গ্যাস সংকটে উৎপাদন নেমে অর্ধেকে, কয়েক শ কারখানা বন্ধ । ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৬ আগষ্ট- বাংলাদেশে চলমান গ্যাস সংকটকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অন্যতম বড় সংকট হিসেবে উল্লেখ করে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এটি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনার ফল নয়; বরং নীতিগত ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ধারাবাহিক সিদ্ধান্ত দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে এবং এরই ফল এখন ভোগ করছে শিল্প, কৃষি ও সাধারণ মানুষ।
ভারতের নর্থইস্ট নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্যাস সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে পোশাক শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অনেক প্রতিষ্ঠান অর্ডার বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। হাজার হাজার শ্রমিক কর্মসংস্থান হারাচ্ছেন। একই সঙ্গে দেশজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে এবং দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং দেখা দিচ্ছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র থেকে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০১৭ সালে দেশে সর্বোচ্চ প্রায় ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলেও এরপর থেকে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমেছে।
এই ঘাটতি পূরণে আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি শুরু করে। কাতার এনার্জি, ওমানের ওকিউ ট্রেডিং এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি করা হয়। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কেনা হতো।
আমদানিকৃত এলএনজি মহেশখালীর উপকূলে স্থাপিত দুটি ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) থেকে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হতো। এর একটি পরিচালনা করে এক্সিলারেট এনার্জি এবং অন্যটি সামিট গ্রুপ। দুটি টার্মিনাল মিলিয়ে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সক্ষমতা ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট পরিচালিত এফএসআরইউতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ ও যন্ত্রপাতির গুরুত্বপূর্ণ কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে টার্মিনালটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এতে আমদানিকৃত এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে নেমে মাত্র ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়ায়।
ফলে বর্তমানে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা দৈনিক চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক। এতে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কৃষি খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অগ্নিকাণ্ডটি একটি দুর্ঘটনা হলেও এটিকে জাতীয় সংকটে পরিণত করেছে সরকারের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ২০২৪ সালের মার্চে আওয়ামী লীগ সরকার সামিট গ্রুপের সঙ্গে তৃতীয় একটি এফএসআরইউ স্থাপনের চুক্তি করেছিল। এই টার্মিনাল চালু হলে প্রতিদিন আরও প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতো।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামিট গ্রুপ প্রয়োজনীয় জাহাজ ক্রয়, চীনে রূপান্তর কাজের ডকইয়ার্ড নিশ্চিত এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও সংগ্রহ করেছিল। ২০২৪ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে স্থাপন কাজ শুরু হয়ে ২০২৫ সালের এপ্রিলের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ওই চুক্তি বাতিল করে। সরকারের যুক্তি ছিল, তৃতীয় এফএসআরইউর প্রয়োজন নেই এবং চুক্তি প্রক্রিয়া ও সামিটের কারিগরি সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সামিট ২০১৯ সাল থেকেই সফলভাবে একটি এফএসআরইউ পরিচালনা করছে এবং বর্তমানে সেটিই আমদানিকৃত গ্যাসের একমাত্র ভরসা।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সামিটের সঙ্গে এলএনজি আমদানির আরেকটি চুক্তিও বাতিল করা হয়। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, তৃতীয় এফএসআরইউ না থাকায় অতিরিক্ত এলএনজি আমদানির প্রয়োজন নেই—এই যুক্তিতে সরবরাহ চুক্তিও বাতিল করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এভাবে প্রথমে অতিরিক্ত এলএনজি গ্রহণের অবকাঠামো বাতিল করা হয়, পরে সেই অবকাঠামো না থাকার কারণ দেখিয়ে গ্যাস আমদানির চুক্তিও বাতিল করা হয়। ফলে একটি দুর্ঘটনা পুরো দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে দেয়।
এদিকে গত ২৮ জুলাই তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান গ্যাস সংকটের জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের পরিকল্পনার ঘাটতিকে দায়ী করেছিলেন। তবে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাস্তব চিত্র ভিন্ন। এতে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকার এলএনজি আমদানি শুরু, একাধিক দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, দুটি এফএসআরইউ স্থাপন এবং তৃতীয় টার্মিনালের উদ্যোগ নিয়েছিল। বর্তমান সংকট পরিকল্পনার অভাবে নয়, বরং পূর্বের পরিকল্পনা বাতিল করার ফল।
প্রতিবেদনটিতে আরও দাবি করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে ১৫ বছরের সম্প্রসারিত এলএনজি সরবরাহ চুক্তি করা হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী ২০২৬ সালে ১২টি এবং ১৫ বছরে মোট ২৩২টি এলএনজি কার্গো সরবরাহের কথা ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র দুটি কার্গো সরবরাহের পর কোম্পানিটি হরমুজ প্রণালীর অস্থিতিশীলতার কারণ দেখিয়ে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করে এবং পরবর্তী সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ অবস্থায় গত ২৮ জুলাই সরকার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আরেকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গানভর ইউএসএ এলএলসির সঙ্গে নতুন এলএনজি ক্রয়ের অনুমোদন দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই চুক্তির আওতায় ১৩ বছরে ৭৮টি এলএনজি কার্গো কেনা হবে, যার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। প্রতিবেদনের দাবি, এটি বাজারমূল্যের তুলনায় প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা বেশি।
প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যখন আগের মার্কিন সরবরাহকারী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে, তখন কেন আবার একটি বেসরকারি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এলএনজি যদি মধ্যপ্রাচ্য থেকেই সংগ্রহ করা হয়, তাহলে উৎপাদনকারী দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি চুক্তি না করে মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে কেনা হচ্ছে কেন, সে প্রশ্নও উত্থাপন করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, অল্প কয়েকটি বিদেশি সরবরাহকারীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং পুনর্গ্যাসীকরণ সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ বাতিল করার কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর ফলে শিল্প, কৃষি, বিদ্যুৎ ও সামগ্রিক অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
লেখকঃ আমিনুল হক পলাশ, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক কুটনৈতিক, বাংলাদেশ।
সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ