মেলবোর্ন, ৬ জুলাই- ৫ আগস্ট। এই তারিখটা এখন আমাদের জীবনের ক্যালেন্ডারে একটা বিভাজন রেখা। এর আগে এক বাংলাদেশ, এর পরে আরেক বাংলাদেশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনটা কি আমরা বুঝে-শুনে চেয়েছিলাম, নাকি আবেগ, গুজব আর দেখাদেখির ফাঁদে পড়ে করেছিলাম?
জুলাই মাসে অনেকেই স্রেফ আবেগ থেকে প্রোফাইল লাল করেছিল। অন্যের দেখাদেখি। কেউ কেউ ফেসবুকে বিপ্লব করেছিল। শত শত লাখো গুজব বিশ্বাস করে প্রতারিত হয়ে শেখ হাসিনার পতন চেয়ে আন্দোলন করেছিল। তখন কেউ ভাবেনি, এই পতনের পরে কী হবে। ভেবেছিলাম, একটা মানুষ চলে গেলেই বুঝি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
আজ তেইশ মাস পর যারা ভুল বুঝতে পেরেছেন, যারা অনুতপ্ত, তাদের কাছে আমার অনুরোধ—নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করুন। জুলাই-আগস্টের ষড়যন্ত্রের আসল চিত্রটা মানুষের সামনে তুলে ধরুন। কারণ ইতিহাসকে ভুলভাবে লিখতে দেওয়া যায় না।
শেখ হাসিনা ফিরে আসলেই জীবনে ছন্দ ফিরবে—এমন স্বপ্ন নিয়ে আজ কত মানুষ অপেক্ষা করছেন, তার হিসাব কে রাখে! অবাক লাগে যখন দেখি, শিল্পী, সাহিত্যিক, সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মী, বিভিন্ন পেশার মানুষ—যারা কোনোদিন শেখ হাসিনাকে চোখে দেখেননি, যারা রাজনীতি করেন না, যারা ৪০-৫০ বছর ধরে বিদেশে বসবাস করেন—তাদের কাছেও দেশ মানে শেখ হাসিনা।
কেন? কারণ তারা দেখেছেন স্থিতিশীলতা মানে কী। তারা দেখেছেন পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুতের আলো। তারা দেখেছেন একটি মেয়ে কীভাবে একটি দেশকে দেউলিয়াত্বের হাত থেকে বাঁচিয়ে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড় করিয়েছে। রাজনীতি না করেও মানুষ বোঝে, নেতৃত্বের অভাব কতটা ভয়ংকর।
যারা বাকস্বাধীনতার দাবিতে জুলাই আন্দোলন করেছিল, তারাই আজ আমার-আপনার গলায় পাড়া দিয়ে বসেছে। আপনারাই বলুন, তারা আসলে কোন বাকস্বাধীনতা চেয়েছিল?
বাংলাদেশ ও স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কথা বলা? নারী বিদ্বেষী কথা বলা? নন-মুসলিম মানুষদের ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করা? যখন খুশি তাকে খুশি অকথ্য ভাষায় গালাগাল করা? চ’বর্গীয় খ’বর্গীয় শব্দ ব্যবহার করে জনসম্মুখে ভাষণ দেওয়া? এগুলোই কি তাদের বাকস্বাধীনতা?
আর অন্যদিকে, আমি-আপনি যখন মনের ভাব ব্যক্ত করি, যখন নিজের মত প্রকাশ করি, তখন তারা সেটাকে বলে “সন্ত্রাস”। এ কেমন বিচার? এ কেমন স্বাধীনতা?
ইউনূস-পরবর্তী সময়েও আমরা দেখছি সেই একই অপশাসনের ধারা। মবাজি, প্রতিহিংসা, গণপিটুনির সংস্কৃতি। সাবেক উপদেষ্টা ফারুকীসহ অনেকে এখনো ইনিয়ে-বিনিয়ে এই সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার আকুতি জানাচ্ছেন।
জুলাইকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে কদর্য বিতর্ক চলছে, তার পেছনে ইউনূস আমলের সুবিধাবাদী গোষ্ঠী। তারা ভিন্নমত দমনের নামে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করতে চায়। তারা কার্যত ইউনূস শাসনের ধারাবাহিকতায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কণ্ঠরোধের পথই পুনরুজ্জীবিত করতে চায়।
এটা তাদের জন্যও একটা সুস্পষ্ট বার্তা, যারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করে ইউনূস-ধার শাসনকে টিকিয়ে রাখতে চায়। দেশ অস্থির থাকলে, মানুষ ভয়ে থাকলে, তাদের ব্যবসা ভালো চলে।
সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখছি ধর্ম রক্ষার নামে মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা, পতাকার মহড়া, শক্তি প্রদর্শন। প্রশ্ন হলো, ধর্ম কি এতটাই অসহায় হয়ে পড়েছে যে তাকে রক্ষা করতে এসব লাগবে?
দেশে ধর্মের ওপর এমন কী আঘাত নেমে এলো যে ধর্ম রক্ষার নামে এইসব প্রদর্শনী করতেই হবে? নাকি ধর্ম কেবল অজুহাত—আসল লক্ষ্য অন্য কিছু?
যে বিশ্বাস মানুষের চরিত্রে, ন্যায়বোধে, মানবিকতায় প্রকাশ পাওয়ার কথা, সেটাকে যদি বারবার শোভাযাত্রা আর শক্তির প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—এটা কি সত্যিই ধর্মপ্রেম, নাকি ধর্মান্ধতা ও উগ্র মানসিকতার প্রকাশ?
নাটক-চলচ্চিত্রের শিল্পী শাওনের ফেসবুক পোস্টকে ঘিরে অসহিষ্ণু আচরণ করছে তথাকথিত বিপ্লবীরা। জুলাই-সিডিআইকে কেন্দ্র করে দেশটা যেন উতলা হয়ে উঠেছে। প্রতিক্রিয়াশীল জুলাই ষড়যন্ত্রের “জুলাই যোদ্ধা” নামে উগ্রবাদী গোষ্ঠী যে আচরণ করছে, তা কোনো সভ্য মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়া যায় না।
কারো মত প্রকাশ করার উপায় নেই। ফেসবুক, সোশ্যাল মিডিয়ায় শত শত আইডি থেকে অশ্লীল ভাষায় কবিতা, ছড়া লিখে ছাড়ছে। কোনো লেখক-সাহিত্যিকের ভাষা এমন হতে পারে না।
শোনা যাচ্ছে, জামাত-শিবিরের বটবাহিনী টাকা দিয়ে এসব করাচ্ছে। ফেসবুকে ঢোকাই যাচ্ছে না। নোংরামি আর গালিগালাজে ভরা। শাওনকে মারা, যৌন হয়রানি করা, জেলে দেওয়ার হুমকি—নানাবিধ কথা তারা বলছে।
দেশপ্রেমিক মানুষদের তারা “খুনি-সন্ত্রাসী” বলছে। অথচ আসল খুনিরা আজ বুক ফুলিয়ে ঘুরছে।
আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান হয়েছে জাতীয় সংসদের সামনে। জামাতের আমির ডা: শফিকুর রহমান বলছেন, “আমেরিকা বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু!”
এটা কি হওয়ার কথা ছিল? যে আমেরিকা একাত্তরে আমাদের বিরুদ্ধে সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল, সেই আমেরিকা আজ অকৃত্রিম বন্ধু? দেশ কোন দিকে যাচ্ছে?
জুলাই “সন্ত্রাসীরা” যেভাবে হুমকি-ধামকি, মব ভায়োলেন্স, মামলা, লুটপাট করছে, তাতে আমার আশঙ্কা হয়—দেশ সামনে আরও রক্তপাতের দিকে যাবে। আমার ধারণা, হাজার হাজার লোক মারা যাবে।
একটি জাতি যখন ভিন্নমত সহ্য করতে পারে না, যখন আলোচনার বদলে গালি দেয়, যখন আইনের বদলে মবের শাসন চায়, তখন সেই জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
প্রিয় পাঠক, আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম? যে বাংলাদেশে কথা বলা যাবে না, লিখা যাবে না, শিল্পী নিরাপদ না, নারী নিরাপদ না, সংখ্যালঘু নিরাপদ না?
৫ আগস্টের ভুল যদি বুঝে থাকি, তাহলে এখনই সময় সংশোধনের। ইতিহাসের কাছে দায়বদ্ধ থাকার।
দেশ মানে পতাকা না, দেশ মানে মানুষ। আর মানুষের শান্তি, নিরাপত্তা, বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত না করলে কোনো বিপ্লবেরই দাম নেই।
শেখ হাসিনা ফিরুক বা না ফিরুক, দেশের ছন্দ ফেরাতে হলে আমাদের আগে নিজেদের ফিরতে হবে। মানবিকতায়, ন্যায়বোধে, সহনশীলতায়। নইলে এই দেশ আরো গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে ।