নতুন হামলার জেরে হরমুজ প্রণালিতে কমেছে জাহাজ চলাচল
মেলবোর্ন, ২২ জুলাই: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে হামলার পর নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আরও…
মেলবোর্ন, ১৫ জুলাই- ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বর্তমান অবস্থান, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি সরকারের কূটনৈতিক কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভারতের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বিশ্লেষক ভারত ভূষণ। তার মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার যদি নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের অমীমাংসিত বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ না নেয়, তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উভয় ক্ষেত্রেই মূল্য দিতে হতে পারে। তবে তিনি একই সঙ্গে স্বীকার করেছেন, বর্তমান সরকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে।
ভারতের দৈনিক ডেকান ক্রনিকল-এ প্রকাশিত এক মতামতধর্মী নিবন্ধে ভারত ভূষণ লিখেছেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর দুই দেশের মধ্যে একটি ইতিবাচক অধ্যায় শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছিল। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শপথ অনুষ্ঠানে সেই আমন্ত্রণ পৌঁছে দেন ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের অংশগ্রহণকেও ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হয়েছিল।
তবে লেখকের দাবি, কয়েক মাসের মধ্যেই সেই ইতিবাচক পরিবেশ অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। তিনি উল্লেখ করেন, ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী দায়িত্ব নেওয়ার পর এখনো বাংলাদেশের কোনো মন্ত্রীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের আবেদনও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। একই সঙ্গে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য ভারতকে নয়, মালয়েশিয়া এবং পরে চীনকে বেছে নেওয়াকেও তিনি দুই দেশের সম্পর্কের নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
নিবন্ধে সাম্প্রতিক কয়েকটি কূটনৈতিক ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বাংলাদেশি অভিবাসীদের নিয়ে মন্তব্যের পর এবং পশ্চিমবঙ্গে অবৈধ অভিবাসনবিরোধী পদক্ষেপের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কর্তৃক ভারতীয় কূটনীতিকদের তলব। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে দিল্লি বিমানবন্দরে আটকে রাখার ঘটনায় বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারত ভূষণের মতে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতের অবস্থান এবং সেখান থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টিও এখনো দুই দেশের মধ্যে একটি সংবেদনশীল ইস্যু। পাশাপাশি গঙ্গা পানিচুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে এলেও নতুন চুক্তি নিয়ে অগ্রগতি না হওয়া এবং তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি ঝুলে থাকার বিষয়টি সম্পর্কের জটিলতা আরও বাড়িয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিশ্লেষণে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। লেখকের মতে, তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ ভারতের জন্য কৌশলগত উদ্বেগের কারণ। কারণ প্রকল্পটি ভারতের গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডরের কাছাকাছি অবস্থিত। একইভাবে মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততাও ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়িত হলে বঙ্গোপসাগরে চীনের প্রভাব আরও বাড়বে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মাধ্যমে ইউনান প্রদেশকে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে বাণিজ্যের পাশাপাশি কৌশলগত গুরুত্বও পেতে পারে বলে মত প্রকাশ করেছেন তিনি।
এছাড়া বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ‘টু প্লাস টু’ কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সংলাপ চালুর উদ্যোগ এবং বাংলাদেশের সম্ভাব্য জে-১০সিই বহুমুখী যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনাকেও তিনি ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব উদ্যোগ চীন ও বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও গভীর করতে পারে।
ভারত ভূষণ আরও উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে চীন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ত্রিপক্ষীয় সংলাপ এবং তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টিও ভারতের কৌশলগত বিশ্লেষণে গুরুত্ব পাচ্ছে। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে এখনো গোয়েন্দা বা সামরিক জোট গঠনের কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই এবং সম্পর্ক মূলত কূটনৈতিক ও সহযোগিতামূলক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ।
নিবন্ধের শেষাংশে লেখক মত দেন, তারেক রহমান সরকার হয়তো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের অগ্রগতি না হলে চিকিৎসা সেবা, বাণিজ্য, ট্রানজিট, পানিবণ্টনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে এককভাবে চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে তার কৌশলগত বিকল্প সংকুচিত হতে পারে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au