বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনীতিতে ভারতের সামনে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ।ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১২ আগষ্ট: বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন, উগ্রবাদী শক্তির উত্থান এবং দেশটির কথিত পাকিস্তানমুখী ঝোঁক নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন করে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে নতুন এক সমীকরণের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে একদিকে নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলা, অন্যদিকে ঢাকার সঙ্গে কার্যকর ও স্থিতিশীল কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ ব্রিফিংয়ে দেশে ফেরার পরিকল্পনা সম্পর্কে তেমন বিস্তারিত জানা যায়নি। তবে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কিছু গুরুতর মন্তব্য করেন।
সজীব ওয়াজেদ জয় দাবি করেন, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আরেকটি পাকিস্তানে পরিণত হচ্ছে। তার অভিযোগ, ভারতবিরোধী শক্তির সমর্থনে উগ্র ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশে অবাধে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। তিনি বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করে সতর্ক করেন, দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি ভবিষ্যতে আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদের প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে।
জয় আরও দাবি করেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গ্রেপ্তার ও কারাগারে থাকা শত শত দণ্ডিত সন্ত্রাসী সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স বা আইএসআইসহ বিভিন্ন বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশে সক্রিয় রয়েছে। বাস্তবসম্মতভাবে এই হুমকি মোকাবিলা করা না হলে ১৮ কোটি মানুষের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশ থেকেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বৈশ্বিক সন্ত্রাসীদের উত্থান ঘটতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
দেশে ফেরার প্রত্যয় শেখ হাসিনার
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে অবস্থান করছেন। এরপর থেকে তার প্রতি ভারতের অব্যাহত সমর্থনের কথাও সজীব ওয়াজেদ জয় উল্লেখ করেছেন।
নিজের এক অডিও বার্তায় শেখ হাসিনাও দেশে ফেরার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা বলেছেন, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, তিনি দেশে ফিরবেন। বর্তমানে ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছেন। তিনি ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। ডিসেম্বর বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয়ের স্মৃতিবিজড়িত মাস।
তবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পথ সহজ নয়। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। তার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করে। এরপর খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
প্রত্যর্পণ নিয়ে ঢাকা-দিল্লির টানাপোড়েন
ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তারেক রহমানের সরকার ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আহ্বান জানিয়ে আসছে। ঢাকার পক্ষ থেকে তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানানো হয়েছে।
তবে নয়াদিল্লি এখনো এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি। ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিষয়টি আইনি পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তিনি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও ন্যায়বিচার পাবেন, এমন দৃঢ় নিশ্চয়তা ঢাকার কাছ থেকে না পাওয়া পর্যন্ত ভারত তাকে দেশ ছাড়ার জন্য চাপ দেবে না।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সংবাদ ব্রিফিং নিয়েও বাংলাদেশ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। ভারতের মাটিতে বসে তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে নয়াদিল্লি স্পষ্ট করে জানায়, ওই অনুষ্ঠান একটি স্বাধীন প্রেস ক্লাব আয়োজন করেছিল এবং এতে ভারত সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা ছিল না।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, ওই সংবাদ ব্রিফিংয়ে শেখ হাসিনা বা অন্য কারও প্রকাশ করা কোনো মতামত ভারত সমর্থন করে না। একই সঙ্গে শেখ হাসিনা ও তার দলকে ভারতের মাটিতে কোনো সার্বভৌম দেশের বিরুদ্ধে লক্ষ্য করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা থেকে বিরত থাকার কথাও জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভারতের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ প্রায় সম্পূর্ণভাবে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো দিয়ে ঘেরা। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত প্রায় ২ হাজার ২১৭ কিলোমিটার, আসামের সঙ্গে ২৬২ কিলোমিটার, মেঘালয়ের সঙ্গে ৪৪৩ কিলোমিটার, ত্রিপুরার সঙ্গে ৮৫৬ কিলোমিটার এবং মিজোরামের সঙ্গে ৩১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ।
এ ছাড়া বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারেরও একটি সংক্ষিপ্ত স্থলসীমান্ত রয়েছে এবং দক্ষিণে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। ফলে বাংলাদেশে কোনো ধরনের গুরুতর রাজনৈতিক বা নিরাপত্তাগত অবনতি ঘটলে তার প্রভাব দ্রুত ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের মাটিতে উগ্রবাদী শক্তির উত্থান ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। ভারতের এই অঞ্চলে ৬ কোটিরও বেশি মানুষের বসবাস। সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, অবৈধ অস্ত্র ও মানবপাচারের মতো বিষয়গুলোও এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
জামায়াতের উত্থানও আলোচনায়
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী অবস্থানও ভারতের উদ্বেগের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। একসময় নিষিদ্ধ থাকা দলটি বর্তমানে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করেছে এবং ক্ষমতাসীন বিএনপির পর জাতীয় সংসদে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন দখল করেছে।
জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন বাংলাদেশি রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের ভারতবিরোধী বক্তব্যকে সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে বাংলাদেশের সঙ্গে কার্যকর ও স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখা।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলি ইতোমধ্যেই ঢাকা ও নয়াদিল্লির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে। সম্পর্কের টানাপোড়েন ভবিষ্যতে আরও বাড়লে তা দুই দেশের নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
সীমান্ত ও অভিবাসন নিয়েও উদ্বেগ
বাংলাদেশি মুসলিম অভিবাসীদের ভারতের বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশের বিষয়টিও দেশটির দীর্ঘদিনের উদ্বেগের কারণ। বিশেষ করে আসাম ও ত্রিপুরাকে এ ধরনের প্রবেশের প্রধান পথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সমস্যার এখনো কোনো সুস্পষ্ট ও স্থায়ী সমাধান হয়নি।
ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও অভিবাসন ইস্যুতেও ভারতের জন্য নতুন করে কৌশল নির্ধারণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। নিরাপত্তা উদ্বেগ, রাজনৈতিক পরিবর্তন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্ন, উগ্রবাদ নিয়ে আশঙ্কা এবং সীমান্ত ও অভিবাসন ইস্যু দুই দেশের সম্পর্ককে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
তবে ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। ১৯৪৭ সালের আগে যে দুই দেশ একটি অভিন্ন ইতিহাস ও পরিচয়ের অংশীদার ছিল, সময়ের সঙ্গে সেই পারস্পরিক বোঝাপড়ার জায়গাটি আবারও ফিরে আসা জরুরি।
সম্পর্কের বর্তমান জটিলতা কাটিয়ে বাস্তবসম্মত কূটনীতি, পারস্পরিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে দুই দেশ ভবিষ্যতে সহযোগিতার নতুন পথ খুঁজে নেবে, এমন প্রত্যাশাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।