অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়াভিত্তিক রেডিও উপস্থাপক ক্রিস্টি হেইস।ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৭ জুলাই: অস্ট্রেলিয়ার সাবেক টেলিভিশন অভিনেত্রী, জনপ্রিয় রেডিও উপস্থাপক এবং গার্হস্থ্য সহিংসতার একজন বেঁচে ফেরা ভুক্তভোগী ক্রিস্টি হেইস, ওয়ান নেশন নেত্রী পলিন হ্যানসনের সাম্প্রতিক মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার নারীদের উদ্দেশে “সহ্য না করে চলে যাওয়া উচিত” বলা বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এবং ভুক্তভোগীদের সংগ্রামকে খাটো করে দেখার শামিল।
অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়াভিত্তিক রেডিও উপস্থাপক ক্রিস্টি হেইস বলেন, সহিংস সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা কখনোই সহজ নয়। হুমকি, মানসিক নির্যাতন, জবরদস্তি এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকা একজন নারীর জন্য ঘর ছেড়ে চলে যাওয়া শুধু একটি সিদ্ধান্ত নয়, বরং জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, অতীতে তিনি এমন একটি সম্পর্কে ছিলেন যেখানে তাকে আর্থিক ও মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। নিরাপদে বেরিয়ে আসতে তাকে হাজার হাজার ডলার ঋণ করতে হয়েছে। তিনি নিজেকে “ভাগ্যবানদের একজন” উল্লেখ করে বলেন, তার ব্যাংক ঋণ নেওয়ার সুযোগ, ক্রেডিট কার্ড এবং দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা ছিল বলেই তিনি নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন। অনেক নারীর সেই সুযোগও থাকে না।
বিতর্কের সূত্রপাত হয় গত বুধবার, যখন অস্ট্রেলিয়ার সামাজিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান অ্যাংলিকেয়ার গার্হস্থ্য সহিংসতা থেকে বেরিয়ে আসার ব্যয় নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, গত এক দশকে নির্যাতনের শিকার একজন নারীর নিরাপদে নতুন জীবন শুরু করতে যে ব্যয় লাগে, তা ৭১ শতাংশ বেড়েছে।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওয়ান নেশন নেত্রী পলিন হ্যানসন বলেন, “যদি কোনো নারী নিজেকে বাড়িতে নিরাপদ মনে না করেন, তাহলে তার সেই পরিস্থিতি মেনে নেওয়া উচিত নয়।”
পরে পলিন হ্যানসন স্পষ্ট করে বলেন, তিনি গার্হস্থ্য সহিংসতাকে সমাজের একটি “ভয়াবহ অভিশাপ” বলে মনে করেন। তবে তার আগের মন্তব্যটি অনেকেই এমনভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, তিনি যেন নির্যাতনের শিকার নারীদের জন্য ঘর ছেড়ে চলে যাওয়াকে খুব সহজ বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন।

ওয়ান নেশনের নেতা পলিন হ্যানসন। ছবিঃ সংগৃহীত
এই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ক্রিস্টি হেইস বলেন, “এটি ভয়ঙ্কর অজ্ঞতাপূর্ণ মন্তব্য। আমি যখন শুনলাম তিনি বলছেন, ‘সহ্য করো না’, তখন মনে হয়েছে তিনি কতটা সুবিধাপ্রাপ্ত অবস্থান থেকে কথা বলছেন। বাস্তবতা এত সহজ নয়।”
তিনি আরও বলেন, “সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, সমালোচনার পরও তিনি নিজের বক্তব্য থেকে সরে আসেননি। অনেক নারী আর্থিকভাবে নির্যাতকের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। অনেকেই সন্তান, আইনি জটিলতা, নিরাপত্তাহীনতা কিংবা বাসস্থানের অভাবে সম্পর্ক ছাড়তে পারেন না।”
গার্হস্থ্য সহিংসতা নিয়ে সচেতনতা তৈরির কাজের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকা হেইস জানান, রেডিও উপস্থাপক হিসেবে তিনি হাজারো নারীর অভিজ্ঞতা শুনেছেন। অনেকেই তাকে জানিয়েছেন, নির্যাতনের সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে না পারার পেছনে বড় কারণ হলো অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সন্তানের ভবিষ্যৎ, আইনজীবীর খরচ এবং নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব।
অ্যাংলিকেয়ারের ‘কস্ট অব লিভিং রিপোর্ট’ অনুযায়ী, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় একজন নারীর গার্হস্থ্য সহিংসতার সম্পর্ক ছেড়ে নতুন জীবন শুরু করতে গড়ে ৭ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলারেরও বেশি ব্যয় হয়, যা ১০ বছর আগের তুলনায় ২ হাজার ডলারের বেশি বেশি। বাসা ভাড়া, নতুন বাসস্থানের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, সন্তানদের খরচ এবং পোষা প্রাণীর দেখভালের মতো ব্যয়ও এই খরচের অংশ।
অ্যাংলিকেয়ারের ‘রিলেশনশিপস অ্যান্ড ওয়েলবিয়িং’ বিভাগের প্রধান ক্লেয়ার ডানলপ বলেন, গার্হস্থ্য সহিংসতার আলোচনায় শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির বিষয়টি গুরুত্ব পেলেও আর্থিক বাস্তবতা প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। অথচ অর্থনৈতিক নির্যাতন অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিন ধরে ভুক্তভোগীদের আটকে রাখে।
তিনি বলেন, “প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, ‘তিনি কেন চলে যান না?’ বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘কী কারণে তিনি চলে যেতে পারছেন না?'”
প্রতিবেদনে গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের জন্য সরকারি আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি, অস্থায়ী ও স্থায়ী আবাসনের সংখ্যা বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার ‘লিভিং ভায়োলেন্স প্রোগ্রাম’-এর আওতায় সর্বোচ্চ ৫ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার সহায়তা দেওয়া হলেও, অ্যাংলিকেয়ার সেটি বাড়িয়ে অন্তত ৭ হাজার ডলার করার আহ্বান জানিয়েছে।
ক্রিস্টি হেইসের মতে, বর্তমান ব্যবস্থায় অনেক সময় ভুক্তভোগীদেরই অপরাধীদের তুলনায় বেশি বাধার মুখে পড়তে হয়। তাই তিনি ভাড়াটিয়াদের অধিক সুরক্ষা, সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের জন্য আরও কার্যকর সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় চলতি বছর ইতোমধ্যে ৩৮ জন নারী হত্যার শিকার হয়েছেন। আগের দুই বছরে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৭৯ ও ১০৬। তার ভাষায়, “এটি একটি গুরুতর জাতীয় সংকট। শুধু ‘চলে যাও’ বললেই সমস্যার সমাধান হয় না; ভুক্তভোগীদের নিরাপদে নতুন জীবন শুরু করার বাস্তব সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।”