বাংলাদেশ

দেশ কোন দিকে যাচ্ছে?

সরদার সেলিম রেজা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পরিবেশ কর্ম, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি: বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র।

  • 4:39 pm - July 06, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৭৪ বার
সরদার সেলিম রেজা। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৬ জুলাই- ৫ আগস্ট। এই তারিখটা এখন আমাদের জীবনের ক্যালেন্ডারে একটা বিভাজন রেখা। এর আগে এক বাংলাদেশ, এর পরে আরেক বাংলাদেশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনটা কি আমরা বুঝে-শুনে চেয়েছিলাম, নাকি আবেগ, গুজব আর দেখাদেখির ফাঁদে পড়ে করেছিলাম?

জুলাই মাসে অনেকেই স্রেফ আবেগ থেকে প্রোফাইল লাল করেছিল। অন্যের দেখাদেখি। কেউ কেউ ফেসবুকে বিপ্লব করেছিল। শত শত লাখো গুজব বিশ্বাস করে প্রতারিত হয়ে শেখ হাসিনার পতন চেয়ে আন্দোলন করেছিল। তখন কেউ ভাবেনি, এই পতনের পরে কী হবে। ভেবেছিলাম, একটা মানুষ চলে গেলেই বুঝি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

আজ তেইশ মাস পর যারা ভুল বুঝতে পেরেছেন, যারা অনুতপ্ত, তাদের কাছে আমার অনুরোধ—নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করুন। জুলাই-আগস্টের ষড়যন্ত্রের আসল চিত্রটা মানুষের সামনে তুলে ধরুন। কারণ ইতিহাসকে ভুলভাবে লিখতে দেওয়া যায় না।

শেখ হাসিনা ফিরে আসলেই জীবনে ছন্দ ফিরবে—এমন স্বপ্ন নিয়ে আজ কত মানুষ অপেক্ষা করছেন, তার হিসাব কে রাখে! অবাক লাগে যখন দেখি, শিল্পী, সাহিত্যিক, সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মী, বিভিন্ন পেশার মানুষ—যারা কোনোদিন শেখ হাসিনাকে চোখে দেখেননি, যারা রাজনীতি করেন না, যারা ৪০-৫০ বছর ধরে বিদেশে বসবাস করেন—তাদের কাছেও দেশ মানে শেখ হাসিনা।

কেন? কারণ তারা দেখেছেন স্থিতিশীলতা মানে কী। তারা দেখেছেন পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুতের আলো। তারা দেখেছেন একটি মেয়ে কীভাবে একটি দেশকে দেউলিয়াত্বের হাত থেকে বাঁচিয়ে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড় করিয়েছে। রাজনীতি না করেও মানুষ বোঝে, নেতৃত্বের অভাব কতটা ভয়ংকর।

যারা বাকস্বাধীনতার দাবিতে জুলাই আন্দোলন করেছিল, তারাই আজ আমার-আপনার গলায় পাড়া দিয়ে বসেছে। আপনারাই বলুন, তারা আসলে কোন বাকস্বাধীনতা চেয়েছিল?

বাংলাদেশ ও স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কথা বলা? নারী বিদ্বেষী কথা বলা? নন-মুসলিম মানুষদের ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করা? যখন খুশি তাকে খুশি অকথ্য ভাষায় গালাগাল করা? চ’বর্গীয় খ’বর্গীয় শব্দ ব্যবহার করে জনসম্মুখে ভাষণ দেওয়া? এগুলোই কি তাদের বাকস্বাধীনতা?

আর অন্যদিকে, আমি-আপনি যখন মনের ভাব ব্যক্ত করি, যখন নিজের মত প্রকাশ করি, তখন তারা সেটাকে বলে “সন্ত্রাস”। এ কেমন বিচার? এ কেমন স্বাধীনতা?

ইউনূস-পরবর্তী সময়েও আমরা দেখছি সেই একই অপশাসনের ধারা। মবাজি, প্রতিহিংসা, গণপিটুনির সংস্কৃতি। সাবেক উপদেষ্টা ফারুকীসহ অনেকে এখনো ইনিয়ে-বিনিয়ে এই সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার আকুতি জানাচ্ছেন।

জুলাইকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে কদর্য বিতর্ক চলছে, তার পেছনে ইউনূস আমলের সুবিধাবাদী গোষ্ঠী। তারা ভিন্নমত দমনের নামে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করতে চায়। তারা কার্যত ইউনূস শাসনের ধারাবাহিকতায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কণ্ঠরোধের পথই পুনরুজ্জীবিত করতে চায়।

এটা তাদের জন্যও একটা সুস্পষ্ট বার্তা, যারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করে ইউনূস-ধার শাসনকে টিকিয়ে রাখতে চায়। দেশ অস্থির থাকলে, মানুষ ভয়ে থাকলে, তাদের ব্যবসা ভালো চলে।

সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখছি ধর্ম রক্ষার নামে মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা, পতাকার মহড়া, শক্তি প্রদর্শন। প্রশ্ন হলো, ধর্ম কি এতটাই অসহায় হয়ে পড়েছে যে তাকে রক্ষা করতে এসব লাগবে?

দেশে ধর্মের ওপর এমন কী আঘাত নেমে এলো যে ধর্ম রক্ষার নামে এইসব প্রদর্শনী করতেই হবে? নাকি ধর্ম কেবল অজুহাত—আসল লক্ষ্য অন্য কিছু?

যে বিশ্বাস মানুষের চরিত্রে, ন্যায়বোধে, মানবিকতায় প্রকাশ পাওয়ার কথা, সেটাকে যদি বারবার শোভাযাত্রা আর শক্তির প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—এটা কি সত্যিই ধর্মপ্রেম, নাকি ধর্মান্ধতা ও উগ্র মানসিকতার প্রকাশ?

নাটক-চলচ্চিত্রের শিল্পী শাওনের ফেসবুক পোস্টকে ঘিরে অসহিষ্ণু আচরণ করছে তথাকথিত বিপ্লবীরা। জুলাই-সিডিআইকে কেন্দ্র করে দেশটা যেন উতলা হয়ে উঠেছে। প্রতিক্রিয়াশীল জুলাই ষড়যন্ত্রের “জুলাই যোদ্ধা” নামে উগ্রবাদী গোষ্ঠী যে আচরণ করছে, তা কোনো সভ্য মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়া যায় না।

কারো মত প্রকাশ করার উপায় নেই। ফেসবুক, সোশ্যাল মিডিয়ায় শত শত আইডি থেকে অশ্লীল ভাষায় কবিতা, ছড়া লিখে ছাড়ছে। কোনো লেখক-সাহিত্যিকের ভাষা এমন হতে পারে না।

শোনা যাচ্ছে, জামাত-শিবিরের বটবাহিনী টাকা দিয়ে এসব করাচ্ছে। ফেসবুকে ঢোকাই যাচ্ছে না। নোংরামি আর গালিগালাজে ভরা। শাওনকে মারা, যৌন হয়রানি করা, জেলে দেওয়ার হুমকি—নানাবিধ কথা তারা বলছে।

দেশপ্রেমিক মানুষদের তারা “খুনি-সন্ত্রাসী” বলছে। অথচ আসল খুনিরা আজ বুক ফুলিয়ে ঘুরছে।

আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান হয়েছে জাতীয় সংসদের সামনে। জামাতের আমির ডা: শফিকুর রহমান বলছেন, “আমেরিকা বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু!”

এটা কি হওয়ার কথা ছিল? যে আমেরিকা একাত্তরে আমাদের বিরুদ্ধে সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল, সেই আমেরিকা আজ অকৃত্রিম বন্ধু? দেশ কোন দিকে যাচ্ছে?

জুলাই “সন্ত্রাসীরা” যেভাবে হুমকি-ধামকি, মব ভায়োলেন্স, মামলা, লুটপাট করছে, তাতে আমার আশঙ্কা হয়—দেশ সামনে আরও রক্তপাতের দিকে যাবে। আমার ধারণা, হাজার হাজার লোক মারা যাবে।

একটি জাতি যখন ভিন্নমত সহ্য করতে পারে না, যখন আলোচনার বদলে গালি দেয়, যখন আইনের বদলে মবের শাসন চায়, তখন সেই জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

প্রিয় পাঠক, আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম? যে বাংলাদেশে কথা বলা যাবে না, লিখা যাবে না, শিল্পী নিরাপদ না, নারী নিরাপদ না, সংখ্যালঘু নিরাপদ না?

৫ আগস্টের ভুল যদি বুঝে থাকি, তাহলে এখনই সময় সংশোধনের। ইতিহাসের কাছে দায়বদ্ধ থাকার।

দেশ মানে পতাকা না, দেশ মানে মানুষ। আর মানুষের শান্তি, নিরাপত্তা, বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত না করলে কোনো বিপ্লবেরই দাম নেই।

শেখ হাসিনা ফিরুক বা না ফিরুক, দেশের ছন্দ ফেরাতে হলে আমাদের আগে নিজেদের ফিরতে হবে। মানবিকতায়, ন্যায়বোধে, সহনশীলতায়। নইলে এই দেশ আরো গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে ।

এই শাখার আরও খবর

ঢামেকের নারী শৌচাগার থেকে হিন্দু নার্সের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার, যা জানা যাচ্ছে

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের পুরোনো ভবনের নিচতলার একটি নারী শৌচাগার থেকে তন্ময়ী মণ্ডল নামে এক নার্সের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তিনি রাজধানীর বারডেম…

মধ্যরাত থেকে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা, বন্ধ ইলিশ আহরণ

ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় আজ বুধবার (৭ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকে শুরু হচ্ছে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত বঙ্গোপসাগর ও নদ-নদীতে…

তিন কাউন্সিলর নিয়েই ইংরেজবাজার পুরসভা বিজেপির দখলে

মালদহ জেলা পরিষদের পর এবার ইংরেজবাজার পুরসভাও দখলে নিল বিজেপি। বুধবার চেয়ারম্যান নির্বাচনের ভোটাভুটিতে বিজেপি প্রার্থী অম্লান ভাদুড়িকে সমর্থন করেন তৃণমূল থেকে ‘নির্দল’ হওয়া ১১…

শর্তসাপেক্ষে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার ইঙ্গিত সরকারের

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন বাংলাদেশের সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তবে এ ধরনের প্রক্রিয়া শুরুর আগে…

রামেবির ভিসিকে ‘মব’ সৃষ্টি করে পদত্যাগ: বিএনপি নেতা গ্রেপ্তার

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোহা. জাওয়াদুল হককে একদল মানুষ জোরপূর্বক ঘেরাও করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানোর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আব্দুস সালাম (৫৬)…

গণপতি পরিবার হত্যাকাণ্ড: দেড় মাসেও কাটেনি ভয়, এলাকায় নেই পূজার আমেজ

রংপুর নগরীর হিন্দু অধ্যুষিত মাছুয়াপাড়া মহল্লায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও একমাত্র ছেলেকে হত্যার ঘটনায় দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও আতঙ্ক কাটেনি স্থানীয়…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au