মেলবোর্ন, ১২ আগষ্ট: সাভারের হেমায়েতপুরের শ্যামপুর এলাকায় একটি চারতলা ভবন ঘিরে অভিযান চালিয়ে পাঁচটি শক্তিশালী হাতবোমা উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সন্ধ্যা থেকে বাড়িটি ঘিরে রাখার পর রাত ১০টার দিকে সেখানে অভিযান শুরু করে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট বা সিটিটিসি। অভিযানে পুলিশের পাশাপাশি র্যাব ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্থানীয় আব্দুল জলিলের মালিকানাধীন ওই ভবনটি মাত্র এক তারিখে ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বাড়িটিতে বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম মজুত রাখা হয়েছে বলে জানতে পারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে বাড়িটি নজরদারিতে এনে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম জানান, কয়েকদিন আগে ওই এলাকায় পাঁচটি ককটেল ও বিস্ফোরকসহ একজনকে আটক করেছিল সিটিটিসি। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই শ্যামপুরের ওই বাড়িতে অভিযান চালানো হয়।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিযান চালানোর সময় বাড়ির একটি অংশে কাপড়-চোপড়ের মধ্যে লুকিয়ে রাখা পাঁচটি বোমার সন্ধান পাওয়া যায়। প্রথমে এগুলোকে বোমাসদৃশ বস্তু মনে করা হলেও পরে সেগুলো শক্তিশালী হাতবোমা বলে নিশ্চিত করা হয়।
বোমা উদ্ধারের পর বাড়ির বাসিন্দা ও আশপাশের এলাকার লোকজনকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেয় পুলিশ। ঘটনাস্থল ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অর্ধশতাধিক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় সন্দেহভাজন একজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই বাড়িতে থাকা বোমা ও অন্যান্য বিস্ফোরক সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ। উদ্ধার করা বিস্ফোরক ও বোমাগুলো নিষ্ক্রিয় করার জন্য বিশেষজ্ঞদের প্রস্তুত রাখা হয়।
সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসব বিস্ফোরক মজুত করে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাইছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সাভারে এই অভিযানের ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় কয়েকটি বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের পর বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। ওই ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গি তৎপরতার সম্ভাব্য বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো বড় সাংগঠনিক কাঠামোর পরিবর্তে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন সেল বা ‘স্লিপার সেল’ গঠন করে কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করছে। এ ধরনের কাঠামোর সদস্যরা আলাদাভাবে কাজ করায় তাদের শনাক্ত করা তুলনামূলক কঠিন হয়ে পড়ে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জনসমাগমস্থলকে লক্ষ্য করে হামলার পরিকল্পনার তথ্যও সামনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জনসমাগমের জায়গাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক তৎপরতায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) পুরোনো নেটওয়ার্ক ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কার্যক্রমও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আব্দুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইয়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রায় দুই দশক পর সংগঠনটির পুরোনো নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে বলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বিভিন্ন সময়ে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া বা সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের একটি অংশ কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আবারও তৎপর হওয়ার চেষ্টা করছে। কেউ কেউ কারাগার থেকে পালিয়েও যায়। তাদের একটি অংশ নতুন সদস্য সংগ্রহ, অর্থের উৎস তৈরি এবং বিস্ফোরক তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, বর্তমান সময়ে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম আগের মতো বড় সাংগঠনিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে না। বরং ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন সেল গঠন করে তারা তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে। ফলে এসব কার্যক্রম শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে।
‘বোমারু মামুন’কে ঘিরে অনুসন্ধান
সম্প্রতি মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে বোমা উদ্ধারের ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে নাজমুল হাসান ওরফে ‘বোমারু মামুন’ নামটিও সামনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
২০১৭ সালের ১৫ আগস্ট রাজধানীর পান্থপথে হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে জঙ্গিদের অবস্থানের ঘটনায়ও বোমারু মামুনের নাম আলোচনায় আসে। ওইদিন সকালে পুলিশ ও সিটিটিসি হোটেলটিতে ‘অপারেশন আগস্ট বাইট’ নামে অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযানের সময় আত্মঘাতী বিস্ফোরণে সাইফুল ইসলাম নামে এক হামলাকারী নিহত হয়। পরবর্তী সময়ে ওই ঘটনায় করা মামলার তদন্তে জঙ্গি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত একাধিক ব্যক্তির নাম উঠে আসে।
২০১৯ সালের ১১ আগস্ট হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনাল-সংক্রান্ত সন্ত্রাসবিরোধী মামলার তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ১৫ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়ার কথা জানায় সিটিটিসি। ওই তদন্তের সূত্র ধরেই ‘বোমারু মামুন’ নামটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গণমাধ্যমে পরিচিত হয়ে ওঠে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের নিজস্ব অনলাইন সংবাদমাধ্যম ডিএমপি নিউজেও ৫ আগস্ট ওই পুরোনো ঘটনার তথ্য পুনরায় প্রকাশ করা হয়েছে।
সাভারের শ্যামপুরে উদ্ধার হওয়া পাঁচটি হাতবোমা কোথা থেকে এসেছে, কারা এগুলো সেখানে মজুত করেছিল এবং এগুলো তৈরির সঙ্গে কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
আটক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি বাড়ির মালিক, ভাড়াটিয়া এবং ভবনে যাতায়াতকারী ব্যক্তিদের সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে উদ্ধার করা বোমাগুলোর ধরন, বিস্ফোরক তৈরির উপকরণ এবং সম্ভাব্য ব্যবহার সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন।
পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত থাকলে তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। বর্তমানে বাড়িটি ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বহাল রয়েছে এবং পুরো ঘটনার সঙ্গে জঙ্গি তৎপরতার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিই গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।