আরব দেশগুলোতে কি প্রভাব হারাচ্ছেন ট্রাম্প
মেলবোর্ন, ১৭ আগষ্ট: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে টানা পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চললেও এখনো কোনো কার্যকর সমাধানের পথ না বের হওয়ায় মার্কিন মিত্র হিসেবে…
মেলবোর্ন, ১৭ আগষ্ট: অস্ট্রেলিয়ায় হাম রোগের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির প্রায় ১৭ লাখ মানুষ বর্তমানে হামের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়াই রয়েছেন। ২০১৯ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা জানিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়ার প্রায় ৭ শতাংশ মানুষের হামের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই।
অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষস্থানীয় টিকাদান গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল সেন্টার ফর ইমিউনাইজেশন রিসার্চ অ্যান্ড সার্ভেইলেন্স (এনসিআইআরএস) এই গবেষণা পরিচালনা করেছে। গবেষণাপত্রটি অস্ট্রেলিয়ান অ্যান্ড নিউজিল্যান্ড জার্নাল অব পাবলিক হেলথ-এ প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে।
গবেষণার প্রধান লেখক জো ক্রোকার জানিয়েছেন, ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিক থেকে জন্ম নেওয়া অস্ট্রেলীয়দের কয়েকটি বয়সভিত্তিক গোষ্ঠীর মধ্যে হামের বিরুদ্ধে সুরক্ষার ঘাটতি তুলনামূলকভাবে বেশি। এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে দেশটিতে হামের আরও বেশি প্রাদুর্ভাব ঘটাতে পারে এবং সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তার আশঙ্কা, আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
গবেষকরা জানিয়েছেন, এই গবেষণায় প্রথমবারের মতো রক্তের নমুনায় হামের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পরীক্ষার তথ্যের সঙ্গে টিকাদানের তথ্য একত্র করে জাতীয় পর্যায়ের বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার মানুষের মধ্যে হামের বিরুদ্ধে সুরক্ষার সবচেয়ে বিস্তৃত চিত্র পাওয়া গেছে এই গবেষণায়।
গবেষণার ফল অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার মোট জনসংখ্যার মধ্যে হামের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে প্রায় ৯৩ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষের।
অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারিবিদ অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান এস্টারম্যান এই হারকে ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এই মাত্রার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বড় ধরনের হাম প্রাদুর্ভাব ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
অধ্যাপক এস্টারম্যান বলেন, টিকাদানের হার আরও কমে গেলে অস্ট্রেলিয়া বড় ধরনের হাম প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই বর্তমান টিকাদানের হার কোনোভাবেই আরও কমতে দেওয়া উচিত নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, হাম প্রতিরোধ এবং জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রয়োজনীয় হার্ড ইমিউনিটি বজায় রাখতে ৯৩ থেকে ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ প্রয়োজন।
অস্ট্রেলিয়া ২০১৪ সালে হাম নির্মূলের মর্যাদা অর্জন করেছিল। তবে বিদেশ থেকে আসা পর্যটক এবং বিদেশ ভ্রমণ শেষে দেশে ফেরা বাসিন্দাদের মাধ্যমে দেশটিতে এখনও হাম ভাইরাসের সংক্রমণ প্রবেশ করছে। করোনাভাইরাস মহামারির সময় হাম সংক্রমণের ঘটনা খুব কম থাকলেও গত দুই বছরে আক্রান্তের সংখ্যা আবার বেড়েছে।
হামের টিকা পুরোপুরি না নেওয়া যেকোনো ব্যক্তিই এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। তবে শিশু ও ছোট বাচ্চারা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে, কারণ সাধারণত ১২ মাস বয়সের আগে তাদের নিয়মিত হামের টিকা দেওয়া হয় না।
এ ছাড়া যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং টিকা না নেওয়া গর্ভবতী নারীরাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। গর্ভাবস্থায় হামের টিকা দেওয়া যায় না।
গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু ও ছোট বাচ্চাদের পাশাপাশি ৪২ থেকে ৪৯ বছর, ৩১ থেকে ৩৩ বছর এবং ২৫ ও ২৬ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে হামের বিরুদ্ধে সুরক্ষা তুলনামূলকভাবে কম।
জো ক্রোকার বলেন, টিকাদান কর্মসূচির বিভিন্ন সময়ে তৈরি হওয়া প্রজন্মভিত্তিক ঘাটতির কারণে এসব বয়সী মানুষের মধ্যে ঝুঁকি বেশি।
তার মতে, সবচেয়ে বড় ঘাটতি রয়েছে ২০০০ সালের আশপাশে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে। পাশাপাশি ১৯৯৩, ১৯৯৪ ও ১৯৯৫ সালে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যেও টিকাদানের ঘাটতি রয়েছে। ওই সময় হামের টিকার দ্বিতীয় ডোজ চালু করা হয়েছিল।
১৯৭৭ থেকে ১৯৮৩ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যেও ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। তাদের অনেকেই হামের টিকার মাত্র একটি ডোজ পেয়েছেন।
এ ছাড়া ১৯৬৬ সাল বা তার পর জন্ম নেওয়া কিছু মানুষও টিকা না নেওয়া কিংবা আংশিক টিকা নেওয়ার কারণে ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। তবে তাদের কেউ কেউ শৈশবে হাম আক্রান্ত হওয়ার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে থাকতে পারেন।
অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান এস্টারম্যান বলেন, গবেষণার ফলাফল যথেষ্ট উদ্বেগজনক। টিকাদানের হার আরও কমে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
তিনি জানান, একজন সংক্রমিত ব্যক্তি যদি এমন একটি কক্ষে প্রবেশ করেন যেখানে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাহীন অনেক মানুষ রয়েছেন, তাহলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে তাদের ১২ থেকে ১৫ জন পর্যন্ত আক্রান্ত হতে পারেন। তার মতে, হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এর সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লাল বা দাগযুক্ত ফুসকুড়ি। গুরুতর ক্ষেত্রে এ রোগ থেকে কানের সংক্রমণ, নিউমোনিয়া এবং মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান।
অস্ট্রেলিয়ায় হাম ভাইরাস প্রবেশের ক্ষেত্রে বিদেশভ্রমণকারীদের ঝুঁকি বেশি বলে জানিয়েছেন ন্যাশনাল সেন্টার ফর ইমিউনাইজেশন রিসার্চ অ্যান্ড সার্ভেইলেন্সের সহযোগী পরিচালক ফ্রাঙ্ক বিয়ার্ড।
তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে হাম সংক্রমণ বাড়তে থাকায় বিদেশ ভ্রমণের আগে প্রত্যেকের নিজের হামের টিকা নেওয়ার রেকর্ড যাচাই করা উচিত।
কেউ আগে দুই ডোজ হামের টিকা নিয়েছেন, এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ না থাকলে তাকে আবার টিকা নেওয়ার জন্য জোরালোভাবে উৎসাহিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান এস্টারম্যান জানান, ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সী অস্ট্রেলীয়দের মধ্যে বিদেশভ্রমণের সময় হাম আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা দেখা যাচ্ছে। তাদের অনেকেই এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ শেষে দেশে ফিরে আক্রান্ত হয়েছেন।
তার মতে, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো দেশে বড় ধরনের হাম প্রাদুর্ভাব থাকায় সেসব দেশ থেকে ফিরে আসা যাত্রীদের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় ভাইরাস প্রবেশের ঝুঁকি রয়েছে।
বিদেশ ভ্রমণের আগে সাধারণ চিকিৎসকদেরও রোগীদের হামের টিকা নেওয়ার অবস্থা যাচাই করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের অতিরিক্ত হামের টিকা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে কি না, তা বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন ফ্রাঙ্ক বিয়ার্ড।
জো ক্রোকার বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় হামের বিরুদ্ধে গোষ্ঠীগত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার হার ৯৩ শতাংশের নিচে নেমে গেলে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় হাম আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এ অবস্থায় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার পক্ষে প্রতিটি সংক্রমণের উৎস শনাক্ত করে দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় টিকাদানের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় কম, সেসব এলাকায় ছোট ছোট প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বেশি।
অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান এস্টারম্যানও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, টিকাদানের হার কমতে থাকলে অস্ট্রেলিয়ায় আরও বেশি হাম প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।
এদিকে গবেষণার প্রধান লেখক জো ক্রোকার জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিশুদের টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় গবেষণায় পাওয়া ১৭ লাখ ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের হিসাবটি বর্তমান পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্রের তুলনায় কম হতে পারে। অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়ায় বর্তমানে হামের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা ২০১৯ সালের হিসাবের চেয়েও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সুত্রঃ এবিসি নিউজ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au