বাংলাদেশ

বৃষ্টি-বন্যার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা, সমালোচনার মুখে শিক্ষামন্ত্রী

দুর্ভোগে শিক্ষার্থী-অভিভাবক

  • 4:29 pm - July 14, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৭৩ বার
বৃষ্টি-বন্যার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৪ জুলাই- টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যার মধ্যেই চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন দেশের বিভিন্ন এলাকার পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা। কোথাও কোমরসমান পানি পেরিয়ে, কোথাও নৌকায়, আবার কোথাও ভ্যান বা অন্য যানবাহনে করে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। অনেকেই ভেজা পোশাক, ভেজা জুতা-মোজা এবং ভেজা প্রবেশপত্র নিয়েই তিন ঘণ্টার পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন।

প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও পরীক্ষা স্থগিত না করায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড এবং আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। এমনকি শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবিও তুলেছেন অনেকে।

লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে অনেক জেলা প্লাবিত হয়েছে এবং সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সোমবার দেশের অধিকাংশ শিক্ষা বোর্ডে পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

তবে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন বন্যাকবলিত পাঁচ জেলার পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। অন্যদিকে আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র, হিসাববিজ্ঞান প্রথম পত্র এবং যুক্তিবিদ্যা প্রথম পত্রের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

পানির মধ্যে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার দুর্ভোগ

সোমবার ভোর থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টি শুরু হয়। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে জলাবদ্ধতা। কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন জেলার অনেক শিক্ষার্থী পানির মধ্যে হেঁটে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছান।

কেউ স্বজনদের হাত ধরে, কেউ সহপাঠীদের সহযোগিতায়, আবার কেউ নৌকা বা বিকল্প যানবাহনে করে কেন্দ্রে যান। অনেক পরীক্ষার্থী কেন্দ্রে পৌঁছানোর পরও ভেজা অবস্থায় পরীক্ষার হলে বসতে বাধ্য হন।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ কেন্দ্রের এক অভিভাবক বলেন, তার মেয়ে পুরো শরীর ভিজিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশ করেছে। এমন অবস্থায় তিন ঘণ্টা পরীক্ষা দেওয়া কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

আরেক অভিভাবক বলেন, সন্তানরা মানসিক চাপ ও আতঙ্কের মধ্যে পরীক্ষা দিয়েছে। পরীক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়নি।

শিক্ষামন্ত্রীর ফেসবুক পেজে সমালোচনার ঝড়

বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে এটিকে অমানবিক সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেছেন।

চিকিৎসক ও সামাজিক কর্মী সাদিকুর রহমান সাদাব এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, আবহাওয়ার আগাম সতর্কতা থাকার পরও এইচএসসি পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত অমানবিক।

লেখক সাদমান আব্দুল্লাহ মন্তব্য করেন, এই সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক পর্যায়ের ব্যক্তিরা সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে দ্রুত পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

শিক্ষাবিদদের উদ্বেগ

শিক্ষাবিদরাও এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, একজন শিক্ষার্থী কোমরপানি পার হয়ে পরীক্ষা দেবে, আর অন্যজন স্বাভাবিক পরিবেশে পরীক্ষা দেবে, এটি কোনোভাবেই সমতাভিত্তিক মূল্যায়ন হতে পারে না।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকলে পরিস্থিতি অনুযায়ী আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব ছিল।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, প্রতি বর্ষায় একই ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। তাই দীর্ঘমেয়াদে পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি পুনর্বিবেচনা এবং দুর্যোগকালীন শিক্ষা ব্যবস্থাপনার জন্য জাতীয় পরিকল্পনা প্রয়োজন।

পরীক্ষা চালু রাখা নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

সমালোচনার মধ্যে শিক্ষা বোর্ড কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম ছাড়া অন্য কোনো জেলার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরীক্ষা স্থগিতের প্রয়োজনীয়তা জানানো হয়নি।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, দুর্যোগ পরিস্থিতির কারণে পরীক্ষা স্থগিতের বিষয়টি বিবেচনায় ছিল। তবে কোন কোন এলাকায় পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়, সে বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে স্পষ্ট তথ্য না পাওয়ায় পূর্বঘোষিত সূচি বহাল রাখা হয়।

তবে কুমিল্লা সদর উপজেলার ইউএনও ফাতেমা তুজ জোহরা বলেন, পরীক্ষা স্থগিত বা কেন্দ্র পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত শিক্ষা বোর্ডের বিষয়। ভোরের পর জলাবদ্ধতা তৈরি হলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের ব্যাখ্যা

বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যেও পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে রাতে বিবৃতি দিয়েছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি।

বিবৃতিতে বলা হয়, প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা আয়োজন নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগের বিষয়টি তারা উপলব্ধি করছে।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন বন্যাকবলিত এলাকাগুলোর পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের অধিকাংশ পরীক্ষাকেন্দ্র কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী রয়েছে। জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে পরীক্ষার পরিবেশ রয়েছে বলে প্রতিবেদন পাওয়ার পর পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।

কুমিল্লায় কেন্দ্র পরিবর্তন

কুমিল্লায় মাত্র তিন ঘণ্টায় ১০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের কারণে বিভিন্ন এলাকা পানিতে ডুবে যায়। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, ভাষাসৈনিক অজিত গুহ কলেজসহ কয়েকটি পরীক্ষাকেন্দ্রে পানি ঢুকে পড়ে।

সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের পরীক্ষার্থীরা জানান, জলাবদ্ধতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি।

কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মহসিন জানান, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের এক হাজার ৩০৯ জন পরীক্ষার্থী সেখানে পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। নিচতলার কক্ষে পানি ঢুকে পড়ায় শিক্ষার্থীদের ওপরের তলায় সরিয়ে নেওয়া হয়।

কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহসান পারভেজ জানান, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ওই কেন্দ্র ভাষাসৈনিক অজিত গুহ মহাবিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা টিপু জানান, পরীক্ষার্থীদের নিরাপদে কেন্দ্রে যাতায়াতে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা নৌকা নিয়ে সহায়তা করেছেন।

বন্যা ও ভারী বৃষ্টির মধ্যে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক এখন শিক্ষা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং দুর্যোগকালীন পরীক্ষাব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

এই শাখার আরও খবর

শেষবার কি ছেলেকে দেখে যেতে পারবেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মা?

দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ শ্রীচিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর মা বর্তমানে চট্টগ্রামের মা ও শিশু হাসপাতালে অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন। ছেলের কারাবন্দি জীবনের প্রায় দুই বছর পার…

বাংলাদেশে সার নিয়ে আসলে কী চলছে?

আমন মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষক। কোথাও সার পাওয়া যাচ্ছে না, কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।…

ডেঙ্গুতে এ বছর একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১,৫৭১

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার…

গোপালগঞ্জে কনসার্টে শেখ হাসিনার পক্ষে স্লোগান, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আয়োজক গ্রেপ্তার

গোপালগঞ্জ পৌর পার্কে কনসার্ট আয়োজনের আগে পুলিশের অনুমতি না নেওয়া এবং অনুষ্ঠান চলাকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে স্লোগান দেওয়ার ঘটনায় এফএনএফ কনভেনশন হল অ্যান্ড…

বেদখল হচ্ছে ঝিলংজা কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানের জায়গা, ক্ষুব্ধ সনাতন ধর্মাবলম্বীরা

কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানের জায়গা দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শ্মশানসংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারীদের কেউ কেউ নিজেদের বসতি সম্প্রসারণের জন্য শ্মশানের…

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সময় সঙ্গে থাকতে পারেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দেশে ফেরার সময় তাঁর সঙ্গে একদল আন্তর্জাতিক স্বাধীন পর্যবেক্ষককে রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au