বাংলাদেশ

তীব্র তাপপ্রবাহে ঝুঁকিতে বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ

জলবায়ু সংকটকে শ্রমনীতি ও অধিকার প্রশ্নে দেখার আহ্বান

  • 6:00 pm - July 06, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১০১ বার
ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৬ জুলাই- বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে তাপপ্রবাহ, আর এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন দেশের লাখো শ্রমজীবী মানুষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত গরম এখন আর শুধু মৌসুমি দুর্ভোগ নয়, বরং এটি শ্রমিকদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, জীবিকা ও মৌলিক অধিকারের জন্য একটি গুরুতর হুমকিতে পরিণত হয়েছে। তাই তাপপ্রবাহকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে নয়, শ্রম অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয় হিসেবেও বিবেচনা করার দাবি উঠেছে।

এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ এবং রেজওয়ানুল হক আজম উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। অতিবৃষ্টি, শৈত্যপ্রবাহ, বজ্রপাত, ঘূর্ণিঝড় কিংবা বন্যার পাশাপাশি এখন তীব্র তাপপ্রবাহও তাদের জীবনের অন্যতম বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তাদের মতে, কৃষিশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক, পরিবহনশ্রমিক, পথের হকার, ইটভাটা শ্রমিক, রি-রোলিং মিলের শ্রমিক এবং তৈরি পোশাক শিল্পের অনেক শ্রমিক প্রতিদিন খোলা আকাশের নিচে বা অতিরিক্ত তাপমাত্রার মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হন। অথচ অধিকাংশ কর্মস্থলে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, ছায়াযুক্ত বিশ্রামকেন্দ্র কিংবা জরুরি শীতল পরিবেশের কোনো ব্যবস্থা নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কর্মক্ষেত্রে তাপজনিত ঝুঁকি বিশ্বজুড়ে অন্যতম বড় পেশাগত নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হচ্ছে। অতিরিক্ত গরমে পানিশূন্যতা, হিট এক্সহসশন, হিট স্ট্রোক, কিডনি জটিলতা, হৃদ্‌রোগসহ নানা শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

নিবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ শ্রমিকের সামনে কাজ বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। একদিন কাজ না করলে অনেক পরিবারের খাবার জোটে না। ফলে অসুস্থ শরীর নিয়েও রিকশাচালক, দিনমজুর কিংবা কৃষিশ্রমিকদের প্রচণ্ড রোদে কাজ চালিয়ে যেতে হয়। সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শ্রমিকের জন্য কাজ বন্ধ রাখা বাস্তবিক অর্থেই অসম্ভব।

লেখকরা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি তাপজনিত অসুস্থতা মোকাবিলায় একটি জাতীয় নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে, যা ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এটি মূলত স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রিক। শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা, বিশ্রাম, কর্মস্থলের তাপমাত্রা, নিয়োগকর্তার দায়িত্ব এবং তাপঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো এখনো শ্রম আইন ও নীতিমালায় পর্যাপ্তভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

বর্তমানে বাংলাদেশের শ্রম আইনে কর্মস্থলে ‘সহনীয় তাপমাত্রা’ বজায় রাখার কথা বলা হলেও সর্বোচ্চ কত ডিগ্রি তাপমাত্রায় কাজ বন্ধ রাখতে হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। তাপপ্রবাহের সময় বাধ্যতামূলক বিরতি, ছায়াযুক্ত বিশ্রামকেন্দ্র, শীতলীকরণ ব্যবস্থা কিংবা তাপজনিত অসুস্থতার তথ্য সংরক্ষণেরও সুস্পষ্ট বিধান নেই।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখকরা জানান, ২০২৪ সালে তাপজনিত শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কারণে বাংলাদেশে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। এতে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৭৮ কোটি মার্কিন ডলার, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ০ দশমিক ৪ শতাংশ।

নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ শহর ও শিল্পাঞ্চল পরিকল্পিতভাবে তাপ সহনশীল অবকাঠামো বিবেচনা করে গড়ে ওঠেনি। কংক্রিট, টিনের ছাদ, পিচঢালা সড়ক এবং ঘনবসতিপূর্ণ নগরায়ণের কারণে শহরে তাপমাত্রা আরও বেড়ে যায়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে কর্মরত মানুষের তুলনায় বাইরে কাজ করা শ্রমিকরা অনেক বেশি ঝুঁকির মুখে থাকেন।

এই পরিস্থিতিতে লেখকরা শ্রম আইন ও পেশাগত নিরাপত্তা নীতিমালায় তাপপ্রবাহজনিত ঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত করা, নির্দিষ্ট তাপমাত্রার ভিত্তিতে কর্মঘণ্টা সমন্বয়, বাধ্যতামূলক বিশ্রাম, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, ছায়াযুক্ত বিশ্রামকেন্দ্র, জরুরি কুলিং জোন এবং শ্রমিকদের জন্য তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে প্রশিক্ষণের সুপারিশ করেছেন। পাশাপাশি নগর পরিকল্পনা ও শিল্প অবকাঠামো উন্নয়নেও তাপ সহনশীল নকশা বাধ্যতামূলক করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার প্রশ্ন নয়; এটি মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, মর্যাদা এবং নিরাপদ জীবিকার মৌলিক অধিকার রক্ষার বিষয়। শ্রমজীবী মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে বাংলাদেশের উন্নয়নের অর্জনও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।

এই শাখার আরও খবর

এআই নিয়ন্ত্রণে কঠোর নিরাপত্তা চান জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভবিষ্যতে মানবজাতির জন্য অস্তিত্বগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক। উন্নত এআই ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে…

১৬ দেশের কর্মীদের জন্য খুলছে ডেনমার্কের দুয়ার

বিদেশি কর্মীদের জন্য নতুন একটি অভিবাসন পথ চালু করতে যাচ্ছে ডেনমার্ক। আগামী ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে নতুন এই ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এর আওতায়…

ঢাবিতে চালু হলো শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য একটি অনলাইন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। duevaluation.com নামের এই প্ল্যাটফর্মে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবেন। মূল্যায়নকারী শিক্ষার্থীর…

ডেঙ্গুতে এক সপ্তাহে প্রাণ হারালেন ২৪ জন

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১…

নতুন বাসায় ওঠার পরদিনই হিন্দু চিকিৎসকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

সিলেট নগরীর মির্জাজাঙ্গাল এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে পদ্মজিৎ চক্রবর্তী প্রান্ত (৩১) নামে এক শিক্ষানবিশ চিকিৎসকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নতুন বাসায় ওঠার পরদিনই…

‘ঘৃণা নয়, শুদ্ধ সাত্ত্বিক প্রেমই আরএসএসের ভিত্তি’: লন্ডনে মোহন ভাগবত

লন্ডনে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) কাজের মূল দর্শন তুলে ধরে সংগঠনটির সরসংঘচালক মোহন ভাগবত বলেছেন, তীব্র ঘৃণা নয়, ‘শুদ্ধ সাত্ত্বিক প্রেম’ই আরএসএসের কর্মকাণ্ডের ভিত্তি। পারস্পরিক…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au