বাংলাদেশ

‘জুলাইযোদ্ধা’ হতে ৬০০ নতুন আবেদনের প্রায় ২০০ টি ভুয়া

  • 4:15 pm - July 08, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৩৪ বার
বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলন। ছবিঃ ওটিএন বাংলা

মেলবোর্ন, ৮ জুলাই- জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের ‘জুলাইযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে জমা পড়া নতুন আবেদন যাচাইয়ে ব্যাপক অসংগতি ও জালিয়াতির তথ্য উঠে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তিন হাজারের বেশি নতুন আবেদনের মধ্যে প্রায় ২০০ আবেদন সম্পূর্ণ ভুয়া বলে তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া আরও প্রায় ৬০০ আবেদনে বিভিন্ন ধরনের অসংগতি, তথ্যের অমিল, একই ব্যক্তির একাধিক আবেদন এবং শহীদ ব্যক্তিকে আহত হিসেবে পুনরায় তালিকাভুক্ত করার মতো ঘটনা ধরা পড়েছে।

তবে যাচাই শেষে ১ হাজার ৫৯০ জনের আবেদনকে সত্য বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তাদের জুলাইযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, নতুন আবেদনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হলে বর্তমানে গেজেটভুক্ত ১৪ হাজার ৩৭০ জুলাইযোদ্ধার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১৫ হাজার ৯৬০ জনে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতেও নতুন আবেদন যাচাই করে প্রকৃত আহতদের তালিকাভুক্ত করা হবে। অন্যদিকে কেউ অসত্য তথ্য দিয়ে গেজেটভুক্ত হয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে।

গোয়েন্দা তদন্তে সত্যতা মিলেছে ১ হাজার ৫৯০ আবেদনের

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এর আগে প্রকাশিত গেজেটের পর নতুন করে মোট ৩ হাজার ৩১৬টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৮৮টি আবেদন মাঠপর্যায়ে তদন্তের জন্য এসবি ও পিবিআইয়ের কাছে পাঠানো হয়।

গত বছরের অক্টোবরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আবেদনগুলো তদন্তের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তা চায়। পরে নভেম্বরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুটি সংস্থাকে তদন্তের নির্দেশ দেয়। গত জুনে তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়।

তদন্তে ১ হাজার ৫৯০ জনের তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ৭৮৯ জনকে ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস)-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আরও ২৭৬ জনের এমআইএসভুক্তির কাজ চলছে এবং ২১০ জনের প্রাথমিক যাচাই শেষ হয়েছে। এমআইএস কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে তাদের গেজেট প্রকাশ করা হবে।

প্রায় ২০০ আবেদন সরাসরি ভুয়া, আরও ৬০০ আবেদনে অসংগতি

তদন্ত প্রতিবেদনে প্রায় ২০০ আবেদন সম্পূর্ণ ভুয়া হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৬০০ আবেদনে বিভিন্ন ধরনের অসংগতি পাওয়া গেছে। এসবের মধ্যে রয়েছে দুই তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনের মধ্যে তথ্যগত অমিল, একই ব্যক্তির একাধিক আবেদন, শহীদ ব্যক্তিকে আহত হিসেবে পুনরায় আবেদন করা এবং অন্যান্য তথ্যগত ত্রুটি।

মন্ত্রণালয় মনে করছে, এসব আবেদনের মধ্য থেকেও আরও প্রায় ১০০ আবেদন শেষ পর্যন্ত সত্য বলে প্রমাণিত হতে পারে। সেগুলোর বিষয়ে আরও যাচাই-বাছাই চলছে।

আগের বিতর্ক এড়াতে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে যাচাই

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এর আগে জুলাইযোদ্ধাদের গেজেট প্রকাশের পর তালিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। অভিযোগ ওঠার পর ১৩ জন শহীদ এবং ২১৯ জন আহত জুলাইযোদ্ধার নাম গেজেট থেকে বাতিল করা হয়।

এ ধরনের বিতর্ক পুনরাবৃত্তি এড়াতেই এবার আবেদনকারীদের তথ্য গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে বিস্তারিতভাবে যাচাই করা হয়েছে।

কেন আটকে গেছে অনেক আবেদন

তদন্তে দেখা গেছে, অনেক আবেদনকারী নিজেদের আহত হওয়ার দাবির পক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ দিতে পারেননি।

উদাহরণ হিসেবে মো. নাছির উদ্দিন নামে এক আবেদনকারীর বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি আন্দোলনে আহত হওয়ার দাবি করলেও তার অংশগ্রহণের কোনো ছবি, ভিডিও বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দেখাতে পারেননি। তিনি যে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার দাবি করেছেন, সেই হাসপাতালের নথিতেও তার আহত রোগী হিসেবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তিনি সেখানে সহকারী প্লাম্বার হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং আহতদের চিকিৎসাসেবায় সহযোগিতা করেছিলেন।

একইভাবে মো. রিফাত ইসলাম নামে আরেক আবেদনকারীর ক্ষেত্রেও আহত হওয়ার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা নেননি এবং পরে যে ফার্মেসি থেকে চিকিৎসা নেওয়ার দাবি করেন, সেই প্রতিষ্ঠানেরও অস্তিত্বের প্রমাণ মেলেনি। তদন্তে তার বিরুদ্ধে অন্য একটি মামলায় সাজাভোগের তথ্যও পাওয়া গেছে।

তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, রিফাত আন্দোলনে আহত হয়েছেন এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তিনি অন্য কোনো ঘটনায় আহত হয়ে থাকতে পারেন।

শহীদকে আহত দেখিয়ে আবেদন

তদন্তে আরও একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ধরা পড়ে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ মো. আরাফাত হুসাইনের নাম ইতোমধ্যে শহীদের গেজেটে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কিন্তু পরে তার নামেই আবার আহত জুলাইযোদ্ধা হিসেবে আবেদন করা হয়। তদন্তে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর আবেদনটি বাতিল করা হয়েছে।

যেভাবে যাচাই করা হয়েছে আবেদন

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আবেদনকারীদের পরিচয়, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন, ঠিকানা, পেশা, পূর্বে গেজেটভুক্ত হওয়ার তথ্য, মামলা, সাক্ষ্য, ছবি, ভিডিও, সংবাদ প্রতিবেদন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য এবং হাসপাতালের চিকিৎসা নথি যাচাই করেছেন। পাশাপাশি চিকিৎসকদের বক্তব্য ও অন্যান্য দালিলিক তথ্যও পরীক্ষা করা হয়েছে।

তদন্তে যুক্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আবেদনকারীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে। বিভাগের ৫৮২টি আবেদনের মধ্যে শুধু ঢাকা জেলা থেকেই এসেছে ৩৩৯টি আবেদন। সবচেয়ে কম আবেদন এসেছে ময়মনসিংহ বিভাগ থেকে, যেখানে আবেদন সংখ্যা মাত্র পাঁচটি।

পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামাল বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া আবেদনগুলো যাচাই করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। যেসব আবেদনে অসংগতি পাওয়া গেছে, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

বর্তমান গেজেট ও সুযোগ-সুবিধা

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার পর্যন্ত জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ৮৪৩ জন শহীদ এবং আহত তিন শ্রেণিতে মোট ১৪ হাজার ৩৭০ জনের গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে অতি গুরুতর আহত (ক শ্রেণি) ৯৯০ জন, গুরুতর আহত (খ শ্রেণি) ১ হাজার ৪১৭ জন এবং আহত (গ শ্রেণি) ১১ হাজার ৯৬৩ জন রয়েছেন।

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি শহীদ পরিবারের জন্য সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ৩০ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ১০ লাখ টাকা ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে এবং অবশিষ্ট ২০ লাখ টাকা দেওয়ার কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি তারা মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছেন এবং ঢাকায় আবাসনের জন্য একটি ফ্ল্যাট প্রকল্পও বাস্তবায়নাধীন।

আহত জুলাইযোদ্ধাদের মধ্যে ক শ্রেণির জন্য এককালীন পাঁচ লাখ টাকা ও মাসিক ২০ হাজার টাকা, খ শ্রেণির জন্য তিন লাখ টাকা ও মাসিক ১৫ হাজার টাকা এবং গ শ্রেণির জন্য এক লাখ টাকা ও মাসিক ১০ হাজার টাকা ভাতার ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া তাদের জন্য প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের বিভিন্ন সুবিধাও রাখা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিশাখার যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ ফারুক হোসেন বলেন, প্রকৃত আহত ব্যক্তিরাই যেন জুলাইযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পান, সেটি নিশ্চিত করতেই গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে বিস্তারিত তদন্ত করা হয়েছে। কোনো ভুয়া আবেদনকারী যাতে গেজেটভুক্ত হতে না পারেন, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, নতুন আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই শেষে পর্যায়ক্রমে গেজেট প্রকাশ করা হবে। প্রকৃত জুলাইযোদ্ধাদের স্বীকৃতি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে কোনো বিতর্ক এড়াতেই যাচাই প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এই শাখার আরও খবর

এআই নিয়ন্ত্রণে কঠোর নিরাপত্তা চান জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভবিষ্যতে মানবজাতির জন্য অস্তিত্বগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক। উন্নত এআই ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে…

১৬ দেশের কর্মীদের জন্য খুলছে ডেনমার্কের দুয়ার

বিদেশি কর্মীদের জন্য নতুন একটি অভিবাসন পথ চালু করতে যাচ্ছে ডেনমার্ক। আগামী ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে নতুন এই ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এর আওতায়…

ঢাবিতে চালু হলো শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য একটি অনলাইন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। duevaluation.com নামের এই প্ল্যাটফর্মে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবেন। মূল্যায়নকারী শিক্ষার্থীর…

ডেঙ্গুতে এক সপ্তাহে প্রাণ হারালেন ২৪ জন

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১…

নতুন বাসায় ওঠার পরদিনই হিন্দু চিকিৎসকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

সিলেট নগরীর মির্জাজাঙ্গাল এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে পদ্মজিৎ চক্রবর্তী প্রান্ত (৩১) নামে এক শিক্ষানবিশ চিকিৎসকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নতুন বাসায় ওঠার পরদিনই…

‘ঘৃণা নয়, শুদ্ধ সাত্ত্বিক প্রেমই আরএসএসের ভিত্তি’: লন্ডনে মোহন ভাগবত

লন্ডনে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) কাজের মূল দর্শন তুলে ধরে সংগঠনটির সরসংঘচালক মোহন ভাগবত বলেছেন, তীব্র ঘৃণা নয়, ‘শুদ্ধ সাত্ত্বিক প্রেম’ই আরএসএসের কর্মকাণ্ডের ভিত্তি। পারস্পরিক…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au