ফ্রান্সে ভয়াবহ দাবানল, সরানো হলো ২০ হাজার মানুষ।ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৪ জুলাই: ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ভয়াবহ দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় অন্তত ২০ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দেশটির গিরন্দ অঞ্চলে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় ৭০০ দমকলকর্মী দিনরাত কাজ করছেন। তীব্র গরম, শুষ্ক আবহাওয়া এবং শক্তিশালী বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত বিস্তার লাভ করায় পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, আর্কাশোঁ উপসাগর সংলগ্ন এলাকায় ইতোমধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ হেক্টর বনভূমি ও আশপাশের এলাকা পুড়ে গেছে। আগুনের ঝুঁকি আরও বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত ৮ হাজার ৮০০ বাসিন্দাকে এলাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাতের মধ্যে যাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের বড় একটি অংশ ছিলেন লেজ-ক্যাপ-ফেরে উপদ্বীপের বিভিন্ন ক্যাম্পসাইটে অবস্থান করা পর্যটক।
গিরন্দ অঞ্চলের প্রশাসনিক প্রধান সোফি ব্রোকা জানান, নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া মানুষের মধ্যে প্রায় ১০ হাজারই পর্যটক। তিনি বলেন, আর্কাশোঁ উপসাগরের তীরবর্তী ক্লাউয়ে গ্রাম থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে ঝুঁকিপূর্ণ বনাঞ্চল, পর্যটন এলাকা এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
গিরন্দ দমকল বিভাগের প্রধান মার্ক ভেরমেউলেন বলেন, দমকলকর্মীদের সারা রাত নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে হয়েছে। তার ভাষায়, তাপমাত্রা বাড়ার পাশাপাশি বাতাসের গতিও বেড়ে যাওয়ায় আগুনের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে এবং পরিবর্তনশীল বাতাসের কারণে আগুন কোন দিকে ছড়িয়ে পড়বে তা অনুমান করা কঠিন। তাই কোনো ধরনের সতর্কতা শিথিল করার সুযোগ নেই।
এর আগে সপ্তাহের শুরুতে বোর্দো বিমানবন্দরের কাছাকাছি আরেকটি দাবানল নিয়ন্ত্রণে কাজ করার সময় দুই দমকলকর্মীর মৃত্যু হয়। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ শোক প্রকাশ করেছেন এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
উপকূলীয় শহর ল্য পোর্জ-এর ১৯ বছর বয়সী বাসিন্দা ইয়াসমিনা দে ফ্রেইতাস জানান, বুধবার দুপুরে তিনি প্রথম ধোঁয়া ও পোড়া গন্ধ টের পান। বিকেলের দিকে আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় এবং পরে ছাই ও আধাপোড়া গাছের বাকল পড়তে শুরু করে। রাতের দিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের পরিবারকে দ্রুত পাশের একটি শহরের জিমনেশিয়ামে সরিয়ে নেয়। তাড়াহুড়োর কারণে তারা নিজেদের দুটি বিড়াল ও চারটি মুরগি রেখে যেতে বাধ্য হন। তিনি বলেন, আগুনের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগে পুরো রাত তার ঘুম হয়নি।
এর দক্ষিণাঞ্চলীয় উপস্থাপক জো কেন্ট, যিনি ওই এলাকার একটি ক্যাম্পসাইটে অবস্থান করছেন, জানান যে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন অনেক পর্যটক ইতোমধ্যেই এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। সাধারণ সময়ে যানজটে ভরা প্রধান সড়ক এখন প্রায় ফাঁকা, এমনকি স্থানীয় সুপারমার্কেটগুলোতেও অস্বাভাবিক নীরবতা বিরাজ করছে।
ফ্রান্সের পাশাপাশি ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশেও দাবানল ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইতালির সিসিলি দ্বীপে আগুন নেভানোর সময় দমকলকর্মী আলেসান্দ্রো মার্কি নিহত হয়েছেন। সান কাতালদো এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রাণ হারান। ইতালির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ান্তেদোসি তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করতে গিয়েই তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। সিসিলির আঞ্চলিক নেতা রেনাতো শিফানি আহত আরেক দমকলকর্মীর দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন।
সিসিলির সিভিল প্রোটেকশন বিভাগের প্রধান সালভো কুচিনা জানান, দ্বীপজুড়ে ৩৫০টিরও বেশি দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১০টি বড় আকারের। এসব আগুনের কারণে বহু মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তার মতে, অধিকাংশ দাবানলের পেছনেই মানুষের কর্মকাণ্ড দায়ী এবং এটি এখন শুধু পরিবেশগত নয়, সামাজিক ও আইন-শৃঙ্খলার সমস্যায়ও পরিণত হয়েছে।
স্পেনেও দাবানলের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। রাজধানী মাদ্রিদের পশ্চিমে আলদেয়া দেল ফ্রেসনো এলাকার প্রায় ৩ হাজার ৫০০ বাসিন্দাকে ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বলা হয়েছে। মাদ্রিদের দক্ষিণের আলমোরক্স গ্রাম থেকেও বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। যদিও কিছু মানুষ ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন, কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে আগুন এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সেখানে প্রায় ৮৯০ হেক্টর এলাকা পুড়ে গেছে।
স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছে। দেশটির গুয়াদালাহারা অঞ্চলে এ বছরের সবচেয়ে বড় দাবানলে ৩৫ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে গেছে। ইউরোপীয় বন আগুন তথ্য ব্যবস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত স্পেনে দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ২০২৫ সালের পুরো বছরের তুলনায়ও বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই দাবানলের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। কোপার্নিকাস জলবায়ু পরিবর্তন পরিষেবা জানিয়েছে, ইউরোপ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশগুলোর একটি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মহাদেশটির অধিকাংশ অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। সংস্থাটির মতে, গত বছর ইউরোপে দাবানলে পুড়ে যাওয়া জমির পরিমাণ এবং আগুন থেকে নির্গত দূষণের মাত্রা ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
সুত্রঃ বিবিসি