়ে অভূতপূর্ব ও কঠোর প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ভারতের সাথে সংযুক্ত বাংলাদেশের ৪,১৫৬ কিলোমিটার সীমান্তের বিভিন্ন অংশে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মিজোরাম এবং আসামের সাথে সংযুক্ত সীমান্ত জেলাগুলোর মধ্যে ২৬টি জেলাকে পুশ-ইনের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত জেলাসমূহঃ
| বিভাগ ও অঞ্চল |
চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত জেলাসমূহ |
| উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল |
লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নীলফামারী, পঞ্চগড় |
| দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল |
চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, যশোর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ |
| পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল |
ফেনী, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, খাগড়াছড়ি, কুমিল্লা, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া |
এই ২৬টি বিশেষ গুরুত্বসম্পন্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় পুশ-ইন ঠেকাতে বিজিবি চার শিফটে বিভক্ত হয়ে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা সার্বক্ষণিক টহল ও কড়া নজরদারি চালু করে। সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবি কেবল নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তির ওপর নির্ভর করেনি, বরং স্থানীয় জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে।
সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে রাতে গ্রামবাসীরা লাঠিসোঁটা ও টর্চলাইট নিয়ে বিজিবির সাথে যৌথ পাহারা বা ‘জনতার প্রতিরোধ’ গড়ে তুলেছে। উদাহরণস্বরূপ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্ত গ্রামগুলোতে সন্ধ্যার পর মসজিদের মাইক এবং লাউডস্পিকারে ঘোষণা দিয়ে গ্রামবাসীদের সতর্ক করা হতো, যাতে তারা অপরিচিত কাউকেই গ্রামে আশ্রয় না দেয় এবং সীমান্তে যেকোনো সন্দেহজনক নড়াচড়া দেখলেই তাৎক্ষণিকভাবে বিজিবিকে অবহিত করে।
বিজিবির প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে তাদের এই কঠোর অবস্থানের কারণে বিএসএফের অন্তত ২১টি বড় ধরনের পুশ-ইন প্রচেষ্টা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় দুই শতাধিক মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। ৩ জুনের পর থেকে বাংলাদেশের কোনো সীমান্তেই কোনো পুশ-ইন সফল হতে দেয়নি বিজিবি। এর আগে ঝিনাইদহ জেলার দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে বিএসএফ একটি সীমান্ত গেট খুলে প্রিজন ভ্যানে করে ৩০ থেকে ৩৫ জন মানুষকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু বিজিবির অনড় অবস্থানের কারণে বিএসএফের সেই প্রিজন ভ্যানটি শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়।
জুন ২০২৬: বিভিন্ন সীমান্তে সংঘটিত পুশ-ইন প্রচেষ্টার তুলনামূলক চিত্র
২০২৬ সালের জুন মাসে বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতের পুশ-ইন প্রচেষ্টার প্রকৃতি, ব্যাপ্তি এবং বিজিবির প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার একটি সামগ্রিক তুলনামূলক চিত্র নিচের সারণিতে উপস্থাপন করা হলো:
| তারিখ (জুন ২০২৬) |
সীমান্তবর্তী জেলা ও নির্দিষ্ট স্থান |
পুশ-ইনের শিকার মানুষের সংখ্যা ও পরিচয় |
শূন্যরেখায় অবরুদ্ধ থাকার সময়কাল |
ঘটনাপ্রবাহ ও চূড়ান্ত ফলাফল |
| ৫ জুন |
পঞ্চগড় সদর সীমান্ত (বড়বাড়ী-প্রধানপাড়া) |
১০ জন (তন্মধ্যে শিশু ও নারী অন্তর্ভুক্ত) |
৭৫ ঘণ্টা |
বিজিবির তীব্র প্রতিরোধে জিরো লাইনে আটকা থাকার পর বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নেয়। |
| ৬ জুন |
মেহেরপুর (তেঁতুলবাড়ীয়া সীমান্ত) |
৬ জন (২টি বাঙালি মুসলিম পরিবার) |
১ রাত |
খোলা আকাশের নিচে কাটানোর পর বিজিবির বাধার মুখে বিএসএফ ফেরত নিতে বাধ্য হয়। |
| ৮ জুন |
ঠাকুরগাঁও (হরিপুর, মশালগাঁও সীমান্ত) |
১১ জন (গর্ভবতী নারী ও শিশুসহ) |
প্রায় ৪৮ ঘণ্টা |
বিজিবি ও বিএসএফের কড়া অবস্থানের পর অবশেষে বিএসএফ নিজ ভূখণ্ডে নিয়ে যায়। |
| ১২ জুন |
কুষ্টিয়া (দৌলতপুর, প্রাগপুর সীমান্ত) |
১২ জন (৪টি শিশু ও নারীসহ) |
৭৮ ঘণ্টা |
পাটখেতের আলে অবরুদ্ধ থাকার পর ফ্ল্যাগ (flag) বৈঠকের মাধ্যমে বিএসএফ ফেরত নেয়। |
| ১৪ জুন |
চুয়াডাঙ্গা (দর্শনা-জয়নগর সীমান্ত) |
১১ জন (বাংলাভাষী নারী ও পুরুষ) |
তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ |
বিজিবি ও গ্রামবাসীদের প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ অন্যত্র সরিয়ে নেয়। |
| ১৪ জুন |
কুড়িগ্রাম (রৌমারী, গয়টাপাড়া সীমান্ত) |
৬ জন (ময়মনসিংহের ভালুকার বাসিন্দা) |
৩ দিন |
জিরো লাইনে চরম মানবিক সংকটের মুখোমুখি, বিজিবি পাহারায় রয়েছে। |
| ১৪ জুন |
কুড়িগ্রাম (রৌমারী, মানকারচর সীমান্ত) |
৩ জন (সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহের বাসিন্দা) |
৭২ ঘণ্টার বেশি |
বিজিবির বাধার কারণে জিরো লাইনে আটকে থাকেন, পতাকা বৈঠকও ব্যর্থ হয়। |
| ১৪ জুন |
জয়পুরহাট (পাঁচবিবি, হাটখোলা সীমান্ত) |
১ জন (বৃদ্ধ ভারতীয় নাগরিক) |
অনূর্ধ্ব ২৪ ঘণ্টা |
৫ জনের মধ্যে ৪ জন ফিরলেও ১ জন আটকে যান; পরে বিএসএফ ফেরত নেয়। |
নো-ম্যানস ল্যান্ডে মানবিক বিপর্যয়
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তঃ গত ১২ জুন শুক্রবার ভোর আনুমানিক ৫টার দিকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর সীমান্তের ১৪৮/৩-এস আন্তর্জাতিক পিলারের সন্নিকটে এক দীর্ঘস্থায়ী ও বেদনাবিধুর মানবিক সংকটের সূচনা হয়। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কোনো প্রকার পূর্ব ঘোষণা বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ৪টি শিশুসহ মোট ১২ জন বাংলাভাষী মানুষকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পুশ-ইনের চেষ্টা চালায়। প্রাগপুর বিওপির সুবেদার আসাদ হোসেনের নেতৃত্বে বিজিবির টহল দল এবং স্থানীয় নদী তীরবর্তী বাসিন্দারা তাৎক্ষণিকভাবে এই অনুপ্রবেশ প্রতিহত করেন। এর ফলে ওই অসহায় ১২ জন মানুষ সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডের একটি পাটখেতের আলে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
দীর্ঘ ৭৮ ঘণ্টা তারা সেখানে তীব্র গরম, মশা এবং ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশের নিচে কাটাতে বাধ্য হন। খাদ্য ও পানীয় জলের তীব্র সংকটে একপর্যায়ে অবরুদ্ধ ব্যক্তিরা চরম অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্থানীয় এক বাসিন্দার ধারণকৃত একটি ৫৫ সেকেন্ডের ভিডিও ক্লিপে ৫০ বছর বয়সী এক প্রবীণ ব্যক্তিকে আকুল হয়ে বলতে শোনা যায়, “আপনাদের কাছে অনুরোধ, আমাদের একটা সুব্যবস্থা করেন। আমাদের জীবনডা একটু বাঁচান।”
প্রথম দিকে বিএসএফ দাবি করেছিল যে এই ব্যক্তিরা ভারতীয় নাগরিক নন এবং তাদের পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের ফেরত নেওয়া সম্ভব নয়। তবে বিজিবি তাদের অনুপ্রবেশ করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে। অবশেষে ১৫ জুন সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় জিরো লাইনে কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবির উপ-অধিনায়ক নুরুল হুদার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল এবং পশ্চিমবঙ্গের রানীনগর বিএসএফের কোম্পানি কমান্ডার এসি সুনীল কুমার যাদবের মধ্যে একটি চূড়ান্ত পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে বেলা ১১টার দিকে বিএসএফ ওই ১২ জনকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের ভূখণ্ডের ভেতরে কাঁটাতারের ওপারে ফিরিয়ে নিয়ে গেলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। এর বাইরে ১৪ জুন ভোরে একই উপজেলার চিলমারী ইউনিয়নের চর চল্লিশপাড়া সীমান্ত দিয়ে ৮৫/১৩-এস পিলারের কাছ থেকে আরও একজনকে পুশ-ইনের চেষ্টা করা হলে বিজিবি তা সফলভাবে রুখে দেয়।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশইনের চেষ্টা করা ১২ জনকে আটকে দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ছবি: সংগৃহীত
কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তঃ কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার শৌলমারী ইউনিয়নের গয়টাপাড়া ও মানকারচর সীমান্ত দিয়ে ১৪ জুন ভোর ৫টার দিকে ৯ জন মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বিজিবি সদস্যদের এবং স্থানীয় জনগণের সতর্ক পাহারার মুখে বিএসএফ তাদের জিরো লাইনে ফেলে রেখে নিজেদের অবস্থানে চলে যায়। এই ৯ জনের পরিচয় বিশ্লেষণ করে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর সত্য উদঘাটিত হয়—তারা আসলে অবৈধ ভারতীয় নাগরিক নন, বরং বিভিন্ন সময় ভাগ্য অন্বেষণে দালালের মাধ্যমে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করা মূল বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। ভারত কর্তৃপক্ষ তাদের কোনো আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ না দিয়ে সরাসরি সীমান্তে এনে পুশ-ইন করে।
গয়টাপাড়া সীমান্তে আটকে থাকা ৬ জন একই পরিবারের সদস্য ও আত্মীয় ছিলেন, যাদের আদি বাড়ি ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বংশেরকুল গ্রামে। এই দুর্ভাগা মানুষগুলো হলেন: বিল্লাল হোসেন (পিতা: আবদুর রউফ), সুমি আক্তার (বিল্লাল হোসেনের স্ত্রী), ফাতেমা খাতুন (৪ বছরের শিশু কন্যা), ফাহিমা খাতুন (৫ মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশু কন্যা), সাব্বির হোসেন (লিটন মিয়ার ছেলে), হিমেল (মৃত শামসুল হকের ছেলে)।

শিশু সন্তান নিয়ে শূন্যরেখায় তিন দিন ধরে দম্পতি। ছবিঃ সংগৃহীত
অন্যদিকে, মানকারচর সীমান্তে আটকে পড়া অপর ৩ জন তরুণ হলেন সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুরের জহিরুল ইসলাম (২৬), নেত্রকোনার বারহাট্টার পারভেজ (২১) এবং ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের নাঈম (২২)। শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সোনা মিয়ার তথ্যমতে, এই মানুষগুলো খোলা আকাশের নিচে ৩ দিন ধরে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছিলেন। ঝড়-বৃষ্টির হাত থেকে শিশুদের বাঁচাতে স্থানীয় গ্রামবাসীরা মানবিক কারণে তাদের শুকনো খাবার ও পানি সরবরাহ করেছিলেন। একাধিক পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কঠোর ও অনড় অবস্থানের কারণে তাদের এই দুঃখজনক অপেক্ষার অবসান দ্রুত ঘটেনি।
পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও সীমান্তঃ পঞ্চগড় সদর সীমান্তের বড়বাড়ী ও প্রধানপাড়া গ্রামের মধ্যবর্তী জিরো লাইনে ৫ জুন এক শ্বাসরুদ্ধকর ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যখন বিএসএফ ১০ জন বাংলাভাষী মুসলমানকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশ-ইনের চেষ্টা করে। বিজিবির বাধার মুখে তারা টানা ৭৫ ঘণ্টা শূন্যরেখার একটি বাঁধের ওপর তীব্র বজ্রপাত ও ভারী বৃষ্টির মধ্যে আটকা পড়ে থাকেন। স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল হোসেনের বর্ণনানুযায়ী, সীমান্তে ভারী বিজিবি ও বিএসএফ মোতায়েনের ফলে সেখানে এক তীব্র উত্তেজনা ও অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল।
এই দলেই ছিল ভারতের শিলিগুড়ির বাসিন্দা এক পরিবার, যাদের কাছে বৈধ ভারতীয় আধার কার্ড থাকা সত্ত্বেও নতুন ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ায় পুলিশ তাদের আটক করে বিএসএফের হাতে তুলে দিয়েছিল। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য হাসিবুর রহমান জানান, ওই পরিবারের প্রবীণ সদস্য ভারতে এর আগে চারবার রাষ্ট্রীয় নির্বাচনে ভোট দিলেও এবার তাকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করা হয়। অবশেষে ব্যাপক দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনার পর বিএসএফ তাদের ফেরত নেয়।
একইভাবে ৬ জুন ভোরে মেহেরপুরের তেঁতুলবাড়ীয়া সীমান্ত দিয়ে দুটি বাঙালি মুসলিম পরিবারের ৬ সদস্যকে এবং ৮ জুন ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্ত দিয়ে এক গর্ভবতী নারী ও শিশুসহ ১১ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা করা হলে বিজিবি সফলভাবে তা প্রতিহত করে এবং বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

৮০ ঘণ্টা পর পঞ্চগড় সীমান্ত থেকে ১২ জনকে ফিরিয়ে নিল বিএসএফ। ছবিঃ সংগৃহীত
লালমনিরহাট, জয়পুরহাট ও অন্যান্য সীমান্ত এলাকার খণ্ডচিত্র
গত ১৪ জুন রাতে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার আজিজপুর (সাপ্পারবাড়ি) সীমান্তে বিএসএফ এক নাটকীয় ও আতঙ্কজনক কায়দায় পুশ-ইনের চেষ্টা চালায়। গভীর রাতে সীমান্তের কাঁটাতারের গেটের কাছে সার্চ লাইট বন্ধ করে এবং পর পর কয়েকটি ককটেল বা আতশবাজির বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে ৫ জন ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশের ভেতরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুললে এবং ৬১ বিজিবির (তিস্তা ব্যাটালিয়ন) টহলের জন্য নিয়োজিত বিজিবি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালে বিএসএফ পিছু হটে। যদিও বিজিবির সহকারী পরিচালক আবদুর রাজ্জাক ককটেল বিস্ফোরণের তথ্য সরাসরি সংবাদমাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করেননি।
জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার ধরঞ্জি ইউনিয়নের হাটখোলা সীমান্তেও ১৪ জুন সকালে ৫ জন ভারতীয় নাগরিককে পুশ-ইনের চেষ্টা করা হয়, যার মধ্যে ৪ জন তাড়া খেয়ে দৌড়ে ভারতের ভেতরে চলে গেলেও এক বৃদ্ধ ভারতীয় নাগরিক শূন্যরেখায় আটকে পড়েন। হাটখোলা সীমান্তের কোম্পানি কমান্ডার আনিছুর রহমান এবং স্থানীয় কৃষক লুৎফর রহমান ও আবু বক্কর সিদ্দিকের বর্ণনানুযায়ী, বিজিবির তীব্র আপত্তির মুখে অবশেষে ওই রাতেই বিএসএফ তাকে ফেরত নিয়ে যায়।
সীমান্তের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে মানব পাচারকারী দালাল চক্রও। চাঁপাইনবাবগঞ্জের রোকনপুর সীমান্তে পুশ-ইন কার্যক্রমে অর্থের বিনিময়ে সহায়তা করার অপরাধে বিজিবি ৭ জন বাংলাদেশি দালালকে আটক করেছে, যা সীমান্তে অপরাধী চক্রের সক্রিয়তার প্রমাণ দেয়। অন্য দিকে ১৬ জুন বিকেলে নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার চকিলাম বিজিবি বিওপির চকশবদল সীমান্তে এক সন্দেহভাজন ৭০ ঊর্ধ্ব ভারতীয় বৃদ্ধকে গ্রামবাসী আটক করে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে।

দিল্লিতে দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে খলিলুর-জয়শঙ্করের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। ছবিঃ সংগৃহীত
দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব ও নীতিগত প্রতিক্রিয়া
সীমান্তে চলমান এই পুশ-ইন সংকটটি দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা শামা ওবায়েদ এক সংবাদ সম্মেলনে জানান যে, সীমান্তে এই একতরফা ও জবরদস্তিমূলক অনুপ্রবেশের প্রচেষ্টার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ঢাকা থেকে ইতিমধ্যে ১২ থেকে ১৩টি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক পত্র (ডেমাশ) নয়া দিল্লিতে প্রেরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে:
যেকোনো দেশের নাগরিক যদি অবৈধভাবে অন্য দেশে অবস্থান করে, তবে দ্বিপাক্ষিক প্রত্যাবাসন নীতিমালা এবং নাগরিকত্ব যাচাইয়ের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তাদের ফেরত পাঠানো উচিত। এবং এভাবে জোরপূর্বক জিরো লাইনে ফেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবাধিকারের পরিপন্থী।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এর জবাবে জানান, একটি দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থা ইতিমধ্যে কার্যকর রয়েছে এবং ভারত তার আইন অনুযায়ী অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করছে। ভারতের দাবি অনুযায়ী, তারা ২,৮৬০ জন সন্দেহভাজন বাংলাদেশি নাগরিকের একটি তালিকা ঢাকার কাছে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য পাঠিয়েছে, যা বর্তমানে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
এই সংকটের মাঝেই ২০২৬ সালের ৮ থেকে ১১ জুন ভারতের নয়া দিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সমন্বয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে বিজিবির মহাপরিচালক সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করার পাশাপাশি এই একতরফা পুশ-ইন বন্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। দীর্ঘ আলোচনার পর উভয় পক্ষ সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করতে এবং রাতে অরক্ষিত সীমান্ত পথগুলোতে কো-অর্ডিনেটেড জয়েন্ট পেট্রোলিং (CJP) বা যৌথ টহল বাড়াতে সম্মত হয়। এছাড়া সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন করে যেকোনো প্রকার অবৈধ ও অননুমোদিত স্থাপনা নির্মাণ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে এই সম্মেলনের পরপরই ১৪ জুন কুলাউড়া সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে এক বাংলাদেশি তরুণের লাশ হস্তান্তরের ঘটনায় সীমান্ত হত্যার স্পর্শকাতরতা এবং উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে উত্তাপ ও জনরোষ
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই পুশ-ইনের বিরুদ্ধে তীব্র জনরোষ ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ভারতের নিজস্ব মানবাধিকার সংস্থা যেমন ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটস’ (এপিডিআর) অভিযোগ করেছে যে, বিএসএফ বন্দুকের মুখে নারী ও শিশুদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
২০২৬ সালের ১২ জুন “১১ দলীয় ঐক্য” জোটের ব্যানারে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, নওগাঁ এবং ফেনীর মতো সীমান্ত জেলাগুলোতে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। নওগাঁর ধামইরহাটের সমাবেশে নওগাঁ-২ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মো. এনামুল হক প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ভারতের এই একতরফা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করার দাবি জানান।
পাশাপাশি ১৭ জুন ঢাকায় ‘আমার বাংলাদেশ পার্টি’ (এবি পার্টি) এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ভারতের এই পুশ-ইন তৎপরতাকে মূলত দেশটির সংখ্যালঘু মুসলমানদের বিতাড়নের একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক চক্রান্ত হিসেবে অভিহিত করে তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করে। উল্লেখ্য, ১৪ জুন পুশ-ইন সংক্রান্ত জাতীয় সংসদের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা “অনিবার্য কারণে” স্থগিত করা হলে বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ কক্ষে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। ছবিঃ সংগৃহীত
সমাধান কি?
জাতীয় স্বার্থ ও সীমান্ত সুরক্ষায় বাংলাদেশ সরকারের নীতিগত অবস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পরিকল্পনা পুনর্ব্যক্ত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ১৭ জুন জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও সমাধানের পথ তুলে ধরেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বিগত সরকারের দীর্ঘ ১৬ বছর সীমান্ত ছিল অপরাধ ও অনুপ্রবেশের স্বর্গরাজ্য। বর্তমান সরকার এই অবস্থার স্থায়ী পরিবর্তনের জন্য বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা এবং সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী পুশ-ইন ও সীমান্ত সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি মূল কৌশলগত ও কাঠামোগত পদক্ষেপকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে দীর্ঘমেয়াদে আরও শক্তিশালী ও নিয়ন্ত্রিত করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।

দিল্লিতে ৫৭তম বিএসএফ-বিজিবি মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন শেষ হয়েছে বৃহস্পতিবার। ছবিঃ সংগৃহীত
প্রথমত, ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত এলাকাগুলোতে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকে একটি অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে মিয়ানমার সীমান্তে অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এই ধরনের বেড়া স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে, এবং একই নীতির আলোকে ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত অঞ্চলগুলোতেও কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনা সক্রিয়ভাবে সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। সরকারের মতে, এই পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে সীমান্ত দিয়ে একতরফা পুশ-ইনের সুযোগ অনেকাংশে বন্ধ করা সম্ভব হবে।
দ্বিতীয়ত, সীমান্ত নজরদারি ব্যবস্থাকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার অংশ হিসেবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অতি সংবেদনশীল সীমান্ত এলাকায় ইতিমধ্যে সর্বাধুনিক স্মার্ট বর্ডার সারভেইল্যান্স সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে মানবহীন ও ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা হচ্ছে; এই প্রযুক্তি রাতের অন্ধকার, কুয়াশা বা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও সীমান্ত অতিক্রম বা পুশ-ইনের চেষ্টা শনাক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তৃতীয়ত, সীমান্তে দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনীর টহল ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য পার্বত্য সীমান্ত অঞ্চলে সীমান্ত সড়ক নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে, যা দুর্গম এলাকায় বিজিবির চলাচল সহজ করে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করবে। চতুর্থত, সরকার জোর দিয়ে বলেছে যে পুশ-ইন বা পুশ-ব্যাকের মতো জোরপূর্বক বিতাড়ন কোনো স্থায়ী বা গ্রহণযোগ্য সমাধান নয়; বরং কোনো ব্যক্তিকে বাংলাদেশি হিসেবে দাবি করা হলে তা অবশ্যই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, নাগরিকত্ব যাচাই এবং বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় নিষ্পত্তি করতে হবে। একই সঙ্গে জিরো লাইনে ফেলে রেখে মানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ঘটানো বন্ধ করতে হবে এবং সমস্যার সমাধানকে কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।