বাংলাদেশ

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা

বিএনপি সরকারের কূটনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তুললেন ভারতীয় বিশ্লেষক

  • 2:16 pm - July 15, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৭৯ বার
ছবি: সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৫ জুলাই-  ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বর্তমান অবস্থান, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি সরকারের কূটনৈতিক কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভারতের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বিশ্লেষক ভারত ভূষণ। তার মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার যদি নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের অমীমাংসিত বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ না নেয়, তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উভয় ক্ষেত্রেই মূল্য দিতে হতে পারে। তবে তিনি একই সঙ্গে স্বীকার করেছেন, বর্তমান সরকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে।

ভারতের দৈনিক ডেকান ক্রনিকল-এ প্রকাশিত এক মতামতধর্মী নিবন্ধে ভারত ভূষণ লিখেছেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর দুই দেশের মধ্যে একটি ইতিবাচক অধ্যায় শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছিল। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শপথ অনুষ্ঠানে সেই আমন্ত্রণ পৌঁছে দেন ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের অংশগ্রহণকেও ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হয়েছিল।

তবে লেখকের দাবি, কয়েক মাসের মধ্যেই সেই ইতিবাচক পরিবেশ অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। তিনি উল্লেখ করেন, ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী দায়িত্ব নেওয়ার পর এখনো বাংলাদেশের কোনো মন্ত্রীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের আবেদনও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। একই সঙ্গে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য ভারতকে নয়, মালয়েশিয়া এবং পরে চীনকে বেছে নেওয়াকেও তিনি দুই দেশের সম্পর্কের নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

নিবন্ধে সাম্প্রতিক কয়েকটি কূটনৈতিক ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বাংলাদেশি অভিবাসীদের নিয়ে মন্তব্যের পর এবং পশ্চিমবঙ্গে অবৈধ অভিবাসনবিরোধী পদক্ষেপের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কর্তৃক ভারতীয় কূটনীতিকদের তলব। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে দিল্লি বিমানবন্দরে আটকে রাখার ঘটনায় বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারত ভূষণের মতে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতের অবস্থান এবং সেখান থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টিও এখনো দুই দেশের মধ্যে একটি সংবেদনশীল ইস্যু। পাশাপাশি গঙ্গা পানিচুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে এলেও নতুন চুক্তি নিয়ে অগ্রগতি না হওয়া এবং তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি ঝুলে থাকার বিষয়টি সম্পর্কের জটিলতা আরও বাড়িয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিশ্লেষণে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। লেখকের মতে, তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ ভারতের জন্য কৌশলগত উদ্বেগের কারণ। কারণ প্রকল্পটি ভারতের গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডরের কাছাকাছি অবস্থিত। একইভাবে মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততাও ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়িত হলে বঙ্গোপসাগরে চীনের প্রভাব আরও বাড়বে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মাধ্যমে ইউনান প্রদেশকে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে বাণিজ্যের পাশাপাশি কৌশলগত গুরুত্বও পেতে পারে বলে মত প্রকাশ করেছেন তিনি।

এছাড়া বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ‘টু প্লাস টু’ কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সংলাপ চালুর উদ্যোগ এবং বাংলাদেশের সম্ভাব্য জে-১০সিই বহুমুখী যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনাকেও তিনি ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব উদ্যোগ চীন ও বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও গভীর করতে পারে।

ভারত ভূষণ আরও উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে চীন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ত্রিপক্ষীয় সংলাপ এবং তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টিও ভারতের কৌশলগত বিশ্লেষণে গুরুত্ব পাচ্ছে। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে এখনো গোয়েন্দা বা সামরিক জোট গঠনের কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই এবং সম্পর্ক মূলত কূটনৈতিক ও সহযোগিতামূলক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ।

নিবন্ধের শেষাংশে লেখক মত দেন, তারেক রহমান সরকার হয়তো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের অগ্রগতি না হলে চিকিৎসা সেবা, বাণিজ্য, ট্রানজিট, পানিবণ্টনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে এককভাবে চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে তার কৌশলগত বিকল্প সংকুচিত হতে পারে।

 

এই শাখার আরও খবর

২০১৬ সালের পানামা পেপার্স: কী ছিল সেই চাঞ্চল্যকর ফাঁসে?

২০১৬ সালে বিশ্বের ২ লাখ ১৪ হাজার ব্যক্তির টাকা পাচারের নথি প্রমাণ সহ ফাঁস করে দিয়েছিলো পানামা পেপার্স।১১.৫ মিলিয়নের এই নথিতে নাম ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী…

জলবায়ু পরিবর্তনে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকিতে, দুর্ভিক্ষের শঙ্কা

ভাস্কর দত্ত :  জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে খাদ্যনিরাপত্তা ক্রমেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও বাস্তুচ্যুতির কারণে জীবিকা হারাচ্ছেন উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর…

রিপাবলিকানদের নির্বাচনী পরাজয়ের জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করলেন ভ্যান্স

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর দাবি, যুদ্ধ নিয়ে হতাশা ও ক্ষোভের…

জলবায়ু ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ৬ পদক্ষেপ, বছরে বাঁচতে পারে ১৬ লাখ প্রাণ

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ছয়টি কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে বছরে প্রায় ১৬ লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। একই সঙ্গে কার্বন…

বার্সেলোনার বড় ধাক্কা, এক মাস মাঠের বাইরে রদ্রি

চোটের কারণে প্রায় এক মাসের জন্য মাঠের বাইরে ছিটকে যেতে পারেন বার্সেলোনার স্প্যানিশ মিডফিল্ডার রদ্রি। ডান পায়ের হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ম্যাচে তাঁকে পাচ্ছে…

বিশ্ব কি ঘুমের ঘোরে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাড়ছে অস্থিরতা, শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে তীব্র হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। একের পর এক সংঘাত, সামরিক শক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মের প্রতি অবজ্ঞা বিশ্বব্যবস্থাকে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au